
একবার নয়, দু’বার নয়-টানা তিনবার, প্রায় ১৭ বছরের একচ্ছত্র আধিপত্য। এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী যেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র পদটিকে নিজের জন্য স্থায়ী আসনে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু ২০১০ সালে ‘নিখুঁত কৌশলে’ সেই অটল দুর্গে ফাটল ধরায় বিএনপি, মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে তারই রাজনৈতিক শিষ্য মনজুর আলমকে প্রার্থী ঘোষণা করে দলটি।
‘গুরু মারা বিদ্যায়’ মনজুর আলমও প্রায় এক লাখ ভোটের ব্যবধানে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে সবাইকে চমকে দেন। সেই নির্বাচনে হারার পর মহিউদ্দিন হতাশ হয়ে পড়েন। দলীয় বলয়ে এক সময়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত এই নেতা পরে আর পাননি দলীয় মনোনয়নও। বিএনপির এই ‘ট্রাম্পকার্ড’ তখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বেশ আলোচিত হয়েছিল। এরপর ২০১৫। আবারও বিএনপি প্রার্থী করে মনজুর আলমকে। কিন্তু ভোট চলাকালীনই ‘ভোট ডাকাতি’র অভিযোগ তুলে তিনি বর্জন করেন নির্বাচন। তবুও তার প্রতীকে পড়ে তিন লাখের বেশি ভোট-যা পরাজয়ের মধ্যেও এক অদ্ভুত রাজনৈতিক উপস্থিতির সাক্ষ্য দেয়। সেই হারের পর রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েন বেগম খালেদা জিয়ার এক সময়ের এই উপদেষ্টা। ঘোষণা দেন রাজনীতি থেকে অবসরেরও। কিন্ত পরের বছরগুলোতে তাকে শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীতে কেক কাটতে ও মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করতে দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তিনি আবার নানা কর্মসূচির কারণে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রীয় হচ্ছেন-এমন আলোচনাও ওঠে। যদিও পরে সেটি হয়নি।
মনজুর আলম আবারও আলোচনায়। আওয়ামী লীগ, বিএনপির পর এবার তার ঠিকানা কি হচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সেই আলোচনা হচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরে। এই আলোচনাকে আরও উসকে দিয়েছে এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য (এমপি) হাসনাত আবদুল্লাহর সঙ্গে তার সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ। গত মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখের দিন নগরের কাট্টলী এলাকায় মনজুর আলমের বাসভবনে এই সাক্ষাতের খবর পেয়ে সেখানে অবস্থান নেন স্থানীয় ছাত্রদল ও যুবদলের নেতাকর্মীরা। নিজেদের জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে তারা হাসনাত বের হওয়ার সময় তাঁকে নানা প্রশ্ন করেন। তারা হাসনাতকে বলেন, ‘আপনার আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কাজ কী? আপনি একজন জুলাই যোদ্ধা। সংসদে দাঁড়িয়ে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন। তাহলে আওয়ামী লীগের দোসরের বাসায় কেন?’ পরে যদিও ওই ব্যক্তিরাই তাকে গাড়িতে তুলে দেন। হাসনাতও তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলে বিদায় নেন।
আলোচনা-সমালোচনা: হাসনাত-মনজুরের সাক্ষাতের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা সহজেই থামেনি। এই ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি বয়ান। এনসিপির পক্ষ থেকে যেমন বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তেমনি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বর্তমান মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতারা মনজুর আলমের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার ছবিগুলো সামনে এনে হাসনাত আবদুল্লাহর সমালোচনা করছেন। আবার এনসিপির নেতারা মনজুর আলমের সঙ্গে থাকা বিএনপি নেতাদের ছবিগুলো সামনে এনে ‘কাউন্টার’ দিচ্ছেন।
এই সাক্ষাতকে কেন্দ্র করে যখন নানা ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে, তখন নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন মনজুর আলমও। তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রামে হাসনাত আব্দুল্লাহ সাহেবের একটি প্রোগ্রাম ছিল। তিনি চট্টগ্রামে এসে আমাকে ফোন দিয়েছিলেন দুপুরে। বলেছিলেন আমার বাসায় আসবেন। আমি তাকে দুপুরে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। বিকেল তিনটার দিকে হাসনাত আব্দুল্লাহ বাসায় আসেন এবং দুপুরের খাবারও খান। কিছুক্ষণ পরে লোকাল কিছু ছেলে বাইরে জড়ো হয়েছিল। পরে হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজে গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে সাড়ে পাঁচটা ছয়টার দিকে চলে যান।’
মনজুর আলমের সঙ্গে হাসনাতের এই সাক্ষাতকে ‘আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র’-হিসেবে দেখছেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি হাসনাত আবদুল্লাহর ভ‚মিকার সমালোচনা করে বলেন, ‘হাসনাত আবদুল্লাহরা নিজেদের জুলাই-আগস্টের যোদ্ধা হিসেবে দাবি করেন এবং সংসদে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে তারা তাদেরই বাসায় যাচ্ছেন যারা গত ১৬ বছর ধরে এই ফ্যাসিবাদকে লালন-পালন করেছে এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপের পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। যারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল, আজ তারাই সেই ফ্যাসিবাদিদের তোষামোদ করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
মনজুর আলমই কি এনসিপির প্রার্থী: ১৬ বছর আগে যে মনজুর আলমকে সমর্থন দিয়ে জয়ী করে চমক দেখিয়েছিল বিএনপি, এবার সেই মনজুরকে কি বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধেই দাঁড় করাতে চায় এনসিপি-সেই আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনার শুরু গত ২ মার্চ। সেদিন ছিল এনসিপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক ইফতার মাহফিল। সেখানে সরবরাহ করা পানির বোতলে ছিল মনজুর আলমের ছবি। মনজুর আলমের ‘অনুদানে’ এনসিপি ইফতার আয়োজন করে বলে তখন আলোচনা হয়। এনসিপির ইফতার আয়োজনের পর তখনই দলটিতে মনজুর সক্রিয় হচ্ছেন এমন আলোচনা তৈরি হয়েছিল। এবার হাসনাতের তার বাসায় যাওয়ার পর সেই আলোচনায় যেন সিলমোহর পড়লো।
শুধু এনসিপিতে যোগদান নয়, চসিক মেয়র পদে মনজুর দলটির প্রার্থী হতে পারেন এমন আলোচনাও হচ্ছে। এনসিপির ছাত্র সংগঠন হিসেবে পরিচিত জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদারও সেই ইঙ্গিত দিয়েছেন। মঙ্গলবারের ঘটনার পর ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, ‘সাবেক মেয়র মনজুর এনসিপির সমর্থনে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন থেকে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। বিএনপি যেখানে অন্তর্কোন্দলে বিভক্ত সেখানে এনসিপির শক্তিশালী ক্যান্ডিডেট তাদের ভয়ের কারণ হবে এটাই স্বাভাবিক।’
যদিও মেয়র পদে মনজুর আলমকে প্রার্থী করা নিয়ে দলীয় ফোরামে এখনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন এনসিপির সদস্যসচিব ও এমপি আখতার হোসেন। কিন্তু রাজনীতিতে যে শেষ বলতে কিছু নেই! সেই ‘শেষ’ দেখতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কিছুদিন।
পূর্বকোণ/ইবনূর