চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশের সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ: এডিবি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুতির ঝুঁকিতে বাংলাদেশের সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ: এডিবি

অনলাইন ডেস্ক

২২ অক্টোবর, ২০২৬ | ২:০৯ অপরাহ্ণ

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সুপেয় পানির সংকট ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দেশের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরে বাধ্য হতে পারেন। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

 

‘এশিয়া-প্যাসিফিক ক্লাইমেট রিপোর্ট ২০২৬: কোস্টাল রিস্কস অন দ্য রাইজ – অ্যাকশনস ফর এ রেজিলিয়েন্ট ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি ২১ অক্টোবর প্রকাশিত হয়।

 

এতে এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উপকূলীয় জলবায়ু ঝুঁকি এবং তা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় অভিযোজন ব্যবস্থার মূল্যায়ন করা হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপকূলীয় প্লাবনের প্রধান শিকার দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্র আরো ঘনীভূত হয়প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে উপকূলীয় প্লাবনের প্রধান শিকার দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দীর্ঘ মেয়াদে তাদের দারিদ্র্য ও বঞ্চনার চক্র আরো ঘনীভূত হয়।

 

অন্যদিকে, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ভূখণ্ড দেবে যাওয়ার কারণে ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় বদ্বীপ। বদ্বীপটির বিভিন্ন অঞ্চল বছরে ৪ মিলিমিটার থেকে ৫৫ মিলিমিটার পর্যন্ত দেবে যাচ্ছে, যা কৃষি জমি বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে এবং উপকূলীয় প্লাবনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

উচ্চ নির্গমন রূপরেখা (এসএসপি৫-৮.৫) অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৭৪ লাখ মানুষ উপকূলীয় প্লাবনের মুখে পড়তে পারে। এতে বার্ষিক সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্লাবনপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ ঝুঁকিমুক্ত এলাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দরিদ্র। এর ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এই সম্প্রদায়গুলোর জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া, স্থানান্তর বা নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো আর্থিক সক্ষমতা সবচেয়ে কম থাকে।

 

লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করছে। উপকূলীয় ভূগর্ভস্থ পানি এবং সুপেয় পানির উৎসে লবণাক্ততা বৃদ্ধির সাথে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, হাইপারটেনশন বা হৃদরোগ এবং কিডনি রোগের প্রত্যক্ষ সংযোগ পাওয়া গেছে।

 

বিশেষ করে নারী ও কন্যাসন্তানেরা অতিরিক্ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দুর্যোগের পর তাদের খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের বোঝাও বাড়ছে। অগভীর নলকূপগুলোর পানি লবণাক্ত হয়ে পড়ায় নারীদের প্রায়ই সুপেয় পানি সংগ্রহের জন্য দূরদূরান্তে যেতে হচ্ছে।

 

ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং পৈতৃক ভিটেমাটি হারানোর প্রভাব মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও মারাত্মক আঘাত হানছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষদের মধ্যে মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও বিষণ্নতা চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

অভিযোজন (নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা) গ্রহণ না করলে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে বার্ষিক উপকূলীয় বন্যার ক্ষয়ক্ষতি ২০৫০ সালের মধ্যে ছয় গুণেরও বেশি এবং ২১০০ সালের মধ্যে প্রায় বিশ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে।

 

৩০টি উপকূলীয় অর্থনীতির মধ্যে, বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭২ বিলিয়ন থেকে ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে এবং ২১০০ সালের মধ্যে ৫২০ বিলিয়ন থেকে ৭৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা বর্তমানে প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার।

 

প্রতিবেদনে অনুমান করা হয়েছে যে,বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি বর্তমান পর্যায়ে ধরে রাখতে প্রতি বছর উপকূলীয় সুরক্ষায় প্রায় ৯ বিলিয়ন থেকে ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এই সামান্য বিনিয়োগের ফলে প্রতি বছর ১৭৮ বিলিয়ন থেকে ৩৬০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব—যা বিনিয়োগের তুলনায় ২০ গুণ পর্যন্ত লাভজনক।

 

এডিবি-র জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের মহাপরিচালক ইয়েভগেনি জুকোভ বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলগুলো এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রবৃদ্ধির অলক্ষিত চালিকাশক্তি, কিন্তু ক্রমবর্ধমান সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ও চরম বিপদের মুখে এগুলো সংকুচিত হচ্ছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি এবং নিরাপদ মানবজীবন ও সচল অর্থনীতি বজায় রাখার জন্য স্থিতিস্থাপক উপকূল গড়ে তুলতে আমাদের এখনই দীর্ঘমেয়াদী, অভিযোজনযোগ্য ও ঝুঁকি-সচেতন সমাধান নিয়ে কাজ করতে হবে।’

 

এডিবির উপকূলবর্তী উন্নয়নশীল সদস্য অর্থনীতিগুলোর ৪০ কোটিরও বেশি মানুষ, অর্থাৎ প্রতি ১০ জন অধিবাসীর মধ্যে ১ জনেরও বেশি সমুদ্রের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে বসবাস করে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকাগুলো বন্দর, বাণিজ্য, পর্যটন ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

 

উচ্চ-কার্বন নিঃসরণের পরিস্থিতিতে, দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে বার্ষিক বন্যার ক্ষতি ২১০০ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে পৌঁছতে পারে।

 

ব্যাংকক, জাকার্তা, কলকাতা এবং মুম্বাইয়ের মতো শহরগুলোতে যে বন্যা ঐতিহাসিকভাবে ১০০ বছরে একবার হতো, শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা বার্ষিক ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

 

এছাড়া বন্দরের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটার কারণে সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বার্ষিক আনুমানিক ৪০ বিলিয়ন থেকে ৪৫ বিলিয়ন ডলার ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজন এবং দুর্যোগ মোকাবিলা প্রস্তুতি জোরদার করতে দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

২০১৮ সালে প্রণীত ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ (বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০)-এ উপকূলীয় ও নদীপ্রধান এলাকার ৮০টি অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের জন্য প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ কাঠামোর রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। এতে বদ্বীপ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে বার্ষিক সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ২.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

বাংলাদেশ প্রায় ৫ হাজারটি বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করেছে, যার অনেকগুলো সাধারণ সময়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উন্নত পূর্বাভাস, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রস্তুতির সমন্বয়ে এই ব্যবস্থাগুলো ঘূর্ণিঝড়জনিত মৃত্যু ঐতিহাসিক মাত্রার তুলনায় ৯৯ শতাংশেরও বেশি কমাতে সাহায্য করেছে।

 

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব উদ্যোগও প্রস্তুতি ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, উপকূলীয় বিদ্যালয়গুলোতে তরুণদের পরিচালিত ‘আবহাওয়া ক্লাবস’ শিক্ষার্থীদের পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করা এবং পরিবারগুলোতে আগাম সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রশিক্ষণ দেয়।

 

ক্রমাগত সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ভূমির অবনমন, লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ এবং কৃষির অবনতি উপকূলীয় এলাকা থেকে জলবায়ু-উদ্বুদ্ধ স্থানান্তর (অভিবাসন) উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

প্রতিবেদনটিতে জলবায়ু অভিযোজনকে স্থানান্তরিত বা বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দিতে পারে এমন এলাকাগুলোর আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ খাবার পানি এবং নগর অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার সাথে সমন্বিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

 

এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলরেখা প্রতি বছর প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক উৎপাদন নিশ্চিত করে, কিন্তু এগুলো তীব্র থেকে তীব্রতর জলবায়ু ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সহনশীলতা তৈরিতে বিনিয়োগ করলে তার ব্যয়ের তুলনায় ২০ গুণ পর্যন্ত সুফল পাওয়া যেতে পারে।

 

এতে চারটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয়ের সুপারিশ করা হয়েছে: উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তে অভিযোজনযোগ্য পরিকল্পনা সমন্বিত করা, প্রতিষ্ঠান ও শাসনব্যবস্থা জোরদার করা, অর্থায়ন সচল করা এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন ও মালিকানা নিশ্চিত করা।

 

এই অঞ্চলের উপকূলীয় অর্থনীতিগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়ন ২০১৫ সালের প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ২০২২-২৩ সালে বার্ষিক গড়ে ১১.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে এখনও একটি বিশাল অর্থায়নের ঘাটতি রয়ে গেছে।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উপকূলীয় সহনশীলতা বজায় রাখতে সরকারি অর্থায়নই মূল ভূমিকা পালন করবে, তবে ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্পের জন্য বৃহত্তর রাজস্ব সক্ষমতা এবং অতিরিক্ত সরকারি, বেসরকারি ও সুবিধাজনক শর্তের অর্থায়নের প্রয়োজন হবে।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন