কম বয়সেই বিয়ে। শুরু হলো সংসার, ব্যস্ততা। একসময় যে মেয়েটির চোখে ছিল পড়াশোনা আর নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন, সংসারের দায়িত্বে সেই পথ থেমে গেলো। প্রবল মেধাবী হয়েও বেশিদূর পড়াশোনা করা হয়নি হোসনে আরার। তবে নিজের অপূর্ণতাকে তিনি আক্ষেপ হয়ে থাকতে দেননি। মনে মনে ঠিক করে নেন-সন্তানদের পড়াতে উজাড় করে দেবেন নিজের সর্বোচ্চটুকু।
একসময় একে একে পৃথিবীতে এলো তিন মেয়ে। তাদের ঘিরেই শুরু হলো মায়ের নতুন স্বপ্ন, নতুন লড়াই। মেয়েদের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেলেন হোসনে আরা। স্কুল-কলেজে আনা-নেওয়া, সংসারের কাজ সামলানো, আবার মেয়েদের নিয়ম করে পড়ার টেবিলে বসানো-কিছুই বাদ যায়নি। বছরের পর বছর যত্ন, ত্যাগ আর অপেক্ষার পর সেই স্বপ্নেরই পূর্ণতা এলো অবশেষে। মায়ের তিন কন্যাই আজ চিকিৎসক। এ যেন শুধু তিন মেয়ের সাফল্যের গল্প নয়; নিজের অপূর্ণ স্বপ্নকে সন্তানদের সাফল্যের মধ্য দিয়ে পূর্ণ করে নেওয়া এক মায়েরও আখ্যান।
এই তিন বোন হলেন ডা. ফাতেমা সাদিয়া তামান্না, ডা. হালিমা সাদিয়া তাবাসসুম ও ডা. আয়েশা সিদ্দিকা মিম। তাঁদের বাড়ি বাঁশখালীর বাহারছড়ার রত্নপুরে। পড়াশোনায় সাফল্যের পর এখন তাদের পরিচয় ‘রত্নপুরের রত্ন’।
মেয়েদের পড়াশোনার সময় যেন হোসনে আরার নিজেরও নতুন করে পড়াশোনা শুরু হয়েছিল। তাঁদের বই-খাতা, পরীক্ষা, ফল-সবকিছুতেই ছিল মায়ের নিবিড় নজর। মেয়েদের পরীক্ষা এলেই নিজের সব ব্যস্ততা সরিয়ে রাখতেন তিনি। রাত বাড়লেও ঘুমোতেন না, পাশে বসে থাকতেন। তিন বোনের পথচলাটাও যেন একই সুতোয় গাঁথা। একই স্কুল, একই মেডিকেল কলেজ। শুরুটা ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে, শেষটা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে (চমেক)। সবখানেই রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর।
এই অসাধারণ যাত্রার শুরু বড় বোন ফাতেমাকে দিয়ে। ৫৯তম ব্যাচে চমেকে ভর্তি হন তিনি। তাঁর দেখানো পথেই এগিয়ে যান হালিমা। ৬১তম ব্যাচে ভর্তির সুযোগ পান তিনি। এরপর সবার ছোট মিম ৬৩তম ব্যাচে ভর্তি হন। সদ্য প্রকাশিত এমবিবিএসের ফলে তিনিও পাস করেছেন।
তিন মেয়েকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্নটাও হঠাৎ করে আসেনি হোসনে আরার মনে। ফাতেমার জন্মের সময় নারী চিকিৎসক না থাকায় পুরুষ চিকিৎসকের মাধ্যমে অ্যানেসথেশিয়া দিতে হয়েছিল তাঁকে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই স্বামী-স্ত্রী দুজনের মনে জন্ম নেয় একটি স্বপ্ন। হোসনে আরা বলেন, ‘বিষয়টি ছিল আমার জন্য অস্বস্তির। তখনই আমরা দুজন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, মেয়েকে ডাক্তার বানাব।’ সেই সিদ্ধান্তই পরে তিন মেয়ের জীবনের পথরেখা হয়ে যায়।
এই সাফল্যের পেছনে বাবাও ছিলেন। রিয়াজউদ্দিন বাজারে ব্যবসা ছিল আবুল মনছুরের। সেই ব্যবসার আয়ের বড় একটি অংশই ব্যয় করেছেন মেয়েদের পড়াশোনায়। মা ছুটেছেন মেয়েদের পেছনে, বাবা জুগিয়েছেন সামর্থ্যের শেষটুকু।
পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। শুনতে হয়েছে নানা জনের নানা কথা। মেয়েদের ব্যয়বহুল পড়াশোনার খরচ জোগাতে কষ্ট করতে হয়েছে মনছুর-হোসনে আরা দম্পতিকে। আর্থিকভাবে খুব সচ্ছল না হওয়ায় গৃহশিক্ষকও দেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়েরা নিজেদের খরচ নিজেরাই সামলেছেন। মেডিকেলে পড়ার সময় তিন-চারটি টিউশনও করেছেন।
মেয়েদের এই সংগ্রামই মায়ের মনে সবচেয়ে বেশি দাগ কেটেছে। হোসনে আরা বলেন, ‘মেডিকেলে এসে তিন-চারটা টিউশন করে মেয়েদের পরিবারের খরচ চালিয়ে পড়াশোনা করতে হয়েছেÑএটাই আমার কাছে বেশি কষ্টের ছিল।’
মেয়েদের পরীক্ষার সময় যেন নিজেই পরীক্ষার্থী হয়ে উঠতেন মা। ‘আমি তাদের পাশে না থাকলে তাদের পড়ার ক্ষতি হতে পারে-সবসময় এমন মনে হতো। তাই পরীক্ষার সময় তাদের ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে মনোযোগ দিতাম না,’ বলেন হোসনে আরা।
তিন বোনের চোখেও সাফল্যের গল্পটি আসলে মায়ের ত্যাগের গল্প। তারা বলেন, ‘আম্মু পরীক্ষার সময় অসম্ভব কষ্ট করতেন। কোনো কাজ করতে দিতেন না, রাত জেগে পাশে বসে থাকতেন। আব্বু-আম্মু সবসময় তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তেন। তাঁদের এই চেষ্টা আমাদের অনুপ্রাণিত করত।’
তিন বোন ছিলেন একে অপরের পরিপূরক। একজনের পড়া আটকে গেলে অন্যজন পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানসিকভাবেও জোগাতেন সাহস। মেডিকেলে পড়তে চাওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁদের পরামর্শÑ‘নবম-দশম শ্রেণি থেকেই বেসিক ক্লিয়ার করতে হবে। আর সৃষ্টিকর্তার কাছে মন থেকে চাইতে হবে।’
হোসনে আরা-আবুল মনছুর দম্পতির সন্তানদের গল্পের এখানেই শেষ নয়। পরিবারের সবার ছোট, চোখের মণি তালহা বিন মনছুর মাত্র সাত বছর বয়সেই পবিত্র কোরআন হিফজ করে গড়েছে কীর্তি।
তিন চিকিৎসক কন্যা, এক হাফেজ সন্তান। আজ হোসনে আরার জীবনের সেই পুরোনো অতৃপ্তির আর কোনো জায়গা নেই। তিনি বলেন, ‘কম বয়সে সংসারের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়া চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে জীবনের প্রতিটি ধাপে পড়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতাম। নিজের মধ্যে মেধা ও প্রতিভা থাকার পরও আমি যেটা করতে পারিনি, তা আমার মেয়েদের দিয়ে করার স্বপ্ন দেখতাম। আল্লাহর দোয়ায় মেয়েরা আমার স্বপ্ন পূরণ করেছে।’
এখন মেয়েদের কাছে একটাই চাওয়া হোসনে আরার, ‘মেয়েরা যেন এমনভাবে বেড়ে ওঠে, মানুষের পাশে থাকে। যেন তাদের কারণে হাশরের মাঠে আল্লাহর কাছে কোনো জবাবদিহি করতে না হয়।’
হোসনে আরার নিজের স্বপ্ন থেমে গিয়েছিল কম বয়সে। সন্তানদের সাফল্যের ভেতর দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে মায়ের সেই অপূর্ণ জীবন। সন্তানেরা যখন মায়ের স্বপ্নের সমান বড় হয়ে ওঠে, তখনই তো মা হয়ে ওঠেন ‘রত্নগর্ভা’!
পূর্বকোণ/ইবনুর

















