উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ছিটমহল সেউতায় মরক্কো থেকে হাজার হাজার মানুষের অনুপ্রবেশের চেষ্টায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭২ জনে পৌঁছেছে।
উপকূলীয় এলাকা থেকে রবিবার নতুন করে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বরাতে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
মরক্কোর সীমান্ত ঘেঁষে থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অন্যতম প্রধান এই স্থলসীমান্তে গত বৃহস্পতিবার থেকে অভূতপূর্ব এই মানবিক বিপর্যয় শুরু হয়। প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি মানুষ জল ও স্থলপথে সেউতায় ঢোকার চেষ্টা চালান।
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার মানুষকে পুনরায় মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে।
সেউতায় স্প্যানিশ সরকারের প্রতিনিধি মিগুয়েল অ্যাঞ্জেল পেরেজ সাংবাদিকদের জানান, মর্মান্তিক এই ঘটনায় অন্তত ১,০০০ মানুষকে জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ছিটমহলটির পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে ব্যাপক কাজ করতে হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারীদের বরাতে জানা গেছে, উত্তাল সাগরে ডুবে এবং সীমান্ত প্রাচীর ও সৈকত রক্ষা বাঁধ টপকাতে গিয়ে ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে অনেকের মৃত্যু হয়েছে।
চরম অর্থনৈতিক অভাব-অনটন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজবে বিভ্রান্ত হয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ এই প্রাণঘাতী পথ বেছে নেন।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘এল পাইস’-কে সেউতার স্থানীয় নেতা হুয়ান হেসুস ভিভাস জানান, শহরের মর্গে এ পর্যন্ত ৮৮টি মরদেহ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে সাম্প্রতিক অনুপ্রবেশের ঘটনায় মারা যাওয়া ৭২ জন ছাড়াও গত দুই সপ্তাহে বিপজ্জনকভাবে সমুদ্র পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাওয়া অভিবাসীরাও রয়েছেন।
সেউতায় অবস্থানরত ফরাসি নাগরিক কারিমা আবনেজ কান্নাভেজা কণ্ঠে রয়টার্সকে বলেন, “সমুদ্রে তরুণদের মৃত্যু আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। ২০২৬ সালে এসে মাত্র দুই মাসের শিশু কোলে নিয়ে নারীদের এভাবে জীবন বাজী রেখে সমুদ্র পাড়ি দিতে হচ্ছে এবং মারা যেতে হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
তিনি আরও বলেন, “মরক্কোয় খাবার ও প্রয়োজনীয় সবকিছুই আছে। শোভন কাজ না থাকলে আমাদের সরকারের কাছে দাবি তোলা উচিত, ধর্মঘট করা উচিত। কিন্তু সমুদ্রে এভাবে গিয়ে জীবন দেওয়া কোনও সমাধান নয়।”
তবে মরক্কো ও স্পেনের সরকারি পরিসংখ্যানে তথ্যের বড় অমিল দেখা গেছে। মরক্কোর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মাত্র ১১ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে।
মরক্কোর দাবি, সেউতায় প্রবেশের চেষ্টাকারী মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। এছাড়া, স্পেনের অপর ছিটমহল ‘মেলিলা’য় আরও ১,১৩৫ জনকে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে বলে জানায় দেশটি।
উভয় দেশই এই বিশৃঙ্খলার পেছনে সামাজিক মাধ্যমের অপপ্রচার, মানব পাচারকারী চক্রের প্ররোচনা এবং স্পেনের একটি আইনি রায়ের ভুল ব্যাখ্যাকে দায়ী করেছে।
সমুদ্রপথে উদ্ধার করা অভিবাসীদের সরাসরি ফেরত পাঠানো যাবে না, এমন এক সিদ্ধান্তের কথা ছড়িয়ে পড়ায় এই ঢল নামে।
ঘটনাটির তীব্রতায় পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করতে সেউতা উপকূলে সাগরের পানিতে ৫০০ মিটারের কৃত্রিম ভাসমান প্রতিবন্ধক স্থাপন করা হয়েছে।
ইইউ-এর ২২টি সদস্য রাষ্ট্র সীমান্ত সুরক্ষায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে যৌথ চিঠি দিয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইতালি সাময়িকভাবে স্পেনের সঙ্গে তাদের পাসপোর্টমুক্ত ‘শেনজেন’ চলাচল চুক্তি এক মাসের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে।
পূর্বকোণ/রাকিব/পারভেজ















