চট্টগ্রাম বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

শরতের ঝরা পাতার মতো  ঝরে গেল মাইশা

শরতের ঝরা পাতার মতো ঝরে গেল মাইশা

তাসনীম হাসান

৪ নভেম্বর, ২০২৬ | ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

জীবন হোক গ্রীষ্মের ফুলের মতো সুন্দর, আর মৃত্যু হোক শরতের ঝরা পাতার মতো স্নিগ্ধ-বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘স্ট্রে বার্ডস’-এর সেই অমর বাণী। গোলাপ ফুলের নকশার মাঝে কথাগুলো খোদাই করা ছিল মাইশা মুশফেরাতের মুঠোফোনের কাভারে। কে জানত, একদিন শরতের ঝরা পাতার মতোই নিঃশব্দে ঝরে যাবে মেয়েটির জীবন! যে মৃত্যু কল্পনায় ছিল স্নিগ্ধতার উপমা, সেই মৃত্যু যে এতটা আকস্মিক, এতটা নির্মম হয়ে ধরা দেবে, তা কি কখনও ভেবেছিলেন মাইশা?
 
শরৎ বিদায় নিয়েছে কদিন হলো। প্রকৃতিতে এখন ঝরাপাতার বিষণ্ণতা। সেই বিষণ্ণতার মধ্যেই সড়কে ঝরে গেল আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামের ইংরেজি বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী মাইশার প্রাণ। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রতিদিনের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিল ২১ বছরের মেয়েটি। রাস্তা পার হলেই ক্যাম্পাস। তাই সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন পার হওয়ার জন্য। কিন্তু মুহূর্তেই ছুটে আসা লরি থামিয়ে দিল তার পথচলা। গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত মাইশাকে নেওয়া হলো চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকেই চিরবিদায়।
 
 
মাইশার দুর্ঘটনাস্থলে পড়ে ছিল কালো ফ্রেমের একটি চশমা। পাথর আর কাচের টুকরোর মাঝে সেটি ভাঙা। পড়ে ছিল তাঁর বাদামি রঙের ব্যাগ আর স্ক্রিন ফেটে যাওয়া ফোনটি। সেই ফোনের কাভারে লেখা জীবনের প্রতি মাইশার ওই সুন্দর আকাঙ্ক্ষা ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে।
 
ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়েছে মাইশার মৃত্যুর মুহূর্ত। দুটি লরি পাল্লা দিয়ে ছুটছিল। হঠাৎ একটি প্রাইভেটকার গতি কমিয়ে বাঁক নেয়। তখন একটি লরি গিয়ে ধাক্কা দেয় থেমে থাকা মিনিবাসটিকে। বাসটি কাত হয়ে উল্টে পড়ে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তিন ছাত্রীর ওপর। তাঁদের একজন মাইশা। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছিলেন তিনি। সেখানে আর যাওয়া হয়নি তাঁর। মাইশার মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ ক্যাম্পাসে হয়নি কোনো ক্লাস-পরীক্ষাও।
 
 
মাইশার বাড়ি মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়ায়। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান মেয়েটি। খালার বাসায় থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। গুরুতর আহত মাইশাসহ তিনজনকে নেওয়া হয় চমেক হাসপাতালে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে আসেন মা সালমা আক্তার। মেয়ের নিথর দেহ লাশকাটা ঘরে দেখে ভেঙে পড়েন তিনি। আহাজারি করতে করতে বলতে থাকেন, ‘মানুষ তো দুর্ঘটনার পরও বেঁচে থাকে। আমার মেয়েটাকে আল্লাহ কেন নিয়ে গেল?’
 
মেয়েহারা মায়ের বিলাপ থামে না। বলতে থাকেন, ‘আমার মেয়ে ক্লাস ফাইভে থাকতে বাপ হারিয়েছে। আমি যুদ্ধ করে মেয়েটারে এতদূর এনেছি। পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে ভালো কিছু করবে, আমার স্বপ্ন পূরণ করবে। আমার সব স্বপ্ন শেষ।’
 
মাইশার বাবার মৃত্যুর পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন সালমা। সেই সংসারের স্বামী দিদারুল আলমও মাইশাকে আগলে রাখতেন মেয়ের স্নেহে। মাইশার মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসা এই বাবাও ভেঙে পড়েন কান্নায়। বলেন, ‘গত শুক্রবার আমার মেয়ের জন্মদিন পালন করলাম। প্রায় সব আত্মীয়কে দাওয়াত দিলাম। আমার মেয়ে কত খুশি হয়েছিল! আজ আমার সেই মেয়েটা চলে গেল।’
 
মাইশার মৃত্যুতে পুরো ক্যাম্পাস শোকে ফেটে পড়ে। সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা। চমেক হাসপাতালে ছুটে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্যসহ শিক্ষকেরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হাসমত আলী ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মরহুমা মাইশা। আমারও তোমার বয়সী মেয়ে আছে। তোমাকে হারিয়ে আমি সন্তান হারানোর মতো কষ্ট পাচ্ছি।’
 
গতকাল সন্ধ্যায় জানাজা শেষে মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়ায় বাবা শাখাওয়াত হোসেনের পাশে চিরদিনের জন্য শুইয়ে দেওয়া হয় মাইশাকে।
 
নিজের ফেসবুক পরিচিতিতে মাইশা লিখেছিল, ‘তুমিই তোমার জীবনের শিল্পী। তোমার জীবনের রংতুলি অন্য কারও হাতে তুলে দিয়ো না।’
কত স্বপ্ন, কত রং দিয়ে হয়তো নিজের জীবনটা সাজাতে চেয়েছিল মেয়েটি। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দিল সেই স্বপ্নের ক্যানভাস। যে বয়সে জীবনের ছবিতে নতুন নতুন রং যোগ করার কথা, সেই বয়সেই মেয়েটি ঝরে গেল-শরতের ঝরা পাতার মতো।
 
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট