মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মধ্যে পড়ে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি প্রায় চার মাস আটকে ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। সেই জাহাজে দায়িত্ব পালন করছিলেন চট্টগ্রামের ২৫ বছর বয়সী থার্ড অফিসার মোহাম্মদ আরিফ ইফতেখার। প্রতিদিন মৃত্যুভয় নিয়ে কাজ করে যাওয়া, জাহাজের মাত্র ১শ মিটার সামনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, রাতের পর রাত মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যাওয়া, সীমিত পানির ব্যবহার আর পরিবারকে প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন রাখার অভিজ্ঞতা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।
দৈনিক পূর্বকোণের কাছে প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর সেসব দিনের দৈনন্দিন উল্লেখযোগ্য চিত্র তুলে ধরলেন আরিফ। একান্ত সাক্ষাৎকারে এই তরুণ বলেন, ‘আমরা বেঁচে ফিরব কি না জানতাম না। প্রথম দিকে প্রতিটি মুহূর্তেই মনে হতো-এই বুঝি শেষ। পরিবারের কথা খুব মনে পড়ত, কিন্তু তাদের কিছুই বুঝতে দিতাম না।’
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার করেরহাট এলাকার ছেলে আরিফ বেড়ে উঠেছেন নগরীতে। বাবা আব্দুল হক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা, মা নাহিদা সুলতানা গৃহিণী। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনিই সবার ছোট। বড় ভাই ও বড় বোন চিকিৎসক, ছোট বোন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন।
গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি এবং চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে ভর্তি হন এই তরুণ। সেখান থেকেই শুরু হয় তার নাবিক জীবন। গত চার বছর ধরে সমুদ্রে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এটিই ছিল তার তৃতীয়বারের মতো যাত্রা।
আরিফ জানান, গত ৩১ জানুয়ারি ‘বাংলার জয়যাত্রা’ নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যান। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছানোর পরই তারা প্রথম বড় ধরনের হামলার মুখোমুখি হন।
আরিফ বলেন, ‘আমাদের জাহাজের প্রায় ১০০ মিটার সামনে একটি অয়েল টার্মিনালে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। তখন মনে হচ্ছিল, যদি একটি তেলের ট্যাংক বিস্ফোরিত হয়, তাহলে একের পর এক বিস্ফোরণ হবে। আমরা খুবই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম।’
‘প্রথম দিকে কেউই বুঝতে পারেননি পরিস্থিতি এতটা ভয়াবহ হবে। পরে ক্যাপ্টেন ও জাহাজের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা এবং কোম্পানির নিয়মিত যোগাযোগে ধীরে ধীরে সবাই নিজেদের সামলে নেন।’- যোগ করেন আরিফ।
তবে মৃত্যু যেন এক রাতে খুব কাছেই চলে এসেছিল, সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে এখনো গলা কাঁপে আরিফের। বলেন, ‘তখন ব্রিজ ডিউটিতে ছিলাম। দেখি সামনে থেকে একটা আলো আসছে। বাইরে গিয়ে দেখার পর সেটি আমার মাথার প্রায় ৩শ থেকে ৪শ মিটার ওপরে বিস্ফোরিত হয়| ওই দিন জীবনে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিলাম।’
চার মাসের মধ্যে প্রথম দেড় মাস প্রায় প্রতিরাতেই মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উড়ে যেতে দেখেছেন বলে জানান আরিফ। দিনের বেলায় পরিস্থিতি তুলনামূলক শান্ত থাকলেও রাত নামলেই আতঙ্ক বেড়ে যেত। আরিফের ভাষ্য ছিল- ‘ঘুমাতেও ভয় লাগতো। সব সময় মনে হতো, যদি কোনো ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন জাহাজে এসে পড়ে?’
দীর্ঘদিন একই জায়গায় আটকে থাকায় মানসিক চাপের পাশাপাশি পানির সংকটও দেখা দেয়। জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ফ্রেশ ওয়াটার জেনারেটরও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বাইরে থেকে পানি আনতে হয়েছে এবং সীমিত পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়েছে। যদিও কোম্পানি নিয়মিত খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের চেষ্টা করেছে।
এই সময় প্রতিদিন পরিবারের সঙ্গে কথা বললেও প্রকৃত পরিস্থিতি কখনো জানাননি তিনি। আরিফ বলেন, ‘পরিবার নিউজে কিছু দেখত। কিন্তু আমরা বলতাম, তেমন কিছু না। আসলে বাস্তবতা টিভিতে যা দেখানো হতো, তার চেয়েও ভয়াবহ ছিল। কিন্তু সেটা বললে ওরা আরও ভেঙে পড়ত।’
পরিবারের কথাও উঠে আসে তার কণ্ঠে। তিনি বলেন, ‘পরে জানতে পেরেছি, মা প্রায় প্রতিদিন কাঁদতেন। বাবা বাইরে থেকে নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেঙে পড়েছিলেন।’
জাহাজের ৩১ জন নাবিকের মনোবল ধরে রাখতে নিয়মিত সেফটি মিটিং, সিনিয়র কর্মকর্তাদের অনুপ্রেরণা এবং অবসরে টেবিল টেনিস, ক্যারাম, দাবা খেলা ও একসঙ্গে সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। শুরুতে কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়লেও ধীরে ধীরে সবাই মানসিকভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের মুহূর্ত ছিল হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের সময়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার সেই যাত্রায় জাহাজের কেউ ঘুমাতে পারেননি।
আরিফ বলেন, ‘আমরা সবাই আতঙ্কে ছিলাম। সামনে থাকা জাহাজকে অনুসরণ করছিলাম। যদি তাদের ওপর হামলা হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ফিরে আসব- এমন পরিকল্পনাই ছিল। ওই পাঁচ ঘণ্টা জাহাজে কেউ ঘুমায়নি।’
অবশেষে দেশে ফেরার অনুমতি পাওয়ার খবর আসে গত ১০ থেকে ১২ জুলাইয়ের মধ্যে। জাহাজ থেকে নামার মুহূর্তটিই তার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন স্মৃতি। তিনি বলেন, ‘জাহাজ থেকে নামতে পারছি, এটাই তখন বিশ্বাস হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, নতুন করে জীবন ফিরে পেলাম।’
দেশে ফিরে বিমানবন্দর থেকে প্রথম ফোন করেন মা ও বড় বোনকে। এখন পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালেও এখনও পুরো ঘটনার বিস্তারিত তাদের বলতে পারেননি।
ভবিষ্যতে আবার একই রুটে যেতে হলে কী করবেন- এমন প্রশ্নে আরিফের জবাব, ‘পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে অবশ্যই যাব। তবে এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কোম্পানিও কাউকে যেতে বলবে না বলে আমি বিশ্বাস করি|’
পূর্বকোণ/রাকিব















