বেকিং সোডা অতিরিক্ত খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে : বেকিং সোডা রান্নায় ব্যবহার করা হয় এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এর প্রয়োগ রয়েছে। কিন্তু তাই বলে প্রতিদিন নিজের ইচ্ছামতো পান করা নিরাপদ নয়। বেকিং সোডায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সোডিয়াম থাকে। অতিরিক্ত গ্রহণ করলে শরীরে সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং অ্যাসিড-বেস ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের দুর্বলতা বা কিডনির রোগে আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে নির্বিচারে সোডিয়াম বাইকার্বোনেট গ্রহণ ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। একইভাবে ভিনেগার খাবারের উপাদান হলেও অতিরিক্ত বা ঘন অবস্থায় নিয়মিত পান করলে দাঁতের এনামেল ক্ষয়, মুখ-গলায় জ্বালা এবং কোনো কোনো ব্যক্তির গ্যাস্ট্রিক বা রিফ্লাক্সের সমস্যা বাড়তে পারে। ‘রান্নাঘরে পাওয়া যায়’ কিংবা ‘প্রাকৃতিক’এই দুটি শব্দ কোনো পদার্থকে সীমাহীনভাবে নিরাপদ করে না।
‘ন্যাচারাল’ মানেই নিরাপদ নয় : স্বাস্থ্যবিষয়ক ভ্রান্ত প্রচারণায় ‘১০০% ন্যাচারাল’ শব্দটি খুব শক্তিশালী বিপণন কৌশল। কিন্তু প্রকৃতি থেকে এসেছে বলেই কোনো পদার্থ নিরাপদ এমন বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। তামাক প্রাকৃতিক, বিষাক্ত মাশরুম প্রাকৃতিক, আর্সেনিকও প্রকৃতিতে পাওয়া যায়। তাই ‘হারবাল’, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘কেমিক্যালমুক্ত’ শব্দ শুনেই কোনো পণ্যকে নিরাপদ বা কার্যকর ধরে নেওয়া উচিত নয়।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয় : সোশ্যাল মিডিয়ার প্রচারকেরা প্রায়ই বলেন‘আমি নিজে খেয়ে উপকার পেয়েছি’ কিংবা ‘আমার পরিচিত অমুক এটা খেয়ে সুস্থ হয়েছেন।’ এগুলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একেanecdotal evidence বলা হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কোনো চিকিৎসা কার্যকর এটা প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ উপসর্গ এমনিতেই ভালো হতে পারে, খাদ্যাভ্যাসের অন্য পরিবর্তন থাকতে পারে, একই সঙ্গে অন্য চিকিৎসা চলতে পারে কিংবা placebo effectকাজ করতে পারে। কোনো চিকিৎসার কার্যকারিতা প্রমাণ করতে প্রয়োজন সঠিকভাবে পরিকল্পিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব গল্প এত জনপ্রিয় কেন? বৈজ্ঞানিক সত্য প্রায়ই জটিল এবং ব্যাখ্যা করতে সময় লাগে। অথচ একটি চমকপ্রদ গল্প ৩০ সেকেন্ডেই বলা যায়। ‘সুষম খাবার খান, নিয়মিত ব্যায়াম করুন, পর্যাপ্ত ঘুমান’এই পরামর্শ খুব নাটকীয় নয়। কিন্তু‘সকালে এই এক গ্লাস পানীয় খেলেই সাত দিনের মধ্যে শরীরের সব টক্সিন বেরিয়ে যাবে’ এই বক্তব্য মানুষের মনোযোগ দ্রুত আকর্ষণ করে। তার সঙ্গে যদি থাকে সুন্দর ভিডিও, আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা, আগে-পরে ছবি এবং লাখ লাখ ফলোয়ার, তাহলে অনেক মানুষ সেটিকে সত্য বলে ধরে নিতে পারেন। কিন্তু ফলোয়ারের সংখ্যা বৈজ্ঞানিক যোগ্যতার মাপকাঠি নয় এবং জনপ্রিয়তা কোনো দাবিকে সত্যে পরিণত করে না।
আসল ‘ডিটক্স’ আছে তবে সেটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে : Detoxification শব্দটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয়। যেমন অ্যালকোহল বা নির্দিষ্ট মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিকে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে নিরাপদে সেই পদার্থ থেকে মুক্ত করার প্রক্রিয়াকে detoxification বলা হতে পারে। একইভাবে প্রকৃত বিষক্রিয়ায় নির্দিষ্ট চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু হাসপাতালের এই চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘ডিটক্স’-এর সঙ্গে সোশ্যাল মিডিয়ার ‘সাত দিনের ডিটক্স চ্যালেঞ্জ’ বা ‘লিভার পরিষ্কার করার পানীয়’-এর কোনো সম্পর্ক নেই।
শরীর ভালো রাখতে তাহলে কী করব? শরীরকে কাল্পনিকভাবে ‘পরিষ্কার’ করার প্রয়োজন নেই; বরং যেসব অঙ্গ স্বাভাবিকভাবে এই কাজ করছে, সেগুলোকে সুস্থ রাখাই গুরুত্বপূর্ণ। সুষম ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার, ফলমূল ও শাকসবজি, পর্যাপ্ত পানি, নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান পরিহার, অ্যালকোহল সীমিত রাখা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা এসবই লিভার, কিডনি এবং শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম ভালো রাখার প্রমাণিত উপায়। প্রয়োজনীয় ওষুধ, হারবাল পণ্য ও সাপ্লিমেন্ট গ্রহণেও সতর্ক থাকা উচিত।
এটি এখন জনস্বাস্থ্যের বিষয় : বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিষয়ক ভ্রান্ত তথ্য এখন আর নিছক বিনোদন নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের সমস্যা। কারণ মানুষ এসব প্রচারণা বিশ্বাস করে অর্থ ব্যয় করছে, অপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনছে এবং কখনো কখনো প্রকৃত রোগের চিকিৎসা বিলম্বিত করছে। ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের রোগের মতো গুরুতর অসুখে কেউ যদি চিকিৎসা বাদ দিয়ে ‘ডিটক্স’ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন, তার ফল ভয়াবহ হতে পারে। তাই চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, সাংবাদিক, শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিক সবারই দায়িত্ব স্বাস্থ্যবিষয়ক মিথ্যা দাবিকে চ্যালেঞ্জ করা। তবে ব্যক্তিকে অপমান নয়; দাবিটির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি জানতে চাইতে হবে। প্রশ্ন করুন দাবিটির গবেষণালব্ধ প্রমাণ কোথায়? কোন টক্সিন বের হয়? কীভাবে তা পরিমাপ করা হয়েছে? পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কী? এই পরামর্শদাতার চিকিৎসাবিষয়ক স্বীকৃত যোগ্যতা কী?
শেষ কথা : ছেলেবেলার সেই ক্যানভাসার আর আজকের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যানভাসারের মধ্যে পার্থক্য মূলত মাধ্যমের। একজন রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে পঞ্চাশজনকে গল্প শোনাতেন, আরেকজন মোবাইলের পর্দায় বসে পাঁচ লাখ মানুষকে শোনান। কিন্তু কৌশল একই আগে ভয় বা কৌত‚হল তৈরি করুন, তারপর সহজ সমাধান বিক্রি করুন। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এই কৌশল মেনে নেওয়া যায় না। মানবদেহ কোনো মিউনিসিপ্যালিটির নর্দমা নয়, যার দেয়ালে ময়লা ও গ্রিজ জমে আছে এবং বেকিং সোডা ও ভিনেগার ঢেলে সেটি পরিষ্কার করতে হবে।
আমাদের লিভার, কিডনি, ফুসফুস ও পরিপাকতন্ত্র প্রতিনিয়ত স্বাভাবিকভাবেই বর্জ্য অপসারণ এবং বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ সামলানোর কাজ করছে। তাই কোনো স্বাস্থ্যবিষয়ক দাবি শোনার পর বক্তার আত্মবিশ্বাস নয় প্রমাণ দেখুন। ফলোয়ারের সংখ্যা নয় যোগ্যতা দেখুন। ব্যক্তিগত গল্প নয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখুন। শরীরকে ডিটক্স করার জন্য বেকিং সোডা কিংবা ভিনেগারের প্রয়োজন নেই। শরীরের সবচেয়ে উন্নত ‘ডিটক্স ব্যবস্থা’ ইতিমধ্যেই আমাদের শরীরের ভেতরে রয়েছে। ছদ্মবিজ্ঞানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক হলো বিজ্ঞানভিত্তিক স্বাস্থ্যশিক্ষা, যুক্তিবোধ এবং সচেতনতা।
বি:দ্র: যে বেকিং সোডা দিয়ে আমরা কেক-রুটি বানাই বা ঘরের ময়লা পরিষ্কার করি, আর যে ভিনেগার সালাদ-আচার কিংবা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে ব্যবহার করি সেগুলোকে হঠাৎ ‘বডি ডিটক্স’ বা ‘গাট ক্লিনজিং’-এর ওষুধ বানিয়ে দেওয়া বিজ্ঞানের কথা নয়, বরং বিপণনের গল্প। (সমাপ্ত)
ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্টজন রেজিওনাল হসপিটাল, নিউব্রান্সউইক; এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।
পূর্বকোণ/মিফতা

















