চট্টগ্রাম বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়: শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি ব্যবস্থার সংকট?

এইচএসসিতে ফল বিপর্যয়: শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা, নাকি ব্যবস্থার সংকট?

আবসার মাহফুজ

৪ নভেম্বর, ২০২৬ | ১২:০৩ অপরাহ্ণ

২০২৬ খ্রিস্টাব্দের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর অসুস্থতার একটি উদ্বেগজনক চিত্র সামনে নিয়ে এসেছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার মাত্র ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এই ফলাফলে ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে অকৃতকার্য হয়েছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন, অথচ গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৯৭। আরও উদ্বেগের বিষয়, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা, মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের করুণ ফল এবং শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বৈষম্য মিলিয়ে এবারের ফলাফল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার একটি নির্মম দিক স্পষ্ট করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বিপর্যয়ের দায় কি শুধু শিক্ষার্থীদের? যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি, তাদের প্রস্তুতির ঘাটতি নিশ্চয়ই ছিল। কিন্তু সেই ঘাটতি তৈরি হওয়ার পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, পাঠদানপদ্ধতি, শিক্ষাপ্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণের দায় কতটুকু, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

 

অতীতে পাসের হার ও জিপিএ-৫ বাড়িয়ে দেখানোর প্রবণতা, অটোপাস, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস কিংবা নম্বর প্রদানে অযাচিত উদারতা শিক্ষার প্রকৃত মান সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। প্রকৃত মেধা ও যোগ্যতার মূল্যায়নে কঠোরতা প্রয়োজন। কিন্তু কঠোর মূল্যায়ন আর মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা দুটি ভিন্ন বিষয়। শিক্ষার্থীকে যথাযথভাবে শেখানো হয়নি, প্রয়োজনীয় শিক্ষক দেওয়া হয়নি, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি, ব্যবহারিক শিক্ষার অবকাঠামো তৈরি হয়নি; অথচ পরীক্ষার সময় পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও অভিন্ন মানদন্ডে মূল্যায়ন করা হলো; এমন ব্যবস্থাকে ন্যায়সংগত বলা যায় না। মূল্যায়নের মান বাড়ানোর আগে শিক্ষার সুযোগ, প্রস্তুতি ও পাঠদানের মান নিশ্চিত করতে হবে। একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে রাজধানীর নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা যখন প্রায় শতভাগ পাস করছে, তখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী কেন অকৃতকার্য হচ্ছে, তার অনুসন্ধান জরুরি। ঢাকা মহানগরীতে পাসের হার ৭৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ, অথচ অনেক জেলায় তা ৫০ শতাংশের নিচে। এই ব্যবধান প্রমাণ করে, শিক্ষার্থীদের মেধার চেয়ে শিক্ষার সুযোগ ও পরিবেশের বৈষম্য অনেক ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র যদি সবার জন্য সমান মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে অভিন্ন মূল্যায়নের নামে বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলা হবে।

এবার ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুটি বিষয়ে অনুত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সম্মিলিত সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অন্যদিকে আইসিটি আধুনিক জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি, ডিজিটাল সেবা, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের ভিত্তি। অথচ এই দুটি মৌলিক বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর দুর্বলতা আমাদের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য অশনিসংকেত। এর দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানো যাবে না। বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি ও আইসিটির পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নেই। কোথাও অন্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে পাঠদান করা হচ্ছে, কোথাও আইসিটি ল্যাব থাকলেও প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ ও দক্ষ পরিচালকের অভাব রয়েছে। বাস্তবে কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ না পেয়ে একজন শিক্ষার্থী কীভাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করবে? ইংরেজি শিক্ষার ক্ষেত্রেও মুখস্থনির্ভর ব্যাকরণ, গাইডবই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি শিক্ষার্থীদের ভাষাগত দক্ষতা তৈরি করতে পারছে না। তাই ইংরেজি শিক্ষাকে অনুবাদ ও মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে শোনা, বলা, পড়া ও লেখার সমন্বিত অনুশীলনে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহারিক ইংরেজি চর্চার পরিবেশ, ভাষা ক্লাব, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে। আইসিটি শিক্ষাকে শুধু তাত্তিক পরীক্ষার বিষয় না রেখে হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দিতে হবে। প্রতিটি কলেজে সচল কম্পিউটার ল্যাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করা এখন মৌলিক প্রয়োজন।

মানবিক বিভাগে পাসের হার মাত্র ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশ; অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীদের এমন পিছিয়ে পড়ার পেছনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষকসংকট এবং বিষয়ভিত্তিক সহায়তার ঘাটতি কতটা দায়ী, তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে হবে। একইভাবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীদের ফলাফল খারাপ হওয়ার বিষয়টি দারিদ্র্য, প্রযুক্তিগত বৈষম্য, অভিভাবকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষাসামগ্রীর ব্যয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুর্বল অবকাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। শহরের একজন শিক্ষার্থী যেখানে কোচিং, ইন্টারনেট, ব্যক্তিগত কম্পিউটার, সমৃদ্ধ পাঠাগার ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সহায়তা পাচ্ছে, সেখানে গ্রামের অনেক শিক্ষার্থী এসব মৌলিক সুযোগ থেকেই বঞ্চিত। এই বৈষম্য দূর না করে শুধু পরীক্ষার ফল দিয়ে শিক্ষার মান বিচার করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। আবার শিক্ষার মান নির্ভর করে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ওপর। অথচ দেশের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নেই, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক সংকট প্রকট, কোথাও অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের পদও দীর্ঘদিন শূন্য পড়ে আছে। একজন শিক্ষককে একাধিক বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে, প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, কখনো প্রয়োজনের অতিরিক্ত পাঠদান করতে হচ্ছে। এভাবে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে মানসম্মত পাঠদান প্রত্যাশা করা কতটা যুক্তিসংগত? আর শুধু শিক্ষক নিয়োগ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না; নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও পেশাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠদান কৌশল, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। একইসঙ্গে শিক্ষকতা পেশার সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে মেধাবী তরুণেরা এই পেশায় আগ্রহী হন।

আরেকটি বড় সংকট হলো শিক্ষার্থীদের শিখনঘাটতি। প্রাথমিক স্তরে যে ভিত্তি তৈরি হওয়ার কথা, তার দুর্বলতা নিয়েই শিক্ষার্থী মাধ্যমিকে যাচ্ছে; মাধ্যমিকের ঘাটতি নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে প্রবেশ করছে। ফলে উচ্চমাধ্যমিকের দুই বছরে এসে একসঙ্গে বহু বছরের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভাষা, গণিত, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার মৌলিক ভিত্তি দুর্বল থাকলে উচ্চতর পর্যায়ের বিষয় বোঝা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। কোভিড-১৯ মহামারি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনিয়মিত পাঠদান, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিভিন্ন সময়ে পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন এই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। কিন্তু এসব কারণকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দায় এড়ানো যাবে না। বরং কোথায় কতটা শিখনঘাটতি তৈরি হয়েছে, কোন শ্রেণিতে কোন দক্ষতা অর্জিত হয়নি, কোন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি পিছিয়ে আছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করতে হবে। এরপর শ্রেণিভিত্তিক প্রতিকারমূলক পাঠদান, অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস, শিক্ষার্থী পরামর্শ এবং নিয়মিত শিখন মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি দুর্বলতা হলো অপরিকল্পিত ও ঘনঘন শিক্ষাক্রম পরিবর্তন। কখনো একটি দেশের শিক্ষাপদ্ধতির আদলে, কখনো অন্য দেশের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে পাঠ্যক্রম সাজানোর প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। শিক্ষা কোনো পরীক্ষামূলক প্রকল্প নয়, যেখানে প্রস্তুতি ছাড়াই বারবার পদ্ধতি বদলানো যায়। শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের আগে গবেষণা, শিক্ষক-প্রশিক্ষণ, পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, প্রয়োজনীয় পাঠ্যসামগ্রী এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার দর্শন ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ না করে শুধু পাঠ্যবই পরিবর্তন কিংবা পরীক্ষার কাঠামো পুনর্বিন্যাস করলে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। আমরা শিক্ষার্থীদের কী ধরনের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই- জ্ঞানসমৃদ্ধ, দক্ষ, সৃজনশীল, নৈতিক, মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও দায়িত্বশীল নাগরিক, নাকি কেবল সনদধারী পরীক্ষার্থী, সেই প্রশ্নের উত্তর আগে নির্ধারণ করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে একটি সর্বজনগ্রাহ্য, গবেষণাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতি প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি ও তদারকির ক্ষেত্রেও আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। ২৯৩টি প্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে না পারা কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা কি নিয়মিত ক্লাস করেছে? শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন কি না? পাঠদান হয়েছে কি না? প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় কী ধরনের অনিয়ম ছিল? শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। একইসঙ্গে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের কারণও অনুসন্ধান করা উচিত, যাতে কার্যকর পাঠদান ও ব্যবস্থাপনার ভালো দৃষ্টান্ত অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করতে পারে। এবারের ফলাফলে মেয়েরা পাসের হারে এগিয়ে থাকলেও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে ছেলেরা সামান্য এগিয়ে রয়েছে। এটিও ব্যবধানও শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের গবেষণার বিষয় হওয়া উচিত। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীকে পরীক্ষার ফলের কারণে অপমান, উপহাস কিংবা সামাজিকভাবে হেয় করা গ্রহণযোগ্য নয়। অভিভাবকদের বুঝতে হবে, একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া সন্তানের জীবনের সমাপ্তি নয়। আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা, ব্যর্থতার কারণ চিহ্নিত করা এবং বিকল্প শিক্ষাপথ সম্পর্কে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দেওয়া জরুরি।
এ মুহূর্তে সরকারের সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত, এবারের ফলাফল নিয়ে শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তা দূর করা। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় ঠেকাতে শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার শুরু করা। এক বা দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের দ্রুত পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। তবে এই সুযোগ যেন তাড়াহুড়ো করে আয়োজন করা কোনো দায়সারা পরীক্ষা না হয়। শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সময়, মানসম্মত প্রশ্নপত্র এবং নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি যেসব শিক্ষার্থী একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য বিশেষ সহায়ক শিক্ষাকার্যক্রম চালু করতে হবে। আগামী শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই বিষয়ভিত্তিক দুর্বলতা নিরূপণ করে পুনরুদ্ধারমূলক পাঠদান চালু করা উচিত। শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ, ল্যাব স্থাপন, গ্রন্থাগার, ইন্টারনেট সুবিধা এবং গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, পাসের হার বাড়লেই শিক্ষার মান বাড়ে না; আবার পাসের হার কমলেই শিক্ষার্থীরা মেধাহীন হয়ে যায় না। শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য হলো একজন শিক্ষার্থী কতটা জ্ঞান অর্জন করল, কতটা দক্ষতা তৈরি করল, কতটা যুক্তিবাদী ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠল এবং বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে কতটা সক্ষম হলো। সনদ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সনদই শিক্ষার চুড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। শিক্ষাক্রম, পাঠদান ও মূল্যায়ন- তিনক্ষেত্রেই মৌলিক পরিবর্তন আনতে হবে।

এইচএসসির এবারের ফলাফলকে শুধু একটি প্রজন্মের ব্যর্থতার খতিয়ান হিসেবে দেখলে আমরা সবচেয়ে বড় ভুলটি করব। বরং এটিকে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলা, বৈষম্য, অপরিকল্পনা ও জবাবদিহির অভাবের বিরুদ্ধে একটি সতর্কসংকেত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষার্থীরা আমাদের ভবিষ্যৎ; তাদের ব্যর্থতার দায় তাদের কাঁধে চাপিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ দায়মুক্ত হতে পারে না। যারা পাস করেছে, তাদের অভিনন্দন; যারা পারেনি, তাদের প্রতি সহমর্মিতা ও নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশা। একটি পরীক্ষার ফল কারও জীবনের শেষপরিচয় নয়। কিন্তু এই ফলাফলের পরও যদি নীতিনির্ধারকদের ঘুম না ভাঙে, যদি শিক্ষকসংকট, শিক্ষার বৈষম্য, দুর্বল পাঠদান, অপরিকল্পিত শিক্ষাক্রম ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা আগের মতোই চলতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আমাদের দায় আরও বাড়বে। আজ প্রয়োজন দায় এড়ানোর রাজনীতি নয়, প্রয়োজন দায় স্বীকার করে কার্যকর সংস্কার। শিক্ষার মানোন্নয়নে কোনো আপস করা যাবে না, আবার শিক্ষার্থীদের প্রতি অবিচার করেও মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা করা যাবে না। রাষ্ট্রকে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্রপরিবারের সন্তানও রাজধানীর সচ্ছলপরিবারের সন্তানের মতো শেখার সুযোগ পাবে। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষার পাশাপাশি দেশের ভবিষ্যৎ রক্ষার স্বার্থেই এখন শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারে মনোযোগ দিতে হবে। এটি সময়ের অনিবার্য দাবি।

পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট