বহদ্দারহাটের একটি ফলের দোকানে পিরামিডের মতো করে সাজানো মাল্টার স্তূপ। একজন ক্রেতা মাঝারি আকারের একটি মাল্টা ওজন মেশিনে রাখলেন। ওজনে উঠল ২৩৫ গ্রাম। বিক্রেতা প্রতি কেজি ৫২০ টাকা দরে মেশিনে তথ্য দিলেন। মুহূর্তেই মেশিনের ছোট পর্দায় লাল রঙে ভেসে উঠল ১২২ টাকা ২০ পয়সা।
এই দাম দেখে শামসুল ইসলাম নামের ওই ক্রেতার চোখ যেন কপালে উঠল। বিস্ময় আর হতাশা নিয়ে বললেন, ‘২০২০ সালে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ১০০ টাকার আশপাশে ছিল। এখন সেই দামে একটি মাল্টাও মিলছে না। ছয় বছরের ব্যবধানে এভাবেই একটা ফল আমাদের মতো নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে?’
শামসুলের কথা ঠিক, ২০২০ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রাম নগরীর বাজারে মানভেদে প্রতি কেজি মাল্টার দাম ছিল ৮০ থেকে ৯০ টাকা। তবে ওই মাসের শেষ সপ্তাহে রোজা শুরু হলে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে ফলটির দাম এক লাফে ১৮০ টাকা করে দেন। এরপর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন দুই দফা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলে ‘লাইনে’ আসেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। প্রতি কেজি ১০০ টাকা দরে মাল্টা বিক্রি শুরু করেন তারা। পরে করোনার ধাক্কায় ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে বিদেশ থেকে আমদানি করা এই ফলটির দাম।
এখন মাল্টার দাম উঠেছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে। কয়েক সপ্তাহ আগেও খুচরা বাজারে মানভেদে ২৬০ থেকে ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে ফলটি। এখন সেই দাম প্রায় দ্বিগুণ। এর আগে গত বছরের আগস্টে মাল্টার দাম উঠেছিল ৪৪০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি, যা এতদিন ছিল সর্বোচ্চ। এবার সেই দামও ছাড়িয়ে গেছে ফলটি। পাইকারি বাজারেও এখন প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকায়। ‘ফলের রাজ্য’খ্যাত চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ও প্রধান পাইকারি ফলের বাজার ফলমন্ডিতে গতকাল ১৫ কেজির প্রতি কার্টন মাল্টা বিক্রি হয়েছে ৬ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে এসে সেটি ৫০০-৫২০টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা মাল্টাসহ কয়েকটি ফলের দাম বাড়ার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে দেখছেন। তবে ভোক্তাদের অভিযোগ, যুদ্ধ পরিস্থিতি কেবল অজুহাত। দেশে ডেঙ্গু ও হামের পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ায় মাল্টার মতো ফল খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। আর সেই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়েছেন। বাজারে কার্যকর তদারকি না থাকায় ইচ্ছেমতো দামে ফল বিক্রি করছেন তারা।
বাংলাদেশে বিদেশ থেকে ৩৮ ধরনের ফল আমদানি হয়। এসব বিদেশি ফলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় মাল্টা। সাতটি দেশ থেকে বাংলাদেশে মাল্টা আসে। এর বড় অংশই আসে মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত থেকে। এ ছাড়া চীন, ভুটান, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ড থেকেও মাল্টা আমদানি হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাইয়ে দেশে ২৩ হাজার ৭১৭ টন মাল্টা, আপেল, কমলা ও আঙুর আমদানি হয়েছে। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১ হাজার ১৮৬ টনে। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই প্রায় ২৪ হাজার টন ফল আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ আমদানি কমেনি; বরং বেড়েছে। এরপরও বাজারে মাল্টার দাম চড়া।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ আটকে থাকায় মাল্টার দাম বেড়েছে বলে দাবি করেছেন চট্টগ্রাম ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও ফলমন্ডির মেসার্স আখি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে সংযোগকারী বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হামলা করায় জাহাজগুলো ভিন্ন রুটে চলাচল করছে। অনেক জাহাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে আছে। এজন্য অনেক দেশ থেকে এখন জাহাজ আসতে পারছে না। মাল্টা এখন বেশি আসছে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে। এসব জাহাজ শ্রীলঙ্কার দিকে আটকে আছে। সে কারণে সংকট তৈরি হয়ে মাল্টার দাম বেড়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দাম অনেক কমে যাবে।’
তবে কনজ্যুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন পূর্বকোণকে বলেন, ‘ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা মাল্টার মতো ফল রোগীদের খাওয়াতে বলেছেন। বরাবরের মতো সেই সুযোগ লুফে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের নিয়ে আর কী বলব? কাল কেয়ামত হবে জানলে তারা আজ কাফনের কাপড়ের দামও মনে হয় বাড়িয়ে দেবেন।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্যাহ পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা এই বিষয়টি শুনেছি। দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
পূর্বকোণ/ইবনুর

















