চট্টগ্রাম শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্বপ্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল

স্বপ্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৭ মে, ২০২৬ | ১২:১৭ অপরাহ্ণ

একগুচ্ছ পরামর্শ দিয়ে স্মার্ট রাঙ্গুনিয়া গড়ার প্রত্যাশা করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। শিল্পায়নের উন্নয়নের তারা বলেন, এক সময়ে এখানে টেক্সটাইল, পেপার ও জুট মিল ছিল। কালক্রমে তা ধ্বংস হয়ে গেছে। নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেনি। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনে নদীভাঙন তীব্র হয়েছে। নদী ভাঙনরোধ, বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ, আধুনিক মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র নির্মাণ, মাদক নির্মূল, কৃষি উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন, আইন-শৃঙ্খলার উন্নয়নসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন রাঙ্গুনিয়ার বিশিষ্টজনেরা।

 

‘স্মার্ট রাঙ্গুনিয়ার’ প্রত্যাশা করে নাগরিকেরা বলেন, ১৭ বছর মানুষ মন খুলে কথা বলতে পারেনি। উন্নয়নের নামে লুটপাট হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখেন রাঙ্গুনিয়াবাসী।

 

‘স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাবনা দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পৌরসভার রোয়াজার হাটের রাঙ্গুনিয়া ক্লাব মিলনায়তনে হলে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

 

চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সমস্যা-সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী সেসব তুলে এনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে দৈনিক পূর্বকোণ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা সরকার এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করলে প্রতিটি আসনের দৃশ্যমান উন্নয়ন হবে। সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধিত হলে স্বনির্ভর এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র নুরুল আমিন তালুকদার আশা প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচিত সংসদ সদস্য রাঙ্গুনিয়ার সকল মানুষের নেতা হিসেবে কাজ করবেন, সেটা বিশ্বাস করি। আমরা একটি ‘স্মার্ট রাঙ্গুনিয়া’ গড়ার স্বপ্ন দেখছি। যেখানে কোনো দলমত বা ধর্মের বিভেদ থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।

উত্তর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি ইউসুফ চৌধুরী জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক অধিকার রক্ষার বিষয়ে বলেন, রাঙ্গুনিয়ায় জনস্বাস্থ্য চরমভাবে অবহেলিত। প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য কয়েক হাজার টাকা খরচ করে শহরে যেতে হয়। আমার প্রস্তাব হলো, ইছাখালী হাসপাতালের আমূল পরিবর্তন ও স¤প্রসারণ করা দরকার। একই সঙ্গে উত্তর ও দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় বিশেষায়িত হাসপাতাল স্থাপন করা হলে চিকিৎসা ব্যয় সাশ্রয় হবে। এছাড়া আমাদের স্থানীয় বাজারগুলো থেকে কোটি কোটি টাকার মাছের ব্যবসা হলেও বাজারগুলো কাদা আর ময়লায় পূর্ণ থাকে। আধুনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।

 

রাঙ্গুনিয়ার শিল্পায়ন ও অর্থনীতির উন্নয়নের বিষয়ে কথা বলেন উপজেলা ইসলামী ফ্রন্টের সভাপতি করিম উদ্দিন হাসান। অর্থনৈতিক উন্নয়নে শিল্পায়নের দিকে নজর দিতে হবে। স্বাধীনতার আগে ও পরে আমাদের এখানে টেক্সটাইল মিল, পেপার মিল এবং জুট মিল ছিল। বর্তমানে নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। ফলে আমাদের উচ্চশিক্ষিত তরুণরা কর্মসংস্থানের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় সেখানে ব্যয় করে দেশে ফিরে এসে অনেকটা বোঝা হয়ে যাচ্ছে। কাপ্তাই সড়কটি আরও প্রশস্ত ও উন্নত করা হলে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হয়।

 

তিনি বলেন, রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়নে ১১ দফা চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছি। যার মধ্যে রয়েছে, পরিকল্পিত আবাসন, বেকারত্ব দূরীকরণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বিশেষ তথ্য ও সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা। প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।

 

উপজেলা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা ওবাইদুল হক কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বিষয়ে বলেন, রাঙ্গুনিয়া কৃষি ও মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ অঞ্চল। কর্ণফুলী ও ইছামতী নদীর দুই তীরে প্রচুর পরিমাণে সবজি উৎপাদন হয়। তবে উন্নত বীজের অভাব থাকায় কুমিল্লা বা অন্য অঞ্চলে যেতে হয়। আমি কৃষি কর্মকর্তাদের অনুরোধ করব, তারা যেন সরাসরি কৃষকদের কাছে যান এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করেন। এছাড়া কর্ণফুলী নদীর মৎস্যসম্পদ রক্ষা এবং পরিকল্পিত মৎস্য চাষের মাধ্যমে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব। পরিকল্পিতভাবে কৃষির উন্নয়ন হলে রাঙ্গুনিয়াকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

 

উত্তর জেলা ছাত্র শক্তির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আদনান হোসেন রাফি বলেন, কর্ণফুলী নদী থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের ফলে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং রাস্তাঘাট নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইজারাদাররা শর্তের তোয়াক্কা না করে এক বছরের নির্ধারিত বালু একদিনেই তুলে নেয়। সরকারের কোনো সংস্থা এটি তদারকি করে না। ড্রেজিং প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকার বালু মাত্র ৩০ পয়সা ঘনফুট দরে বিক্রি করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। নদী রক্ষায় ২০০ কোটি টাকার ড্রেজিং বাজেট করতে হয়। বেশির ভাগ টাকা নয়-ছয় করা হয়।

 

উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা কামাল হোসেন বলেন, রাঙ্গুনিয়ার বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো মাদক ও কিশোর গ্যাং। এই ব্যাধি আমাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। এটি কেবল প্রশাসনের মাধ্যমে দমন করা সম্ভব নয়। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত কাউন্সিলিং সেশন আয়োজন করতে হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা জিয়া মঞ্চের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাহেদ আকবর বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে আলেমসমাজ এবং মুরুব্বিদের সম্পৃক্ত করা হোক। সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও উন্নত রাঙ্গুনিয়া উপহার পাব।

 

রোয়াজার হাট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গাজী জসিম উদ্দিন বলেন, আমাদের বাজারে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকার ব্যবসা হয়। কিন্তু এখানে আধুনিক ল্যান্ডিং সেন্টার নেই। একটি মডেল বাজার গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে।

 

রাঙ্গুনিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম বলেন, একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান থাকলে বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা যেত। স্বাস্থ্যব্যবস্থা অবস্থাও খারাপ। একটি মেডিকেল সেন্টার নির্মাণের প্রকল্প রয়েছে। তা দ্রæত বাস্তবায়ন করা হলে মানুষ চিকিৎসাসেবা পেতো।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট