চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

উন্নয়নের অন্তরায় সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি

উন্নয়নের অন্তরায় সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৭ মে, ২০২৬ | ১২:১৮ অপরাহ্ণ

রাউজান বিসিক শিল্পনগরীকে পূর্ণাঙ্গ রূপদানের পরামর্শ দিয়েছেন নাগরিকেরা। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, খুন-খাবারি বন্ধের প্রত্যাশা করেছেন রাউজানবাসী। এছাড়া খাল খননে কৃষির উন্নয়ন, অনলাইন জুয়া বন্ধ, নারীদের কর্মমুখী শিক্ষা, ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়নসহ সরকারের কাছে নানা প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।

 

‘স্বনির্ভর রাউজান : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় রাউজানের নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাবনা দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রæয়ারি রাউজান পৌরসভা কনফারেন্স হলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সমস্যা- সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী সেসব তুলে এনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দৈনিক পূর্বকোণ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা সরকার এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করলে প্রতিটি আসনের দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে। সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধিত হলে স্বনির্ভর এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

সাংবাদিক এরফানুল হক সিজান উপস্থিত সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে আলোচনা সভা শুরু করেন।

 

রাউজান পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) অংছিং মারমা বলেন, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোধা মাস্টারদা সূর্য সেন থেকে শুরু করে অনেক জ্ঞানী-গুণী, মনীষী ও কবি-সাহিত্যিক রাউজানে জন্মগ্রহণ করেছেন। আমরা সরকারি চাকরি করতে এসেছি। এলাকার উন্নয়নমূলক কার্যক্রমে আমরা সহায়তা করব। এখানে একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদী আছে। এটাকে বাণিজ্যিকভাবে বড় আকারে ব্যবহার করা যেতে পারে। তিনি বলেন, রাউজান বিসিক নগরী অযতেœ-অবহেলায় পড়ে রয়েছে। শিল্প-উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসেনি। এখানকার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। বিসিক নগরীকে উপযুক্তভাবে ব্যবহার করা গেলে ক্ষুদ্র-মাঝারি ও বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সম্ভব। এতে শত শত লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।

 

পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মনজুরুল হক মনজু বলেন, রাউজানে রাহাজানি, খুন-খারাবির জন্য আমরা ব্যথিত। সমৃদ্ধ রাউজানকে আমরা নষ্ট করে দিয়েছি। চাঁদাবাজি-সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ৯৫ শতাংশ মানুষ কিছু বলে না। সৎ সাহস নিয়ে এগিয়ে এলে তা বন্ধ হয়ে যাবে। নারী উদ্যোক্তার কথা বলা হয়েছে, নারী উদ্যোক্তাদের অনেকেই জানেন না কৃষি অফিসের কার্যক্রম বিষয়ে। ছয় জন তরুণ কৃষি অফিসারের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক ২ লাখ টাকা ঋণ দেয়। তরুণদের এক লাখ টাকা লোন দেয়। তার যদি সৎভাবে ব্যবসা করেন স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

 

কদলপুর স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ ওমর ফারুক বলেন, মেয়েদের লেখাপড়ার নিরাপদ পরিবেশ অর্থাৎ ইভটিজিং মুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। প্রাইমারি শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে। এছাড়া প্রযুক্তি ও টেকনোলজি শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে। এখানে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার আছে। টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজও আছে। কিন্তু শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

 

উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি রিদোয়ান শাহ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বেকারত্ব দূরীকরণ করা প্রয়োজন। শিল্প নগরী থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। এ বিষয়ে সরকার ও শিল্প-উদ্যোক্তা এবং প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে হবে। তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। শিল্প ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে পারলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। জনসংখ্যাকে জনশক্তি হিসেবে কাজে লাগাতে পারলে দারিদ্র্য দূরীকরণ হবে।

 

নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক শেখ বিবি কাউছার বলেন, মহিলাদের পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে আরও সুযোগ করে দিতে হবে। নারী-মহিলা বা ছাত্রীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন। হাতের কাজ বা আইটি সেক্টর বা টেকনোলজি শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। মহিলাদের কারুশিল্পে সহায়তা বাড়াতে হবে। তাদের কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ আরও নিরাপদ এবং কর্মস্থলে ডে কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

 

ইসলামী যুবসেনার উত্তর জেলা শাখার সভাপতি মো. আলমগীর বলেন, প্রথমত রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলার চরম অবনতির কারণে স্থানীয় শিল্পপতিরা বড় বিনিয়োগে আগ্রহ করছেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে। এজন্য রোগীদের উল্টো বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। রাউজান সদর ও রাউজান-রাঙামাটি সড়কের সন্নিকটে সুলতানপুর ৩১ শয্যা হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০০ এবং ২০০ শয্যাতে রূপান্তর করা হলে মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে চিকিৎসাসেবা পাবে। পর্যটনে অপার সম্ভাবনা রয়েছে। হালদা নদী ও টিলা, পাহাড় ঘেরা এই এলাকায় বহুমুখী পর্যটনকেন্দ্রের হাতছানি দিচ্ছে।

 

ওয়াই কে ফ্রেন্ডশিপ ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আরমান ফয়েজ বলেন, এখানে অর্ধনির্মিত একটি স্টেডিয়াম রয়েছে। এটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ ও খেলাধুলার জন্য প্ল্যান নিয়ে কাজ করলে অনেক ভালো খেলোয়াড় সৃষ্টি হবে। আমরা বহুদূর এগিয়ে যেতে পারব।

 

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাছুম কবীর বলেন, চাষাবাদের জন্য সম্ভাবনাময় এলাকা এটি। এখানে চিনা বাদামের ভালো চাষ হয়। ডাবুয়া বেগুন তো রাউজানের ডাবুয়া ছাড়া আর কোথাও ভালোভাবে চাষ হয় না। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে খাল ভরাট। বেশির ভাগ খাল বেদখল ও ভরাট হয়ে গেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার করা হয়নি। সেচ সংকটে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। ভরাট খালগুলো খনন করা হলে চাষাবাদের ব্যাপক উন্নয়ন হবে।

 

চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ তাওসিফ মুত্তাকী চৌধুরী বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যা তুলনামূলক কম। তারপরও আমরা শিক্ষার মান বাড়াতে পারছি না। পড়াশোনার পাশাপাশি এক্সট্রা কারিকুলাম কার্যক্রম বাড়াতে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। রাউজানের যুবসমাজের মধ্যে অনলাইন জুয়া খেলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এই চর্চা এখন ই বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে বড় মাথাব্যথার কারণ হবে।

 

শিল্পোদ্যোক্তা মো. রায়হান বলেন, ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। উপজেলার দক্ষিণাঞ্চলে যানজটের জন্য মার্কেটগুলোতে ক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারে না। সড়কগুলো যানজটমুক্ত করা দরকার। এছাড়া মার্কেট ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা দিতে হবে।

 

রাউজান প্রেস ক্লাবের সভাপতি কাজী সরোয়ার খান মনজু বলেন, রাউজানকে শান্তিপূর্ণ, শিক্ষাবান্ধব ও স্বনির্ভর জনপদ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে সর্বাগ্রে সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি ও সন্ত্রাসী কর্মকাÐ সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সমস্যা নিরসনে সময়োপযোগী, বাস্তবভিত্তিক এবং দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এর মূলভিত্তি হলো সুস্থ ও দায়িত্বশীল রাজনীতি। সুশাসন, জবাবদিহি এবং দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে শিক্ষা ও সামাজিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা গেলে রাউজানকে একটি আদর্শ, নিরাপদ ও স্বনির্ভর জনপদ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট