আট বছর আগে একটি দুগ্ধ প্রদানকারী গাভী কিনেছিলেন লিয়াকত। এখন তার খামারে গাভীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৩৪টি। এসব গাভী থেকে দৈনিক ১৪০ কেজি দুধ পান তিনি। প্রতি কেজি দুধ গড়ে ৭২.৩২ টাকা হিসেবে বিক্রি করে মাসে আয় করেন ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৪৪ টাকা। আর বছরে সেই আয় গিয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। এছাড়া এই খামারের গরু বাছুর বিক্রি করেও তার বছরে আয় হয় অন্তত ৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে একটি গরু দিয়ে শুরু করা খামার থেকে বছরে আয় হয় অন্তত ৪১ লাখ টাকা।
যা দিয়ে নিজের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরানোর পাশাপাশি সৃষ্টি করেছেন কর্মসংস্থানও। ফলে এলাকার বহু বেকার যুবকের জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছেন তিনি। মো. লিয়াকত আলী (সেলিম) সীতাকুণ্ড পৌরসদরের শিবপুর গ্রামের বাসিন্দা। লোকমুখে লিয়াকত আলী সেলিমের এই খামারের কথা শুনে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়- পৌরসদরের ইদিলপুর গ্রামে তার খামারটি গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে কয়েকজন
কর্মচারীকে নিয়ে নিজে পরিচর্যা করছেন। খামারে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে দুগ্ধ প্রদানকারী গাভীগুলো। এগুলোকে প্রিয় খাবার ঘাসসহ অন্যান্য খাবার দিচ্ছেন তিনি। এই খামার সম্পর্কে জানতে চাইলে লিয়াকত আলী জানান, আট বছর আগে এই খামাটির অবকাঠামো তৈরি করি ১৬ লাখ টাকা ব্যায়ে। এরপর স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমি একটি দুগ্ধ প্রদানকারী গাভী ক্রয় করি। সেটির যতœ, ধৈর্য, পরিশ্রম ও সঠিক পরিকল্পনার কারণেই ধীরে ধীরে খামারটি বড় হতে থাকে। এখন খামারে ৩৪টি দুগ্ধ প্রদানকারী গাভী আছে। এগুলো হলো হোলস্টাইন ফ্রিজিয়ান, জার্সি এবং সাহিওয়াল জাতের।
লিয়াকত আলী বলেন, ৩৪টি গাভীর মধ্যে দুগ্ধজাত গাভী হলো ১৩টি। এসব গাভীর নিয়মিত পরিচর্যায় তিনজন কর্মচারী নিয়োগ করেছেন তিনি। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী গাভীগুলোর যত্ন নেয়া হয়। এসব গাভী থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ কেজি দুধ উৎপাদন হয়। প্রতি কেজি দুধ গড়ে ৭২.৩২ টাকায় বিক্রি হয়। এই হিসেবে প্রতিদিন আয় হয় প্রায় ১০ হাজার ১২৫ টাকা। যা মাসে ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৫০ টাকা এবং বছরে প্রায় ৩৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় দাঁড়ায়। এছাড়া খামার থেকে বিক্রি হয় গাভীর বাছুরও। বছরে বাছুর বিক্রি করে আসে ৫ লাখ টাকারও বেশি।
তিনি বলেন, এ আয় থেকে তিনজন কর্মচারীকে প্রতি মাসে ৭৫ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয়। তিনি খামার গড়লেও এটিকে আধুনিক ও প্রযুক্তি নির্ভর করতে সহযোগিতা করে উন্নয়ন সংস্থা ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল এ্যাকশন (ইপসা)। ইপসার কারিগরি সহযোগিতায় আইওটি প্রযুক্তি সংযুক্ত করায় খামারের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা সহজ হয়েছে এবং পরিচালন ব্যয়ও কমেছে। এছাড়া খামারে উৎপাদিত বর্জ্য থেকে জৈব সার উৎপাদনের জন্য একটি বিশেষ প্ল্যান্ট স্থাপনে সহায়তা করেছে ইপসা।
গবাদি পশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিয়মিত তদারকি করছেন তিনজন বেসরকারি প্রাণিসম্পদ চিকিৎসক। আর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে খামারটি। তিনি বলেন, এখন অনেক যুবক খামারটি সম্পর্কে জানতে আসেন। তারাও খামার গড়তে চান। এ জন্য পরামর্শ চান। তিনি বলেন, আসলে পরিশ্রম করার মতো মানসিকতা থাকলে বেকার না থেকে এরকম খামার গড়ে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফেরাতে পারেন যে কেউই।
ইপসার কৃষি কর্মকর্তা সুমন দেব নাথ জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর অর্থায়ন ও ইপসার কারিগরি সহায়তায় সীতাকুণ্ড উপজেলার প্রাণিসম্পদ খাতে খামার আধুনিকায়ন ও মেকানাইজেশনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আমরা লিয়াকত আলীর খামারে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন ডিভাইস স্থাপনে সহযোগিতা করেছি। এর ফলে খামার ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হয়েছে এবং উৎপাদন ব্যয় কমেছে। আধুনিক, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব খামার গড়ে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্যে কাজ করছে ইপসা। এই খামারটি ভবিষ্যতে আরো অনেক বড় হয়ে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















