চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ভিসা বাতিলের ‘গ্যাঁড়াকলে’ রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

ভিসা বাতিলের ‘গ্যাঁড়াকলে’ রেমিট্যান্স যোদ্ধারা

জাহাঙ্গীর টুটুল

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

বিদেশের মাটিতে নিজেদের মেধা ও অক্লান্ত শ্রমে গড়ে তোলা স্বপ্ন যেন ভেঙ্গে পড়েছে-পড়ছে বিনা বাতাসে। কোন আগাম নির্দেশনা-সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ ভিসা বাতিলের ‘গ্যাঁড়াকলে’ পড়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে আসা রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।

 

এসব প্রবাসী রেমিটেন্স যোদ্ধাদের অনেকেই ছুটিতে কিংবা ব্যস্ততার অবসরে দেশে এসেছিলেন। কারও হাতে ছিল কয়েক সপ্তাহের অবসর, কারও পরিকল্পনায় ছিল পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে আবার কর্মস্থলে ফেরার প্রস্তুতি। কেউ বছরের পর বছর প্রবাসে থেকে একটি দোকান দাঁড় করিয়েছেন, কেউ ব্যবসা গড়েছেন, কেউ স্ত্রী-সন্তানকে রেখে জীবন কাটিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। কিন্তু হঠাৎ একটি বার্তা- স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসা বাতিল। কেন বাতিল, তার স্পষ্ট কোন উত্তর নেই। অথচ ওপারে পড়ে আছে চাকরি, ব্যবসা, ঘরবাড়ি, ব্যাংক হিসাব, গাড়ি, দেনা-পাওনা, সন্তানের স্কুল-কলেজ, সবচেয়ে বড় কথা- তিলে তিলে গড়ে তোলা একটি জীবন।

 

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের জন্য এমন এক অনিশ্চয়তা গত জুলাই থেকে ক্রমেই বড় হচ্ছিল। শুরুতে সরকারি হিসাবে ৬২৬ জনের ‘অটো-ক্যানসেলেশন’-এর কথা বলা হলেও পরে দূতাবাস ৯৮৫ জনের তালিকা পাঠায়। সেপ্টেম্বরে এসে সরকারি বক্তব্যে সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার, পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জনে। অর্থাৎ এটি কোনো বি্িছন্ন ঘটনা নয়, সময়ের সঙ্গে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই বাংলাদেশি দূতাবাসের পরামর্শে আবেদনসহ প্রয়োজনীয় চাহিত তথ্য-ডকুমেন্ট পাঠিয়েছেন ই-মেইলে। তাতে কোন ফলাফল বা সুখবর পাওয়া গেছে বলে এমন কোন তথ্য ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে বলে জানা যায়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো- অনেক প্রবাসী দাবি করছেন তারা কোনো অপরাধ বা মামলায় জড়িত নন, ইউএই-তে বৈধভাবে চাকরি বা ব্যবসা করছিলেন এবং ছুটি কাটাতে বাংলাদেশে এসেছিলেন।

 

তাদের কারও কারও পরিবার এখনো ইউএই-তে। কারও ব্যবসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, কারো ভিসার মেয়াদ নিয়ম অনুযায়ী শেষের দিকে। এছাড়া কারও কর্মস্থল হারানোর শঙ্কা। ২৭ বছর ইউএই-তে থাকা এক বাংলাদেশি এপ্রিল মাসে দেশে আসার পর জুলাইয়ে জানতে পারেন, তার ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। কেন সেটি জানানো হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, এত মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর এমন সিদ্ধান্ত কেন-কীভাবে আসে, অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে কারণ জানানো হয় না? আরও বড় প্রশ্ন- বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনগুলো কখন, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে বিষয়টি মোকাবিলা করছে?

 

জুলাইয়ের শেষ দিকে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছিল, বিষয়টি কারিগরি ত্রুটি নাকি নির্দিষ্ট কোনো কারণে ঘটছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং ইউএই কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ করে তালিকা পাঠানো হয়েছে। কিন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৬২৬ থেকে ৪ হাজার ৮০০-তে পৌঁছে যাওয়ার বাস্তবতা প্রশ্ন তোলে- প্রাথমিক পর্যায়ের ক‚টনৈতিক তৎপরতা কি যথেষ্ট দ্রুত ও কার্যকর ছিল?

 

আরেকটি বিষয়ও পরিষ্কার হওয়া দরকার। ভিসা বাতিলের কারণ হিসেবে নথি জালিয়াতি, চাকরি বা নিয়োগকর্তার বিষয়, অভিবাসনসংক্রান্ত অনিয়ম কিংবা নিরাপত্তাজনিত যাচাইয়ের কথা বিভিন্ন সময়ে এসেছে। কিন্ত এগুলোর কোনটি কতজনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার স্বছ ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। ফলে বৈধ প্রবাসীর ভিসা বাতিল এবং অনিয়মকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা- দুটিকে একই পাল্লায় মাপার সুযোগ নেই।

 

দেশে এসে ভিসা ক্যানসেলের ‘গ্যাড়াকলে’ পড়া প্রবাসীদের একজন আরিফ হোসাইন। জানালেন- তিনি রাউজানের নোয়াপাড়ার বাসিন্দা, দীর্ঘদিন ধরে তার শিশু সন্তান অসুস্থ। তাই স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে ভারতের চেন্নাইয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, স্লট জটিলতার কারণে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন জমা দিতে দেরি হচ্ছিল। এরিমধ্যে খবর পেলেন- তার ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যানসেল হয়ে গেছে। কেন ক্যানসেল হলো- তার কোন সদুত্তর নেই। নিয়োগকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কিছু বলতে পারছেন না- কেন ক্যানসেল। পরে আরিফ জানতে পারেন এধরনের আরো অনেকের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্যানসেল হয়ে গেছে। পরে তিনি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ই-মেইলে ইউএইস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে আবেদন পাঠিয়েছেন। কিন্তু সমাধান এখনো মিলেনি।

 

একজন প্রবাসীর ইউএই-তে শুধু একটি ভিসা থাকে না, থাকে বহু বছরের শ্রমে গড়ে তোলা একটি অর্থনৈতিক ও পারিবারিক অস্তিত্ব। একটি ভিসা বাতিলের অর্থ অনেকের কাছে শুধু বিদেশে প্রবেশের অধিকার হারানো নয়- চাকরি হারানো, ব্যবসা হারানো, বিনিয়োগ ঝুঁকিতে পড়া, ঋণের বোঝা বাড়া, পরিবার বিচ্ছিন্ন হওয়া, সন্তানদের শিক্ষাজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং দেশে ফিরে নতুন করে অনিশ্চিত জীবন শুরু করা।

 

এই মানুষগুলোই তো দেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম বড় ভরসা। তাই তাদের সংকটকে নিছক ব্যক্তিগত দুর্ভোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রবাসী কল্যাণেরও পরীক্ষা। এখন প্রয়োজন শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের সংখ্যা প্রকাশ নয়- প্রতিটি বাতিলের কারণ চিহ্নিত করা, বৈধদের দ্রুত পুনর্বিবেচনার আওতায় আনা এবং যাদের চাকরি-ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়েছে তাদের জন্য কার্যকর কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে সরকারের জানানো উচিত- গত দুই মাসে মিশনগুলো কী উদ্যোগ নিয়েছে এবং বাস্তবে তার ফল কী।

 

ব্যবসা সফল-শ্রমজীবী প্রবাসীরা করুণা নয়, চান তাদের বৈধ অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তার পক্ষে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান ভূমিকা। কারণ তারা শুধু বিদেশে থাকা মানুষ নন- তাদের পাঠানো অর্থে দেশের অসংখ্য পরিবার বাঁচে, অর্থনীতি সচল থাকে। তাদের জীবন যখন দুই দেশের মাঝখানে ‘গ্যাঁড়াকলে’ আটকে যায়, তখন প্রশ্নটি শুধু একটি ভিসার নয়- প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্র কি তার রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাশে সত্যিই দাঁড়িয়েছে?

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট