সাদমান ইসলাম। পড়াশোনায় যেমন মনোযোগী, ক্রিকেটের প্রতিও ছিল প্রবল ঝোঁক। কখনো পাঁচ-ছয় ঘণ্টা টানা পড়াশোনা, আবার কখনো হাতে ব্যাট নিয়ে খেলায় মেতে ওঠা-এভাবেই বেড়ে উঠেছে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী সাদমান ইসলাম। সাদমান এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ১ হাজার ৩০০ নম্বরের মধ্যে ১ হাজার ২৭১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। যা ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে সর্বোচ্চ নাম্বার বলে জানা যায়। মোবাইল ফোনের প্রতি আগ্রহ থাকলেও মায়ের কড়া শাসনে সেটি নিয়মিত ব্যবহার করা হয়নি সাদমানের। গণিত, ফিজিক্স ও ইংরেজি অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে গিয়েছে। সবকিছু ছাড়িয়ে এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে হয়েছে সেরাদের সেরা।
ছেলের এমন সাফল্যে উচ্ছ¡সিত তার মা শাহিদুন্নিসা। ছেলের এই সাফল্যের পেছনে নিজের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি ওকে নিয়ে একপ্রকার যুদ্ধই করেছি।’
সাদমানের বাবা ফখরুল ইসলাম কুমিল্লায় একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন। চাকরির কারণে তাকে কুমিল্লায় থাকতে হয়। ফলে ছেলের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন দেখাশোনার প্রায় পুরো দায়িত্বই ছিল মায়ের ওপর। ছেলের বোর্ডসেরা হওয়ার খবর পেয়ে রেজাল্টের দিন রাত ১০টার দিকে কুমিল্লা থেকে চট্টগ্রামে ছুটে আসেন বাবা। শাহিদুন্নিসা বলেন, ‘আমার ছেলে পঞ্চম শ্রেণি থেকেই কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষার্থী। পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে সে কলেজিয়েটে ভর্তি হয়। এরপর থেকে স্কুলে ওর রোল এক ছিল।’
ছেলের পড়াশোনার পেছনে নিজের ভ‚মিকার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ওর বাবা চট্টগ্রামের বাইরে থাকায় ওর দেখাশোনার পুরো দায়িত্ব আমার ওপরই ছিল। ওর বাবা সপ্তাহে একবার এসে হয়তো দেখা করে যেতেন, কিন্তু এখানে থাকতে পারতেন না। তাই আমি ওকে নিয়ে একপ্রকার যুদ্ধ করেছি।’
তবে সাদমানকে শুধু পড়ার টেবিলে আটকে রাখেননি তার মা। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও ছেলের আগ্রহকে স্বাভাবিকভাবেই দেখেছেন তিনি। শাহিদুন্নিসার ভাষায়, ‘ও পাঁচ-ছয়-সাত ঘণ্টা পড়াশোনা করত। আবার উঠে খেলত। হাতে ব্যাট থাকত, কাঁধে ব্যাগ থাকত। স্কুলেও ব্যাট নিয়ে যেত। বাসায় এসেও খেলা শুরু করে দিত। ও স্থির ছিল না, ওকে কিছুটা চঞ্চল বলা যায়। ক্রিকেট ওর খুব পছন্দ।’
পড়াশোনার ক্ষেত্রে অবশ্য কোনো ধরনের গাফিলতি ছিল না সাদমানের। স্কুলের ক্লাস, শিক্ষকদের কাছে পড়া ও অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়মিত করত। কোনো ক্লাস বা পড়াশোনা মিস করত না। মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগও ছিল সীমিত।
একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন অলিম্পিয়াডেও সাদমানের ছিল সাফল্য। গণিত অলিম্পিয়াড, ফিজিক্স অলিম্পিয়াড ও ইংরেজি অলিম্পিয়াডেও জাতীয় পর্যায়ে সুযোগ পেয়েছে।
সাদমানের আত্মবিশ্বাস তৈরিতে স্কুলের শিক্ষকদের ভ‚মিকার কথাও উল্লেখ করেন তার মা। তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় ওকে বলতাম, বাবা তুমি পারবা। তোমার মধ্যে আল্লাহ প্রতিভা দিয়েছেন। স্কুলে টেস্ট পরীক্ষা দেওয়ার সময় ও যখন প্রথম হলো, তখন শিক্ষকরা বলেছিলেন, তুমি কিন্তু র্যাংকিংয়ে থাকার চেষ্টা করবে। স্কুল এবং কোচিং এর শিক্ষকদের কথামত পড়াশুনা করতো সে। আজকের পড়া কখনো সে আগামীকালের জন্য রাখেনি।’
শিক্ষকদের সেই কথাই সাদমানের মনে গেঁথে যায় বলে জানান শাহিদুন্নিসা। তার ভাষায়, ‘ওর মনের মধ্যে তখন একটা বিষয় তৈরি হয়ে যায়-আমাকে র্যাংকিংয়ে থাকতেই হবে। মা-বাবার কথা ও অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। ও মনে করেছে, আমাকে আমার মায়ের চাওয়াটা পূরণ করতে হবে।’
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ তজল্লী আজাদ বলেন, আমাদের শিক্ষার্থীরা বরাবরের মতো ভালো রেজাল্ট করেছে। ১২৭১ নম্বর পেয়ে বোর্ডে প্রথম হয়েছে সাদমান ইসলাম, ১২৬৯ নম্বর দ্বিতীয় হয়েছে রোজবাহ উদ্দিন রোহান। এছাড়াও আরো অনেকেই মেধা তালিকায় রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, এসব শিক্ষার্থীদের নিয়ে আমাদের প্রত্যাশাও ছিল। শিক্ষার্থীরা আমাদের প্রত্যাশা পূরণ করেছে। আমাদের দক্ষ শিক্ষকবৃন্দের গাইডলাইন এবং অভিভাবকদের সহযোগিতায় আজকের এই সাফল্য।
সাদমানদের গ্রামের বাড়ি বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর জেলা সদরের ঝালকাঠি গ্রামে। সাদমানের একটি বোন রয়েছে। বোন বর্তমানে চট্টগ্রামের বাওয়া স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে।
ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত শাহিদুন্নিসা বলেন, ‘মোটামুটি আল্লাহর রহমতে সবকিছুতেই ভালো করত। আমরা চেষ্টা করেছি ওকে সঠিকভাবে এগিয়ে দিতে।’
জানতে চাইলে সাদমান বলেন, আমার দৈনিক ১৫ বা ১৮ ঘণ্টা পড়াশুনা করার জন্য কখনো কোন টার্গেট ছিল না। তবে ডেইলির পড়া ডেইলিই শেষ করতাম। আমি মূলত স্পোর্টস লাভার। বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করতাম। এখন আমার স্বপ্ন হচ্ছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তি হওয়া। বোর্ডসেরা হওয়ার পর এখন সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই এগোতে চায়।
পূর্বকোণ/ইবনুর















