চট্টগ্রাম বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

বন্যায় কৃষকের সর্বনাশ

বন্যায় কৃষকের সর্বনাশ

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

২২ জুলাই, ২০২৬ | ৬:০৭ অপরাহ্ণ

বাঁশখালীর পালিগ্রামের শীলপাড়া এলাকায় ১৫ গন্ডা জমিতে সবজি চাষ করেছেন মোজাহের আহমদ। বন্যায় সব ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। মোজাহের বললেন, ‘দুটি জমিতে করলা ও লাউ চাষ করেছি। বিক্রির আগেই সব শেষ হয়ে গেছে। কৃষক একেবারে মরে গেছে।’

 

একই এলাকার নেজাম উদ্দিন ১২ গন্ডা জমিতে সবজি চাষ করেছেন। দুই মাস ধরে নিরলসভাবে শ্রম দিয়েছেন। খরচ হয়েছে ২২-২৩ হাজার টাকা। তিনিও একই সুরে বললেন, ‘এক হাজার টাকার সবজিও বিক্রি করতে পারিনি। বিক্রি করার সময়ে বন্যা সব নষ্ট করে দিয়েছে। একেবারে পথে বসার উপক্রম হয়েছে।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবারের বন্যায় এক লাখ ২৬ হাজার ৫১১ কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

বেশি ক্ষতি হয়েছে রোপা আউশ, গ্রাষ্মকালীন সবজি ও আমনের বীজতলার। কৃষি বিভাগে তথ্যমতে, এবার ৩০ হাজার ২২ হেক্টর জমিতে আউশ ধান রোপণ করা হয়েছে। এরমধ্যে ১১ হাজার ৮৫৩ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৪৯ হাজার ২০০ জন কৃষক। ৬ হাজার ৮২৪ হেক্টর জমির সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫৯ হাজার ৭০ জন কৃষক। ১৪ হাজার ৪১৫ জন কৃষকের ৯৬০ হেক্টর জমির আমনের বীজতলা নষ্ট হয়েছে। এছাড়াও আদা, হলুদসহ অন্যান্য চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মো. ওমর ফারুক পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রণোদনা হিসেবে ইতিমধ্যে ৬ টন বীজ বিতরণ করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের নিজস্ব উদ্যোগে বীজতলা তৈরি করা হচ্ছে। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কাজ করে যাচ্ছে কৃষি অধিদপ্তর।’ তিনি বলেন, বন্যার ক্ষতি পোষাতে সরকার প্রণোদনা হিসেবে নগদ অর্থ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

 

আশা করছি, দু-একদিনের মধ্যে এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা আসতে পারে। জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, এবারের বন্যায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ৪০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মারা গেছে ১৬ জন। ১৫ হাজার ২২৮টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত ৬০২০টি ঘর। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষির। গ্রামীণ রাস্তাঘাটের অবস্থাও করুণ।

 

বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ ও লোহাগাড়া উপজেলায়। এরমধ্যে আবার বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বাঁশখালীর শেখেরখীল এলাকার রশিদ মিয়া দুই কানি জমিতে আউশ ধান রোপণ করেছেন। এক কানি জমিতে সবজি ক্ষেত করেছেন। বন্যায় তার ধান-সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

 

রশিদ মিয়া বলেন, ধার-দেনা ও ঋণ করে চাষাবাদ করেছেন। এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকার ঋণ নিয়েছেন কালীপুরের সাধন ধরের স্ত্রী। সেই ঋণের টাকায় চাষাবাদ করেছেন স্বামী। পানিতে ডুবে রোপা আউশ, আমনের বীজতলা ও সবজি ক্ষেত সব শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ফলন ভালো হয়েছিল। ৭০-৮০ হাজার টাকার সবজি বিক্রির আশা করেছিলাম। আশা তো পূরণ হয়নি। এখন ঋণের কিস্তি কীভাবে শোধ করবো, তা নিয়ে টেনশনে রয়েছি।’

 

কৃষকেরা জানান, টানা পাঁচ-ছয় দিনের বৃষ্টিতে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয়। ধান ও সবজি ক্ষেত পানিতে ডুবে ছিল। পানি নেমে যাওয়ার পর দেখা যায়, সব ক্ষেত-সবজি পচে গেছে। বাঁশখালীর বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যার পানি নেমে গেছে। তবে বিভিন্ন এলাকায় এখনো জমি-বাড়ি ও সড়ক পানিতে ডুবে রয়েছে। বন্যার পানি কমে যাওয়ায় ফসলের ক্ষয়ক্ষতি স্পষ্ট হচ্ছে। বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে দেখা গেছে, ক্ষেতে পচে পড়ে রয়েছে সবজি-ধান ক্ষেত। কৃষকেরা এসব জমি পরিষ্কার করার কাজ করছেন।

 

পালিগ্রামের কৃষক নেজাম উদ্দিন ও মোজাহের আহমদ বলেন, শত শত কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কৃষকের সর্বনাশ হয়েছে। একেবারে মরে গেছে। কৃষক নবী মিয়া বলেন, প্রায় ৬০ শতক জমিতে করলা, ঢ্যাঁড়স ও বরবটি চাষ করেছিলাম। কিছুদিন পর থেকে ফলন হতো। এখন পানিতে ডুবে থাকায় পুরো ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে।

 

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট