চট্টগ্রাম শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মতুষ্টি এবং অপ্রতিমদের হারিয়ে যাওয়া
ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।

উপসম্পাদকীয়

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মতুষ্টি এবং অপ্রতিমদের হারিয়ে যাওয়া

আকরাম হোসেন রানা

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ৯:৪৯ অপরাহ্ণ

শুক্রবার বিকেল সাড়ে তিনটা। বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে মায়ের আইফোনটা হাতে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তেরো বছরের ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। সপ্তম শ্রেণির এই ছেলেটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটবাড়ি এলাকা এমনভাবে চেনে যে তার মা, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগম নিশ্চিত ছিলেন-সন্তানের পথ হারানোর প্রশ্নই ওঠে না। অজানা আশঙ্কাকে সত্যি করে পরদিন দুপুরে ক্যাম্পাসের পাশের লালমাই-সানন্দা পাহাড়ের জঙ্গল থেকে মিলল তার নিথর দেহ, ছিল মাথায় আঘাতের চিহ্ন। পুলিশ পরে জানায়, একটি মোবাইল ফোনের জন্য প্রাণ হারাতে হয়েছে অপ্রতিমকে।

এখন প্রশ্ন হলো, শুধুমাত্র একটি আইফোনের মূল্য একটা শিশুর জীবনের চেয়ে বেশি হয়ে উঠল কার কাছে? কোন সমাজে এবং কেন এমন হলো? এটা কি বিচ্ছিন্ন ঘটনা, নাকি একটা প্যাটার্ন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হয়তো রাষ্ট্রের জন্য কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্ত তৈরি হবে। কাজেই অপ্রতিমকে বিচ্ছিন্ন এক ঘটনা বলে সরিয়ে রাখাটাই কর্তা ব্যক্তিদের জন্য সবচেয়ে সহজ পথ। তবে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, শিশু হত্যার তালিকাটা আসলে বিচ্ছিন্ন বিন্দু নয়, এটা একটা রেখা। যার ওপর কুমিল্লার অপ্রতিমও একটি বিন্দু হয়ে যুক্ত হলো।

চলতি বছরের মে মাসে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে পাশের ফ্ল্যাটেই ধর্ষণের পর গলা কেটে হত্যা করা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণির এই ছাত্রীর মৃত্যু সারা দেশে প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। ঘটনার মাত্র চার কার্যদিবসে বিচার কাজ শুরু হয়ে কুড়ি দিনের মাথায় আদালত রায় দেয়, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম দ্রুততম হত্যা মামলার রায়। একই বছরের শুরুতে মাগুরার শিশু আছিয়া ধর্ষণ-হত্যা মামলার বিচারও শেষ হয়েছিল মাত্র চৌদ্দ কার্যদিবসে। লালমনিরহাটে আরেকটি শিশু হত্যার রায় এসেছিল দুই মাসে।

এই দ্রুততাগুলো অন্তত একটি বিষয় দেখায়, রাষ্ট্রের হাতে সক্ষমতা আছে। প্রশ্নটা তাহলে কেবল সক্ষমতার নয়। প্রশ্নটা হলো, এই সক্ষমতা কখনো সক্রিয় হয়, আবার কখনো হয় না কেন?

অপ্রতিমের ঘটনার দায়বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০১৩ সালের নারায়ণগঞ্জে ঘটে যাওয়া এক আলোচিত ঘটনায়। এ-লেভেল পরীক্ষায় দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত কিশোর তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীকে অপহরণের দুদিন পর শীতলক্ষ্যার শাখা খাল থেকে মরদেহ উদ্ধার হয়েছিল। তদন্তকারী সংস্থা র‍্যাব সংবাদ সম্মেলন করে হত্যাকাণ্ডের ধরন ও এর সঙ্গে কারা জড়িত বলে তারা মনে করে, সে সম্পর্কে বক্তব্য দিয়েছিল। মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন প্রভাবশালী এক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তারপর কেটে গেছে এক যুগ। মামলার আট আসামি এখনো পলাতক। তদন্ত প্রতিবেদনও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে জমা পড়েনি। আর যাঁর নাম মূল অভিযুক্ত হিসেবে এসেছিল, তিনি শহরের পোস্টার-বিলবোর্ডে দাপিয়ে বেড়ান বলে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

রামিসা আর ত্বকী, দুটো শিশুহত্যা, একই রাষ্ট্র, একই বিচারব্যবস্থা। একটির বিচার হয়েছে কুড়ি দিনে, আরেকটির তদন্তই শেষ হয়নি বারো বছরে। পার্থক্যটা আইনে নেই, পার্থক্যটা প্রভাব আর মনোযোগে। মিডিয়া-চাপ থাকলে, সামাজিক আন্দোলন থাকলে, রাজনৈতিক সংযোগ না থাকলে বিচার দ্রুত হয়, এমন একটি প্রশ্ন অন্তত এসব ঘটনা সামনে আনে। অন্যদিকে প্রভাবশালী কেউ জড়িত থাকলে, কিংবা ভুক্তভোগী পরিবার হারিয়ে গেলে খবরের ভিড়ে, ন্যায়বিচার হয়ে পড়ে অনির্দিষ্টকালের অপেক্ষা।

আর এই তালিকার সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ হলো, যেসব ঘটনায় ন্যূনতম মনোযোগও তৈরি হয় না। এই বছরই একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নয় বছরের একটি শিশুকে যৌন নির্যাতনের পর হত্যা করার দশ মাস পরও তার ধর্ষক ও হত্যাকারীকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। এই শিশুটির নাম কেউ জানে না, তার জন্য কোনো মানববন্ধন হয়নি, কোনো টিভি টকশোতেও তার প্রসঙ্গ ওঠেনি। রামিসা বা অপ্রতিমের মতো যাদের নাম-ছবি ভাইরাল হয়, তারাই কেবল ‘দৃষ্টান্তমূলক বিচার’ পায়, অন্যদিকে বাকিরা পরিসংখ্যানে হারিয়ে যায়। সাধারণ মানুষ কি একে ন্যায়বিচার বলবে, নাকি নির্বাচিত ন্যায়বিচার (সিলেক্টিভ জাস্টিস) বলবে?

এই পুরো প্রেক্ষাপটে ফিরে তাকানো যাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সেপ্টেম্বরের ব্রিফিংয়ে। তিনি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, দেশের সামগ্রিক অপরাধচিত্র ‘অনেকখানি নিয়ন্ত্রণে এসেছে’, হত্যা-অপহরণ-নারী নির্যাতনের হার ‘উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে’। উদাহরণ হিসেবে তিনি টেনে আনেন রাজধানীতে ছিনতাইকারীর হাতে এক শিক্ষিকার মৃত্যুর ঘটনা, যার মূল আসামি ধরা পড়েছিল মাত্র বারো ঘণ্টায়।

লক্ষ্য করার বিষয় হলো বক্তব্যের ধরনটি। একটি সফল ঘটনাকে সাধারণীকরণ করে পুরো দেশের চিত্র বলে উপস্থাপন করা, অথচ ঠিক তার কয়েক দিন পরই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের পাশে ঘটে গেল আরেকটি শিশু হত্যা। এসব প্রমাণ করে না যে মন্ত্রীর দেওয়া পরিসংখ্যান সত্য নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি বা কয়েকটি সফল অভিযানের ভিত্তিতে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি কতটা যথাযথভাবে বোঝানো যায়? পরিসংখ্যান আর নাগরিকের দৈনন্দিন অনুভূত নিরাপত্তার মধ্যে যে বিশাল ফাঁক তৈরি হয়েছে, অপ্রতিমের মৃত্যু ঠিক সেই ফাঁকেই ঘটেছে।

এখানেই দায়িত্বের প্রশ্নটা আসে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ শুধু সংখ্যা দেখিয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করা নয়, কাঠামোগত ব্যর্থতাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করাও। একটা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ঠিক পাশে, দিনের আলোয়, একটা শিশু খুন হয়ে যাওয়া যদি ‘নিয়ন্ত্রণে থাকা অপরাধচিত্র’ এর অংশ হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে এই নিয়ন্ত্রণের সংজ্ঞা নিয়েই। একটা মন্ত্রণালয় যখন প্রতিটি নতুন ঘটনার পরে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’, ‘দ্রুত গ্রেপ্তার’, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ এই একই বয়ান পুনরাবৃত্তি করে, তখন সেটি দায় এড়ানোর কৌশল হয়ে দাঁড়ায় বলে আমাদের প্রতীয়মান হয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশাসনিক দায়িত্ব যাদের ওপর, তাদের কণ্ঠে সংকটের সময়েও যখন আত্মতুষ্টি প্রকট হয়ে ওঠে, তখন সেই আত্মবিশ্বাসকে দায়িত্বশীলতা বলা কঠিন। আমরা একে উদাসীনতা বলতে পারি।

আমরা আবারও ফিরি অপ্রতিম প্রসঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকার মতো জনবহুল পরিবেশেও একটা শিশু বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বেরিয়ে আর ফিরতে পারে না কেন? সিসিটিভি ছিল, তবু রাতভর ফুটেজ যাচাই করে তল্লাশি চালাতে হয়েছে; ফোনের লোকেশন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার পর হারিয়ে গেছে, আর তারপর দীর্ঘ কুড়ি ঘণ্টা কেটে গেছে অনিশ্চয়তায়। প্রযুক্তি থাকা আর তার কার্যকর, সমন্বিত ব্যবহার হওয়া, এই দুইয়ের মধ্যে একটা বিশাল দূরত্ব আছে, যা আমাদের নগর-নিরাপত্তা কাঠামোর মৌলিক দুর্বলতার কথাই মনে করিয়ে দেয়।

সন্দেহভাজন তুহিনকে আটক করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ চলছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে গিয়ে দ্রুত বিচারের নির্দেশ দিয়েছেন। রামিসার মতোই সম্ভবত অপ্রতিমের মামলাও দ্রুত এগোবে, কারণ এটাও এখন আলোচিত ঘটনা। এখানে মিডিয়া ও জনমতের চাপ আছে। কিন্তু এই দ্রুততাই প্রশ্নটা আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে, তাহলে ত্বকীর ক্ষেত্রে কেন বারো বছর ধরে তদন্তই শেষ হয় না? সেই নয় বছরের অজানা শিশুটির ক্ষেত্রে কেন দশ মাসেও কাউকে শনাক্ত করা যায় না?

বিচার তখনই বিচার, যখন সে ভুক্তভোগীর পরিচয়, পরিবারের প্রভাব বা মিডিয়ার আলো নির্বিশেষে সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। যতদিন এই সমতা প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততদিন প্রতিটি দ্রুত বিচার একটা কার্যকর ব্যবস্থার প্রমাণ না হয়ে একটা ‘ব্যতিক্রম বিচার’ হয়ে থাকবে, যা মূল সমস্যাটাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

শৈশবের নিরাপত্তা যে সমাজে একটা মোবাইল ফোন বা তথাকথিত আইফোনের পুনর্বিক্রয় মূল্যের কাছে হার মানে এবং যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-বয়ান নির্ভর করে কোন ঘটনাটা ক্যামেরার সামনে এসেছে তার ওপর, সেই সমাজ ও রাষ্ট্রের ‘উন্নতি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের আছে। অপ্রতিমের নাম, তার ছবি, তার মায়ের আকুতি যেন আমাদের ব্যস্ত মন্ত্রীদের আত্মতুষ্টির বিবৃতির ভিড়ে হারিয়ে না যায়। কারণ পরের অপ্রতিম, বা পরের সেই অজানা নয় বছরের শিশুটি, হয়তো এখনো কারও পাশের ঘরেই বেড়ে উঠছে।

লেখক: সংবাদকর্মী

 

পূর্বকোণ/পারভেজ

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট