আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা গেঁথেছি শেফালিমালা/ নবীন ধানের মঞ্জরি দিয়ে সাজিয়ে এনেছি ডালা/ এসো গো শারদ-লক্ষ্মী, তোমার শুভ্র মেঘের রথে,/ এসো নির্মল নীলপথে…| বিশ্বকবির বন্দনায় ঋতুর রাণী শরৎকালের অপরূপ সৌন্দর্যের দারুণ প্রকাশ|
আজ ১ ভাদ্র, শরতের প্রথম দিন| কাশফুল শেফালিমালা নবীন ধানের মঞ্জরি এখন সবখানে| ফুটেছে সুগন্ধি শিউলিও| প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলামকে শিউলি ফুল খুব আকৃষ্ট করেছিল| শরৎ দেখতে গিয়ে শিউলি, আর শিউলি দেখতে গিয়ে শরৎ দেখেছেন তিনি| মুগ্ধ হয়ে লিখেছেন- ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি-বিছানো পথে|/ এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে…| অন্যত্র কবির উচ্চারণ- ‘শিউলিতলায় ভোর বেলায় কুসুম কুড়ায় পল্লী-বালা|/ শেফালি পুলকে ঝরে পড়ে মুখে খোঁপাতে চিবুকে আবেশ-উতলা…’| শরৎ শুধু প্রকৃতিতেই পরিবর্তন আনে না| বদলে দেয় মানুষের মনও| সেই পরিবর্তনের কথাও কবিগুরুর কাব্যে রয়েছে| কবিগুরু লিখেন- ‘শরতে আজ কোন অতিথি এল প্রাণের দ্বারে|/ আনন্দগান গা রে হৃদয়, আনন্দগান গা রে…|
তার মানে, আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে শরৎ| মনকে ভরিয়ে রাখে| নাকি কিছু লুকানো বেদনাও হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনে শরৎ? তা না হলে নজরুল কেন লিখবেন- ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ-রাতের বুকে ঐ/ এমন রাতে একলা জাগি সাথে জাগার সাথী কই…’| একই রকম বিরহের প্রকাশ ঘটিয়ে অন্যত্র কবি লিখেন- ‘দূর প্রবাসে প্রাণ কাঁদে আজ শরতের ভোর হাওয়ায়|/ শিশির-ভেজা শিউলি ফুলের গন্ধে কেন কান্না পায়…’|
কেবল এ দুই কবিই নন, বাংলা ভাষার অন্য কবিদের কবিতায়ও শরতের চিত্র সমানভাবে ফুটে উঠেছে| জীবনানন্দ দাশের অনেক কবিতায় শরতের প্রসঙ্গ এসেছে| যেমন- ‘এখানে আকাশ নীল-নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল/ ফুটে থাকা হিমশাদা- রং তার আশ্বিনের আলোর মতন’|
শরৎ শুভ্রতার প্রতীক| সাদা কাশফুল, শিউলি, স্নিগ্ধ জ্যোৎস্না, দিনভর আলো-ছায়ার খেলা- এসব মিলেই তো শরৎকাল| পরিষ্কার নীল আকাশ আর সবুজ মাঠ বললেই মনে আসে শরতের নাম| বাংলার প্রকৃতিতে শরতের আবির্ভাব মুগ্ধ করে আমাদের| শরতের স্নিগ্ধতা এক কথায় অসাধারণ! জলহারা শুভ্র মেঘের দল যখন নীল, নির্জন, নির্মল আকাশে পদসঞ্চার করে, তখনই বুঝতে পারি- শরৎ এসেছে|
গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদ আর বর্ষার অঝোরধারায় শ্রাবণ ঢলের পর আসে শরতের আলোছায়ার খেলা; এই মেঘ, এই বৃষ্টি, তো কিছুক্ষণ পরই রোদ| নদীতীরে, বনের প্রান্তে কাশফুলের রাশি অপরূপ শোভা ছড়ায়| গাছে গাছে শিউলির মন ভোলানো সুবাসে অনুভূত হয় শরতের ছোঁয়া| মেঘহীন আকাশে গুচ্ছ গুচ্ছ কাশফুলের মতো সাদা মেঘের ভেলা কেড়ে নেয় মন| তাই তো উৎপল সেন লিখেছিলেন, ‘আজি শরতের আকাশে মেঘে মেঘে স্বপ্ন ভাসে|’
আরেক শরৎপ্রেমী মুস্তফা মনোয়ার বলেন, ‘শরৎ যে এত সুন্দর আগে হয়ত বাঙালি জানতোও না রবীন্দ্রনাথই তাঁর গান, কবিতার মাধ্যমে সবাইকে শরৎকাল উপভোগ করতে শিখিয়েছেন|’ মুস্তফা মনোয়ার বলেন, ‘শরৎ হচ্ছে চমৎকার মেঘের ঋতু, স্পষ্টতার ঋতু| কেননা শরতের আকাশ থাকে ঝকঝকে পরিষ্কার| নীল আকাশের মাঝে টুকরো টুকরো সাদা মেঘ যেন ভেসে বেড়ায়| তিনি বলেন, ‘গ্রামের বধূ যেমন মাটি লেপন করে নিজ গৃহকে নিপুণ করে তোলে, তেমনি শরৎকাল প্রকৃতিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়| বর্ষার পরে গাছগুলো সজীব হয়ে ওঠে| আকাশে হালকা মেঘগুলো উড়ে উড়ে যায়|’
পূর্বকোণ/রেহেনুমা

















