চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীদের ডাকা সর্বাত্মক শাটডাউন ১৭ দিনে গড়িয়েছে। শাটডাউনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ সব ধরনের একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। একই দাবিতে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতির ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রমও।
জানা গেছে, গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে চুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে সরিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে পরদিন ২২ সেপ্টেম্বর থেকে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি শুরু করেন চুয়েটের শিক্ষার্থীরা। এরপর থেকে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের পাশাপাশি মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, গণস্বাক্ষর, মানববন্ধন, স্মারকলিপি প্রদান, মশালমিছিল, লাল কার্ড প্রদর্শন, গ্রাফিতি, ‘৫৬ কেন’ কর্মসূচি, মুখোশমিছিল ও প্রতিবাদী কনসার্টের মতো নানা কর্মসূচি পালন করে আসছেন তারা। পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কর্মবিরতি শুরু করেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, শাটডাউনের কারণে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের পুরকৌশল, ইলেকট্রনিকস ও টেলিকমিউনিকেশনস ইঞ্জিনিয়ারিং, বস্তু ও ধাতব কৌশল এবং মেকাট্রনিকস ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চলমান পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল এবং যন্ত্রকৌশল বিভাগের ক্লাস শেষ হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষা শুরু করা সম্ভব হয়নি। স্থগিত রয়েছে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল এবং ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের পানিসম্পদ কৌশল বিভাগের নির্ধারিত পরীক্ষাও।
শিক্ষার্থীরা দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষায় ফিরতে চাইলেও সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে অনড়। পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তুষার আহমেদ বলেন, ‘টানা ১৭ দিন ধরে আমাদের ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। আমরাও চাই দ্রুত ক্যাম্পাসে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরুক। তবে অধ্যাপক সায়েম স্যারকে পুনর্বহালের দাবি থেকে আমরা সরব না। সংশ্লিষ্টদের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত এই সংকটের সমাধান করা উচিত।’
শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কর্মবিরতিও দুই সপ্তাহে গড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বেলা ১১টা থেকে তালাবদ্ধ উপাচার্য ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে কর্মবিরতি পালন করেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। পরে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে সাধারণ সভা শেষে সেখানে যোগ দেন শিক্ষকেরা। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত এই অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে।
শিক্ষক সমিতি সূত্রে জানা গেছে, ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে জরুরি সভা করে পূর্ণ কর্মবিরতির সিদ্ধান্ত নেয় তারা। পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর কর্মকর্তা সমিতিও একই সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমিতি একযোগে কর্মবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছে।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের সাধারণ সভায় আমরা সবাই একমত হয়েছি যে, চুয়েটের বাইরে থেকে কাউকেই আমরা উপাচার্য হিসেবে মেনে নেব না। সামনে দুর্গাপূজার ছুটি রয়েছে; সংকটের সমাধান না হলে ওই সময় পর্যন্ত কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। সংকট কাটলে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। আগামী সপ্তাহে সভা করে চলমান আন্দোলনের পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণ করা হবে।’
একই সুর চুয়েট কর্মচারী সমিতির সভাপতি জামাল উদ্দিনের। তিনি বলেন, ‘আমাদের একটাই দাবি-অধ্যাপক সায়েমকে পদে পুনর্বহাল করা। সংকট সমাধানে আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
দীর্ঘদিন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকায় একাডেমিক ক্ষতি ও অনিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগে আছেন শিক্ষার্থীরা। তবে আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য-দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সংকট দ্রুত সমাধান না হলে একাডেমিক ক্যালেন্ডারে বড় ধরনের জট তৈরি হতে পারে। বর্তমানে শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থী-সব পক্ষের দৃষ্টিই এখন সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
পূর্বকোণ/রানা



















