চট্টগ্রাম বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

বন্যার ধ্বংসস্তূপ থেকে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানো

বন্যার ধ্বংসস্তূপ থেকে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানো

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

৪ নভেম্বর, ২০২৬ | ১২:২৮ অপরাহ্ণ

হেমন্তের কুয়াশাসিক্ত ভোর। সময় ভোর ৬টার কাছাকাছি। সূর্যের আভায় চিকচিক করছে কুয়াশাসিক্ত ধানের শীষ। সাতসকালে কৃষক ছুটে যান আমন ক্ষেতে। ধানের শীষের আন্দোলিত হন কৃষক। আর কিছুদিন পরেই শুরু হবে ধান কাটা। নবান্ন উৎসব।
এই গল্প শুধু আমন ধান রোপণের খবর নয়। এর নেপথ্যে রয়েছে এক নিগূঢ় কাহিনি। যা ধ্বংসস্তূপ থেকে কৃষকের ঘুরে দাঁড়ানোর এক স্বপ্নময় গল্প।

চলতি বছরের জুলাই মাসের বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কৃষিখাতে। রোপা আউশ, আমনের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষেত-তলিয়ে গিয়েছিল বন্যার পানিতে। সরকারি তথ্যমতে, ৯৬০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। সবমিলে চট্টগ্রামে ১৬ হাজার ২৬ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় এক লাখ ২৬ হাজার ৫১১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই ধ্বংসস্তূপ থেকে বীজতলা তৈরি, বীজ সংগ্রহ করা ও নতুন করে জমি প্রস্তুতে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই করেছিলেন কৃষক। যে স্বপ্ন নিয়ে কৃষক নতুন করে শুরু করেছিলেন, সেই স্বপ্ন এখন ধরা দিয়েছে কৃষকের হাতের মুঠোয়।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ইতিমধ্যেই ধানের থোর পরিপুষ্টভাবে বের হয়েছে। কোথাও কোথাও ধান পাকা শুরু হয়েছে। শেষমুহূর্তের প্রস্তুতি নিচ্ছেন কৃষকেরা। বিচ্ছিন্নভাবে দু-একটা জায়গা ধান কাটা শুরু হয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা কৃষি কর্মকর্তা আপ্রু মারমা পূর্বকোণকে বলেন, ‘ধান পাকা শুরু হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে ধান কাটা শুরু হবে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ধানের ফলন ভালো হয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বন্যায় আউশের বড় ক্ষতি হয়েছে। তারপরও এবার আমনের ভালো ফলন হয়েছে। আশা করছি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ফলন উৎপাদন হবে।’

কৃষি বিভাগে তথ্য মতে, আমন আবাদে প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের নিজস্ব উদ্যোগে বীজতলা তৈরি করে কৃষকদের বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া অনেক কৃষক ফেনী, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে চারা সংগ্রহ করে রোপণ করছেন। বন্যার ক্ষতি পোষাতে কৃষি বিভাগ নানাভাবে প্রণোদনা সহায়তা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, বন্যায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষির। বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায়।

চট্টগ্রামে তিন ফসলি ধান চাষ করা হয়। এরমধ্যে সবচেয়ে বড় আবাদ হয় আমনের। এছাড়াও চট্টগ্রামে সবজির বড় আবাদ রয়েছে। জেলার ছন্দনাইশের দোহাজারী, সীতাকুণ্ড, বাঁশখালীতে সবজির বড় চাষাবাদ হয়।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য মতে, চট্টগ্রামে এবার এক লাখ ৮০ হাজার ৩৫২ হেক্টর জমিতে আমনের আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দুই হাজার জমিতে বেশি আবাদ হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে বছরে চালের চাহিদা হচ্ছে ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টন। চাহিদার বিপরীতে ধান উৎপাদন হয় ৮ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন। এই তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা (কারিগরি) রাজীব কুমার দে।

আর কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, উৎপাদনের ১১ শতাংশের বেশি বীজ ও অপচয় হয়। এতে এক লাখ টনের কাছাকাছি চাল অপচয় হয়। সেই হিসাবে মোট উৎপাদন থেকে এক লাখ টন অপচয় বাদে নিট চাল পাওয়া যায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ টনের মতো। অর্থাৎ ১৬ লাখ ২০ হাজার ৬৩৩ টনের চাহিদার মধ্যে ধান উৎপাদন থেকে চাল পাওয়া যায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৬৯৮ টন। সেই হিসাবে চট্টগ্রামের খাদ্যঘাটতি দাঁড়ায় ৯ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৫ টন।

খাদ্য ও কৃষি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চট্টগ্রামে খাদ্যঘাটতি ক্রমে বেড়েই চলেছে। কারণ চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে কমছে খাদ্য উৎপাদন।

জাতিসংঘের ‘গ্লোবাল রিপোর্ট অন খাদ্য সংকট’ অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিশ্বের ১০টি দেশের মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা মানুষের একটি বড় অংশ বসবাস করে। এফএও-এর তথ্যমতে, মূল্যস্ফীতি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য ঝুঁকিতে রয়েছে।

 

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট