চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

চট্টগ্রামের ছোট্ট টবে আফ্রিকার লোককথার সেই ‘বাওবাব’...

বৃক্ষমেলায় বনসাই নিয়ে আগ্রহ

চট্টগ্রামের ছোট্ট টবে আফ্রিকার লোককথার সেই ‘বাওবাব’…

তাসনীম হাসান

১৩ আগস্ট, ২০২৬ | ২:০৬ অপরাহ্ণ

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালজয়ী উপন্যাস ‘চাঁদের পাহাড়’ পড়েননি, এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া ভার। যার ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে আছে আফ্রিকার অরণ্য, মরুভূমি আর বন্য প্রকৃতির বর্ণনা। সেখানে প্রকাণ্ড ‘বাওবাব’ গাছ দেখে রীতিমতো মুগ্ধ হয়েছিল কাহিনীর নায়ক শঙ্কর। পৃথিবীর বুকে হাজার বছর বেঁচে থাকতে সক্ষম আফ্রিকার সেই কিংবদন্তিতুল্য বনস্পতির দেখা এবার মিলছে চট্টগ্রামের লালদিঘি মাঠে বসা বৃক্ষমেলায়-তবে তার বিশাল কাণ্ড নিয়ে নয়, ছোট্ট এক টবে বনসাই হয়ে।

 

আফ্রিকার নানা লোককথায় বাওবাব ঘিরে আছে নানা বিশ্বাস। কোথাও বলা হয়, এই গাছে বাস করেন ঈশ্বর। তাই গাছটির নিচে দাঁড়িয়ে কিছু চাইলে পূরণ হয় মনোবাঞ্ছা। আবার প্রচুর পানি ধারণের অসাধারণ ক্ষমতা এবং পাতা, ফল, বাকলসহ প্রায় প্রতিটি অংশের ব্যবহার যোগ্যতার কারণে ঊষর অঞ্চলের মানুষের কাছে বাওবাব পরিচিত ‘ট্রি অব লাইফ’ বা জীবনবৃক্ষ নামে। বিজ্ঞানের ভাষায় অবশ্য এর নাম ‘অ্যাডানসোনিয়া ডিজিটাটা’। ফরাসি প্রকৃতিবিদ ও পর্যটক মিশেল অ্যাডানসনের সম্মানেই রাখা হয়েছে এই নাম। আফ্রিকার সেই মহীরুহই দিনের পর দিন, বছরের পর বছর স্নেহ-মমতা আর পরিচর্যায় ছোট্ট পাত্রে বনসাই করে তুলেছেন মোহাম্মদ ইসহাক।

 

পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই ইসহাক ‘আফফান গার্ডেন’ নামের একটি ছাদবাগানের মালিক। ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি তাঁর টান। অক্সিজেন এলাকার নিজের বাড়ির ছাদে গাছ লাগানো দিয়ে শুরু হয়েছিল শখ। প্রায় ৩০ বছরের সাধনায় সেই ছাদ এখন পরিণত হয়েছে সবুজের জঙ্গলে। বাড়তি কিছু বনসাই এবার বিক্রির জন্য নিয়ে এসেছেন মেলায়। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ফাইকাস বেঞ্জামিনা, বার্বাডোস চেরি, ইন্দোনেশিয়ান বট, তেঁতুল, হিজল, শেওড়া, কামিনীসহ নানা গাছের বনসাই। তবে মেলায় আসা বৃক্ষপ্রেমীদের চোখ আটকে যাচ্ছে বাওবাবটিতেই।

 

মোহাম্মদ ইসহাক পূর্বকোণকে বলেন, ‘এই মহাবৃক্ষের আদি নিবাস আফ্রিকা। ছয় প্রজাতির বাওবাবের বেশিরভাগের দেখা মেলে আফ্রিকার মাদাগাস্কারে। এছাড়া জাম্বিয়া, নামিবিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, বতসোয়ানাসহ আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল ও অস্ট্রেলিয়ায় বাওবাব জন্মে। এশিয়ার ওমান ও ইয়েমেনেও দেখা যায় গাছটি। পাঁচ বছর আগে একটি চারা সংগ্রহ করি। ধীরে ধীরে সেটিকে বনসাই আকারে রূপ দিই। এখন বিক্রির জন্য মেলায় এনেছি।’

 

মেলায় বাওবাবের বনসাই ঘিরে দর্শনার্থীদেরও আগ্রহ কম নয়। অনেকে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছেন, কেউ মুঠোফোনে তুলে রাখছেন ছবি। তাঁদেরই একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা এস এম শামসুল ইসলাম। পূর্বকোণকে তিনি বলেন, ‘নানা দেশের বিখ্যাত গাছপালা নিয়ে পড়াশোনা করতে ভালো লাগে। বাওবাব গাছ নিয়েও বিস্তারিত পড়েছিলাম। এর কাণ্ড প্রকাণ্ড মোটা ও ফাঁপা হয়। কোনো কোনো বাওবাবের কাণ্ডে এক লাখ লিটার পর্যন্ত পানি ধারণ করতে পারে বলে জানা যায়। আফ্রিকার সেই বিখ্যাত গাছটি এখানে দেখে ভালো লাগছে।’ বৃক্ষমেলায় আগে দু-একটি স্টলে দু-একটি বনসাই দেখা গেলেও এবার চিত্রটা বদলেছে। শুধু বনসাই নিয়েই বসেছে আলাদা স্টল। পাশাপাশি অধিকাংশ স্টলেই দেখা মিলছে টবের ভেতর যত্নে গড়ে তোলা এই ক্ষুদ্র বৃক্ষশিল্পের।

 

মেলা ঘুরে দেখা গেছে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ায় পাওয়া ফাইকাস বেঞ্জামিনা জাতের একটি বনসাইয়ের দাম হাঁকা হয়েছে এক লাখ টাকা। প্রায় ৩০ বছর বয়সী চায়নিজ বটের দামও চাওয়া হচ্ছে লাখ টাকা। থাইল্যান্ডের শেফ্লেরা জাতের ৩০ বছর বয়সী বনসাইয়ের দাম ৩০ হাজার টাকা। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের বার্বাডোস চেরি জাতের বনসাইয়ের দাম ২৫ হাজার টাকা। ছাতার মতো ছাদ বা স্তরে স্তরে ছড়ানো পাতার বিন্যাসের জন্য নাকাচুয়া গাছের বনসাইও নজর কাড়ছে। আর শিমুল তুলার ২৬ বছর বয়সী বনসাইয়ের দাম চাওয়া হচ্ছে ২০ হাজার টাকা।

 

লাখ টাকা দাম হাঁকা চায়নিজ বটটি গড়ে তুলেছেন ‘জান্নাত শপ’-এর স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ আতওয়াবুল ইসলাম। তিনি জানান, মেলার শুরুর দিন থেকেই বনসাইটির প্রতি দর্শনার্থীদের বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী দাম পাবেন বলেও আশা করছেন তিনি।

 

ইসলামাবাদ নার্সারির কর্মী শফিকুল আলমের হাতেও বেড়ে উঠেছে বেশ কয়েক জাতের বনসাই। এই প্রবীণ বৃক্ষপ্রেমী পূর্বকোণকে বলেন, ‘দিনে দিনে শৌখিন বৃক্ষপ্রেমীর সংখ্যা বাড়ছে। তাঁদের বেশিরভাগেরই আগ্রহ বনসাই নিয়ে। সেজন্য নার্সারিগুলোও বনসাই তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে।’

 

বাওবাব থেকে চায়নিজ বট, শিমুল থেকে বার্বাডোস চেরি-বৃক্ষমেলায় ছোট ছোট টবে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় গাছের গল্প। কোনোটি কয়েক দশকের পুরোনো, কোনোটি এসেছে বহু দূরের দেশ থেকে। কোথাও লাখ টাকার দাম, কোথাও বছরের পর বছর পরিচর্যার স্মৃতি। সেই স্মৃতি জমাতেই মেলায় আসছেন বৃক্ষপ্রেমীরা।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট