চট্টগ্রাম শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

দুর্গম পথ শেষে ‘থমকে গেছে’ সময়

দুর্গম পথ শেষে ‘থমকে গেছে’ সময়

কাঁকন দেব

১৫ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:৩৯ পূর্বাহ্ণ

কখনও কাদা, কখনও পাথর, কোথাও ঘন অরণ্যের নিস্তব্ধতা। সেই পথ পেরিয়ে যখন হঠাৎ কানে ভেসে আসে ঝরনার গর্জন, তখন মনে হয়, প্রকৃতি যেন বহুদিনের লুকিয়ে রাখা সৌন্দর্য হঠাৎ চোখের সামনে মেলে ধরেছে। বলছিলাম মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনার কথা। দুর্গম পথ শেষে ‘সময় যেন থমকে’ গেছে। প্রকৃতি যেন স্বর্গের দ্বার খুলে দাঁড়িয়েছে; অপার্থিব এক সৌন্দর্যে। প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য দেখে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে।

 

কীভাবে প্রকৃতি মানুষের আত্মাকে পরিশোধিত করে, কীভাবে তার আদিম, অকৃত্রিম সৌন্দর্য মানুষের ভেতরের সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। অরণ্য এখানে একটি নিছক ভৌগোলিক স্থান নয়, এটি এক মহাজীবনের প্রতীক, এক আধ্যাত্মিক আশ্রয়, যেখানে মানুষ তার ক্ষুদ্র আমিত্ব ভুলে এক বৃহত্তর সত্তার সঙ্গে একাত্ম হতে শেখে। আমরা তিন বন্ধু ছুটির এক সকালে চট্টগ্রাম শহর থেকে সকাল ৯টায় যাত্রা করে বেলা সাড়ে ১০টায় পৌঁছালাম খৈয়াছড়া ঝরনার স্পটের কাছাকাছি।

 

বাস থেকে নেমে রাস্তা পার হতেই অপর পাশেই ছিল ঝরনা যাওয়ার অপেক্ষারত সিএনজিচালিত অটোরিকশা। জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় ঝরনার যাওয়ার অর্ধেক রাস্তা গাড়িতে করে গেলাম। গাড়ি থেকে নামতেই দেখি বিভিন্ন দোকানে বাঁশ বিক্রি করছে। যারাই ঝরনার দিকে যাচ্ছে, সবার হাতেই বাঁশ। আমরাও ১৫ টাকা করে তিনটা নিলাম। এই বাঁশ ছাড়া আপনি হাঁটতে পারবেন না। সঙ্গে নিলাম ৩০ টাকা দামের অ্যাংলেট। হাঁটার পথে এটা আপনার পায়েরসুরক্ষা দেবে।

 

একই সঙ্গে আমরা হোটেলে দুপুরের খাবার অর্ডার করে গেলাম। যেখানে আপনার ব্যাগ ও প্রয়োজনীয় সবকিছু রেখে যেতে পারবেন। এরপর শুরু হলো মূলযাত্রা। পাহাড়ি ছড়া ধরে, পিচ্ছিল পাথর ডিঙিয়ে, কখনও হাঁটুসমান পানিতে নেমে, কখনও ঘন জঙ্গলের ছায়া মাড়িয়ে কর্দমাক্ত পথে হেঁটে যেতে হবে। শহরের কোলাহলে যে মানুষ নিজের ভেতরের শব্দও শুনতে পায় না, সে এখানে এসে নিজের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত শুনতে পারে। খৈয়াছড়ার পথে প্রতিটি পা ফেলার আগে ভাবতে হয়, শরীরের ভারসাম্য রাখতে হয়।

 

পথে যেতে যেতে ঝরনার অজস্র রূপের দেখা মিলবে। যাওয়ার পথ হারানোর উপক্রম নেই। অসংখ্যা ভ্রমণপিপাসু মানুষ আপনার চারপাশে দেখবেন। যারা একই পথের যাত্রী। কবি জীবনানন্দ দাশের মতো বলতে ইচ্ছে করে ‘হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে, সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে’। একসময় চলে এলাম প্রথম ঝরনায়। এখানে অনেকগুলো ঝরনা রয়েছে।

 

খৈয়াছড়া বাংলাদেশের অন্যতম বহুধাপবিশিষ্ট ঝরনা। প্রতিটি ধাপ আলাদা সৌন্দর্য ধারণ করে আছে। কোথাও পানির ধারা সরু হয়ে নেমে এসেছে, কোথাও সাদা ফেনায় গর্জে পড়ছে বিশাল পাথরের গা বেয়ে। ওপরে তাকালে দেখা যায় সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা সেই জলধারা। পরের ঝরনাগুলো দেখতে হলে ঝুঁকি নিতে হবে। কারণ দ্বিতীয় ঝরনা থেকে সব কটি পাহাড়ের ওপর। যত উঁচুতে যাবেন, তত ঝরনা। প্রথম ঝরনায় প্রচুর মানুষ। কারণ, এতটুকুই আসে বেশিরভাগ মানুষ। বেশ আনন্দ করলাম প্রথম ঝরনায়। পরের ঝরনা দেখতে পাহাড়ের অর্ধেক উঠে আবার নিচে নেমে এলাম। কারণ খাড়া রাস্তা বেশ পিচ্ছিল ও ঝুঁকিপূর্ণ।

 

বর্ষাকালে এই ঝরনা যেন তার পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে যায়। পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে আসা জলরাশি তখন আরও প্রবল, আরও জীবন্ত। আবার শুষ্ক মৌসুমে তার রূপ শান্ত, ধ্যানমগ্ন। ঝরনা দেখতে চাইলে বর্ষায় যেতে হবে। ‘খৈয়াছড়ার’ রূপ আপনাকে মোহিত করবেই। ফিরে আসার সময় শরীর ক্লান্ত, জুতো ভেজা, কাপড়ে কাদার দাগ। কিন্তু মন ভরে থাকে আনন্দের আতিশয্যে…মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো কষ্টসাধ্য পথের শেষে অপেক্ষা করে!

 

কীভাবে যাবেন : চট্টগ্রাম শহরের শুভপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে চয়েস পরিবহন কিংবা একেখান থেকে বিভিন্ন লোকাল বাসের মাধ্যমে খৈয়াছড়া ঝরনার মুখে নামতে পারবেন। ভাড়া পড়বে ১৩০ থেকে ১০০ টাকা। চালকের সহকারী হেলপারকে বললেই নামিয়ে দিবে। সেখান থেকে সহজেই যেতে পারবেন জলপ্রপাতে।

 

প্রয়োজনীয় সতর্কতা : বৃষ্টির সময় ছাড়াও অধিকাংশ সময়গুলোতে ঝরনায় যাওয়ার রাস্তা বেশ পিচ্ছিল ও দুর্গম থাকে। বিশেষ করে একেবারে ওপরের ধাপগুলো খাড়া পাহাড় বেয়ে উঠতে হয়। তাই ভালো মানের গ্রিপের জুতা পরে তবেই ট্রেকিং শুরু করতে হবে। এরপরেও তাড়াহুড়ো না করে সাবধানে ধীরে ধীরে এগুনো উচিত। ট্রেকিংয়ের সময় হাঁটার সুবিধার্থে বাঁশের লাঠি এবং পায়ে অ্যাংলেট ব্যবহার করা ভালো। মুঠোফোনের জন্য পানিনিরোধক ব্যাগ নেওয়া আবশ্যক।

 

বিকেল নামার আগেই ফিরে আসা উচিত। সেখানে বিদ্যুৎ নেই বলা চলে। অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের সময় আটকে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই যতটা সম্ভব সকাল সকাল এখানে আসার চেষ্টা করতে হবে। সঙ্গে হালকা খাবার, পানির বোতল নেওয়া যেতে পারে। এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যাতে স্থানীয় মানুষসহ অন্য ভ্রমণার্থীদের অসুবিধা হয়।

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট