চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে: চসিক সচিব

কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে: চসিক সচিব

পোস্টার নিয়ে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা

তাসনীম হাসান

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে চট্টগ্রাম নগরের সমতুল্য শহর খুব কমই আছে। পাহাড়-সমুদ্রঘেরা এই নগর সৌন্দর্যের পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ চট্টগ্রাম পরিচিত ‘প্রাচ্যের রানি’ নামে। সেই নগরের সৌন্দর্য ক্রমেই যেন বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নানা ‘সমস্যায় জর্জরিত’ এই শহরের নতুন যন্ত্রণা হয়ে এসেছে যত্রতত্র পোস্টার ও ব্যানার। দেয়াল, পিলার, সড়ক বিভাজকসহ নগরের নানা স্থাপনায় এখন চোখে পড়ছে পোস্টারের ‘দখল’।

 

বিশেষ করে কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রচারণামূলক পোস্টারে বদলে যাচ্ছে নগরের দৃশ্যপট। একদিকে পোস্টার তোলা, অন্যদিকে আবার সাঁটানো কিছুদিন পর একই জায়গায় ফিরছে নতুন পোস্টার। এভাবেই যেন পোস্টার নিয়ে ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছেই। গতকাল নগরের জাকির হোসেন সড়ক, চকবাজার, চট্টেশ্বরী সড়ক, জিইসি, বহদ্দারহাট ও কাজীর দেউড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ফ্লাইওভারের পিলার, বৈদ্যুতিক খুঁটি, দেয়াল-সবখানেই পোস্টার। যেখানে একটু খালি জায়গা, সেখানেই পোস্টার সাঁটিয়েছেন বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের ‘স্যারেরা’।

 

 

এদের বেশিরভাগই শিক্ষাপাড়াখ্যাত চকবাজার এলাকায় পোস্টারিং করলেও অনেকে পুরো শহরজুড়েই নিজের প্রচারণা চালাচ্ছেন। কদিন আগে ‘মুন্না স্যার’-এর পোস্টারে প্রায় ছেয়ে গিয়েছিল নগর। গত মাসের মাঝামাঝি অভিযান চালিয়ে ‘মুন্না স্যার’সহ দুটি কোচিং সেন্টারকে জরিমানা করে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। নেওয়া হয় মুচলেকা। একই সঙ্গে তাদের টানানো অবৈধ ব্যানার ও পোস্টার তাৎক্ষণিকভাবে অপসারণ করা হয়। এরপর ‘মুন্না স্যার’-এর পোস্টার কমলেও অন্যদের পোস্টারিং থামেনি।

 

জাকির হোসেন সড়কের ওমরগণি এমইএস কলেজের সামনের সড়কের দুই পাশের দেয়াল ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে অসংখ্য পোস্টার দেখা গেছে। এর মধ্যে একটি দেয়ালেই ‘সায়েম স্যার’ ও ‘আসিফ জাফর স্যার’-এর ৩৪টি পোস্টার। পাশাপাশি রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং সেন্টার ফোকাসের পোস্টারও। শুধু এখানে নয়, একই সড়কের চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজের গেট থেকে সামনের সড়কজুড়েও দেখা গেছে পোস্টার। কিছু পোস্টার তুলে ফেলা হলেও দেয়ালে রয়ে গেছে সেসবের দাগ।

 

‘সায়েম স্যার’-এর পোস্টার শুধু এই এলাকাতেই নয়, ছড়িয়ে আছে নগরের বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে। অথচ তাঁর কোচিং সেন্টার চকবাজারের কেবি প্লাজার তৃতীয় তলায়। মো. সায়েম রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। জাকির হোসেন সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় পোস্টারের এই দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ান বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা সাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘এই সড়কটি নগরের নান্দনিক সড়কগুলোর মধ্যে অন্যতম। দুই পাশে বড়-ছোট পাহাড়। উঁচু-নিচু আঁকাবাঁকা সড়কটি দেখতে দারুণ। কিন্তু সেই সড়কের সৌন্দর্য নষ্ট করছে পোস্টার।’

 

চকবাজারে যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই পোস্টার-ব্যানার। যেখানে একটু খালি জায়গা, সেখানেই পিঠ ঠেকিয়েছেন ‘স্যারেরা’। অন্তত ৪০ জন শিক্ষকের পোস্টার দেখা গেছে এখানে। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পোস্টার-ব্যানারও। শপিংমল হিসেবে পরিচিত গুলজার টাওয়ারের বাইরের দেয়াল দেখে বোঝার উপায় নেই, ভেতরে এটি বাণিজ্যিক ভবন। দেয়ালে দেয়ালে কোচিং শিক্ষকদের ব্যানার-ফেস্টুন। গুলজার টাওয়ারের বিপরীতে পূর্ব ও দক্ষিণে থাকা এসএমসি সিটি কমপ্লেক্স ও শাহানশাহ মার্কেটেও একই চিত্র কোথাও ঝুলছে, কোথাও সাঁটানো পোস্টার। এমনকি এই এলাকার সড়ক বিভাজকগুলোও পোস্টার থেকে রেহায় পায়নি।

 

আখতারুজ্জামান ও এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের অনেক পিলার ৫ আগস্টের পর গ্রাফিতির রঙে রাঙিয়েছিলেন শিক্ষার্থীরা। এখন বেশিরভাগ পিলারে সেই গ্রাফিতি আর দেখা যায় না; ঢেকে গেছে পোস্টারে। এম এ মান্নান ফ্লাইওভারের বহদ্দারহাট এলাকার পিলারগুলোর অবস্থা আরও করুণ। কোথাও সাঁটানো হয়েছে নতুন পোস্টার, কোথাও রয়েছে তুলে ফেলা পোস্টারের ছেঁড়া অংশ। আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভারের ২ নম্বর গেট থেকে জিইসি পর্যন্ত এলাকার বেশ কয়েকটি পিলারেও পোস্টারে ছড়াছড়ি।

 

চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগের কর্মীরা জানান, নিয়ম করে বিভিন্ন দেয়াল ও স্থাপনা থেকে পোস্টার অপসারণ করা হয়। তবে অপসারণের পরও রাতের আঁধারে আবার পোস্টার সাঁটানো হচ্ছে। ফলে এক জায়গার পোস্টার সরাতে না সরাতেই অন্য জায়গায় নতুন পোস্টারের দেখা মিলছে। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, বিচ্ছিন্নভাবে অভিযান পরিচালনা করে যত্রতত্র পোস্টারিং বন্ধ করা কঠিন। সব কোচিং সেন্টারের সঙ্গে বসে চসিককে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে। পোস্টারিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করে সেখানে প্রচারণা সীমাবদ্ধ রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে নগরের দেয়াল-পিলারে পোস্টারের দৌরাত্ম্য কমানো সম্ভব হবে।

 

এবার পোস্টারিং নিয়ে আরও কঠোর হওয়ার কথা জানিয়েছেন চসিকের সচিব মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন। তিনি পূর্বকোণকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে কোচিং সেন্টারগুলোকে জরিমানা করেছি। মুচলেকা নিয়েছি। আবার তাদের দিয়ে পোস্টারও অপসারণ করা হয়েছে। এরপরও কেউ কেউ পোস্টারিং করে যাচ্ছেন। এখন তাদের পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হবে। যদি পোস্টার লাগানো বন্ধ না করে তাহলে কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট