চট্টগ্রাম রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

‘শূন্য মৃত্যু’র লক্ষ্যযাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের থাবা

‘শূন্য মৃত্যু’র লক্ষ্যযাত্রায় বিষাক্ত গ্যাসের থাবা

ইমাম হোসাইন রাজু

১৬ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙা শিল্পকে নিরাপদ করতে একের পর এক ইয়ার্ডকে ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তর করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নানা শর্তও আরোপ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিকের মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনা। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, অবকাঠামো ও সনদের পরিবর্তন এলেও শ্রমিকের প্রাণহানি থামছে না। সর্বশেষ ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যু সেই প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে। ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হওয়ার পরও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে?

 

জাহাজভাঙা শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের (ইপসা) এডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ও পরিমাপযোগ্য সূচকসহ আলাদা কোনো সরকারি রোডম্যাপ প্রকাশ্যে নেই। ২০৩০ সালের রোডম্যাপে হংকং কনভেনশনের মান বাস্তবায়ন, শ্রমিক প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা মহড়া, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো লক্ষ্য রয়েছে। তবে বাস্তবে নীতিমালা ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির সঙ্গে মৃত্যুর হার শূন্যে নামানোর লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।

 

ইপসার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সীতাকুÐের শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ১২৯ শ্রমিক নিহত এবং ২০৫ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ বছর ছিল ২০১৯। ওই বছর ২৩ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালে ৪৯টি দুর্ঘটনায় চার শ্রমিক নিহত এবং ৬২ জন আহত হন। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক নিহত ও ২৫ জন আহত হন। সর্বশেষ ১৪ আগস্টের ঘটনায় আরও নয়জনের মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছর এ পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ জনে।

 

অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) এর এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে দেশের জাহাজভাঙা শিল্পে দুর্ঘটনায় ১৩৭ শ্রমিক মারা গেছেন। সবচেয়ে বেশি ২৩ জনের মৃত্যু হয় ২০১৯ সালে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২৮টি দুর্ঘটনায় তিন শ্রমিক মারা যান। আহত হন ২৫ জন। তাঁদের মধ্যে ১০ জন গুরুতর এবং ১৫ জন মাঝারি ধরনের আঘাত পান। সর্বশেষ নয়জনের মৃত্যু যোগ করলে ২০১৫ সালের শুরু থেকে চলতি আগস্ট পর্যন্ত প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়ায় অন্তত ১৪৯।

 

সংস্থাগুলোর তথ্যে দেখা যায়, দুর্ঘটনার ধরনও খুব একটা বদলায়নি। ভারী বস্তু পড়ে যাওয়া, গ্যাস ও বিস্ফোরণ, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়া, ওপর থেকে পড়ে যাওয়া এবং ক্রেন-সংক্রান্ত দুর্ঘটনাই বারবার ঘটছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ভারী গার্ডার বা অন্য বস্তু পড়ে নয়টি দুর্ঘটনা, ক্রেন, হুক ও তার-সংক্রান্ত আটটি এবং আগুন ও দগ্ধ হওয়ার পাঁচটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও ছিল।

 

এডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ আলী শাহীন বলেন, গ্রিন ইয়ার্ডের সনদকে শতভাগ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সনদ পাওয়ার পর তার শর্তগুলো প্রতিদিনের কাজে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না। যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্যাস পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ, আবদ্ধ স্থানে নিরাপদ প্রবেশ, শ্রমিকের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা, কার্যকর তদারকি এবং পরিদর্শনের পর সংশোধনমূলক ব্যবস্থা বাস্তবায়নে এখনও ঘাটতি রয়েছে।

 

তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৩টি গ্রিন ইয়ার্ড রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার হংকং কনভেনশনভিত্তিক তালিকায় রয়েছে বলে প্রকাশ্য তথ্য থেকে জানা যায়। তবে গ্রিন সনদ বা হংকং কনভেনশন অনুমোদন থাকলেই একটি ইয়ার্ড শতভাগ নিরাপদ, এমন নিশ্চয়তা নেই। সর্বশেষ দুর্ঘটনাই এর বড় উদাহরণ।

 

দুর্ঘটনাকবলিত ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড গ্রিন ইয়ার্ড এবং হংকং কনভেনশন অনুমোদিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অথচ সেখানে জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে একসঙ্গে নয় জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সনদ পাওয়ার পর ইয়ার্ডে নিরাপত্তা শর্তগুলো নিয়মিতভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন ও গ্যাস পরীক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল।

 

এদিকে, সর্বশেষ দুর্ঘটনাটিও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। দুর্ঘটনার প্রায় চার ঘণ্টা পর ওই জাহাজের ভেতরে ১০ দশমিক ৮ পিপিএম হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তাদের ধারণা, দুর্ঘটনার সময় গ্যাসের মাত্রা ১০০ পিপিএমের বেশি থাকতে পারে। অত্যন্ত বিষাক্ত এই গ্যাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে তিন মিনিটের মধ্যেই শ্রমিকদের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙার জন্য আমদানি করা জাহাজকে ইয়ার্ডে প্রবেশের আগে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো সংস্থার কাছ থেকে গ্যাস-মুক্তকরণ সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। অথচ দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি ইয়ার্ডে কাটার আগে প্রয়োজনীয় গ্যাস-মুক্তকরণ সনদ পেয়েছিল বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স এন্ড রিসাইক্লার্স এসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটিরও এ ধরনের সনদ ছিল। পরিবেশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের সার্টিফিকেট পাওয়ার পরই সাধারণত পুরোনো জাহাজে কাটার কাজ শুরু করা হয়।

 

ফলে প্রশ্ন উঠছে- দুর্ঘটনার আগে গ্যাস পরীক্ষা হয়েছিল কি না, হলে কখন হয়েছিল, কীভাবে হয়েছিল এবং সেই পরীক্ষার ফল কী ছিল? বিএসবিআরএ সভাপতি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, গ্যাস-মুক্তকরণ সনদ থাকার পরও কীভাবে জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাস রয়ে গেল, তদন্তে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হবে। কোনো অবহেলা প্রমাণিত হলে সনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

 

মোহাম্মদ মহসিন আরও বলেন, জাহাজটি আগে এলএনজি বহনে ব্যবহৃত হতো। দেড় বছর আগে জাহাজটি আনা হয় এবং সতর্কতার সঙ্গে কাজ করা হচ্ছিল। ইয়ার্ডটিও সার্টিফায়েড গ্রিন ইয়ার্ড। এরপরও দুর্ঘটনা কেন ঘটল, তদন্তে তা বেরিয়ে আসবে।

 

এদিকে, শনিবার দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে শিল্প সচিব আব্দুন নাসের খানও জাহাজটিতে স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড পাওয়া গেছে বলে জানান। তিনি বলেন, দুর্ঘটনাস্থলটি কমপ্লায়েন্স ইয়ার্ড, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা থাকার কথা। এরপরও কেন দুর্ঘটনা ঘটল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কারও অবহেলা পাওয়া গেলে দ্রæত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 

দুর্ঘটনাকবলিত ‘এমটি রাসি’ জাহাজটির দৈর্ঘ্য ২৮০ মিটার এবং প্রস্থ ৪৩ মিটার। গত বছরের জুলাইয়ে এটি চট্টগ্রামে নোঙর করে এবং ১৩ জুলাই ভাঙার জন্য ইয়ার্ডে আনা হয়। জাহাজটি হংকং কনভেনশন সনদপ্রাপ্ত ইয়ার্ডে ভাঙা হচ্ছিল। তবে ওই ইয়ার্ডে সুরক্ষাজনিত বিধান অমান্যের অভিযোগও উঠেছে।

 

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের দুর্ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটিগুলো কাজ শুরু করেছে। তদন্তে কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলা সম্ভব নয়।

 

‘শূন্য মৃত্যু’ লক্ষ্য আছে, হিসাবের কাঠামো কোথায়?

 

ইপসার এডভোকেসি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ শাহীন বলেন, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অংশ হিসেবে জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা, পরিমাপযোগ্য সূচক ও দায়িত্ব বণ্টনসহ আলাদা কোনো সরকারি রোডম্যাপ প্রকাশ্যে নেই।

 

অর্থাৎ ‘শূন্য মৃত্যু’ লক্ষ্য হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে বছরে কত দুর্ঘটনা কমাতে হবে, কত শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, কতবার গ্যাস পরীক্ষা বা নিরাপত্তা মহড়া করতে হবে কিংবা কোনো ইয়ার্ডে ঘাটতি ধরা পড়লে কত দিনের মধ্যে তা সংশোধন করতে হবে- এসব বিষয়ে একটি একক, প্রকাশ্য ও পরিমাপযোগ্য কাঠামো কতটা কার্যকর, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু গ্রিন ইয়ার্ডের সংখ্যা বাড়ানো নয়, প্রতিটি ইয়ার্ডে সনদের শর্ত বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে, সেটির নিয়মিত মূল্যায়ন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলেও মনে করেন মোহাম্মদ শাহীন।

 

বিলস এর কো-অর্ডিনেটর ও শ্রমিক নেতা ফজলুল কবির মিন্টু বলেন, সরকারের লক্ষ্য যেখানে জাহাজভাঙা শিল্পে মৃত্যুর হার শূন্যে নামিয়ে আনা, সেখানে ২০২৪ সালে এক দুর্ঘটনায় সাতজন এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২ শ্রমিকের মৃত্যু সেই লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তবতার বড় ব্যবধানই তুলে ধরছে। এটি পুরো জাহাজভাঙা শিল্পের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তাই এ বিষয়ে মালিকপক্ষকে অবশ্যই কাজ করতে হবে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট