চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে সেবা নিতে আসা রোগীদের হার্টে গুরুতর ব্লকেজ ধরা পড়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত দুই দশকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চমেক হাসপাতালে করোনারি এনজিওগ্রাম করানো প্রতি চারজন রোগীর মধ্যে অন্তত একজনের হার্টেই শনাক্ত হচ্ছে জটিল ব্লক। যার চিকিৎসায় জরুরি ভিত্তিতে বসাতে হচ্ছে রিং।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে মোট ২৫ হাজার ৯৪টি এনজিওগ্রাম সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ধমনীর রক্তচলাচল স্বাভাবিক করতে ৫ হাজার ৬২৭ জন রোগীর হৃদযন্ত্রে রিং পরানো হয়। হিসাবে এনজিওগ্রাম করানো রোগীদের প্রায় ২২ দশমিক ৪ শতাংশেরই শরীরে চিকিৎসাগতভাবে বিপজ্জনক ব্লকেজ শনাক্ত হয়।
পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক সময়েও হৃদযন্ত্রে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়া রোগীদের প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী রূপ নিয়েছে। যাদের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করতে রিং পরাতে হয়। চলতি বছরের প্রথম পৌনে নয় মাসে ১ হাজার ৮৫৭টি এনজিওগ্রামের বিপরীতে ৮৩৯টি পিসিআই করা হয়েছে। অর্থাৎ এ সময়ে এনজিওগ্রাম করা রোগীদের ৪৫ দশমিক ১৮ শতাংশেরই রিং বসানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় চলতি বছরের এই হার প্রায় দ্বিগুণ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সকর্ত করে বলছেন, কেবল বয়স্করাই নন, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন ও মানসিক চাপের কারণে আশঙ্কাজনক হারে তরুণ ও মধ্যবয়সীদের রক্তনালীও অবরুদ্ধ হয়ে পড়ার প্রবণতা আগের চেয়ে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে। এমন পরিস্থিতির জন্য অতিরিক্ত জাংক ফুড গ্রহণ, জীবনাচারণে পরিবর্তন, কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়াসহ নানা বিষয়কে দায়ী করছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।
চমেক হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম আল মামুন বলেন, এই পরিসংখ্যানে বোঝা যায় এ অঞ্চলে দিন দিন হৃদরোগের ভয়াবহতা কতটা বাড়ছে। বর্তমানে তরুণ ও বয়স্ক দুই বয়সের রোগীর মধ্যেই রক্তনালিতে একাধিক ও জটিল ব্লক পাওয়া যাচ্ছে। ফলে অনেক রোগীর রিং বসানোর প্রয়োজন হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, ধূমপান, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। শুধু রিং বসিয়ে এই রোগীর চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। হৃদরোগ প্রতিরোধে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় সীমাবদ্ধতা : বয়স্ক হৃদরোগীদের চিকিৎসায় চমেক হাসপাতাল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখলেও শিশু হৃদরোগ চিকিৎসায় এখনো অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়ে গেছে। গত ২৩ বছরে জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত শিশুদের বিভিন্ন ডিভাইস ক্লোজার প্রসিডিউর সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৫১টি। বিশেষায়িত পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলোজি ক্যাথল্যাব ও শিশু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের সীমাবদ্ধতার কারণেই এই হার কিছুটা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিশাল জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চমেক হৃদরোগ বিভাগে শয্যা সংখ্যা বাড়ানো, দ্বিতীয় ক্যাথল্যাব স্থাপন এবং শিশুদের চিকিৎসায় অবকাঠামো সম্প্রসারণের তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
বিভাগীয় তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ বছরে শিশুদের জন্মগত হৃদরোগের বিভিন্ন ইন্টারভেনশনাল চিকিৎসা হয়েছে মাত্র ৫১টি। এর মধ্যে পিডিএ ডিভাইস ক্লোজার ৬টি, এএসডি ১৫টি, ভিএসডি ১৫টি, পিটিএমসি ১৮টি এবং বিএপি ১টি। বিশেষায়িত শিশু হৃদরোগ চিকিৎসা ও পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতার কারণে এ ধরনের চিকিৎসার সুযোগ এখনও কম বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কম খরচে বড় জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা : চট্টগ্রাম বিভাগের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে হৃদরোগের চিকিৎসা নিতে রোগীরা চমেক হাসপাতালে আসেন। সরকারি এ হাসপাতালে তুলনামূলক কম খরচে এনজিওগ্রাম ও রিং বসানোর সুযোগ থাকায় নি¤œ ও মধ্যবিত্ত মানুষের বড় একটি অংশের ভরসাস্থল এটি।
তথ্য অনুযায়ী, চমেক হাসপাতালে এনজিওগ্রামে সরকারি ফি ও প্রয়োজনীয় কিটসহ প্রায় ৪ থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ হয়। বেসরকারি হাসপাতালে একই পরীক্ষা করতে খরচ হতে পারে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা। রিং বসানোর ক্ষেত্রেও চমেকে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালে তা ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা বা তারও বেশি হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, চট্টগ্রাম বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠীর হৃদরোগের চিকিৎসার চাপ সামাল দিতে হৃদরোগ বিভাগে শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ক্যাথল্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও শিশু হৃদরোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
পূর্বকোণ/ইবনুর

















