ক্যান্সার আর দূরের কোনো রোগ নয়-এটি এখন প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবারের সম্ভাব্য বাস্তবতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যান্সার (আইএআরসি)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়ন বলছে, জীবদ্দশায় প্রতি পাঁচজনের একজন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবেন। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন, যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে। আগামী দশকগুলোতে এই সংখ্যা আরও বাড়বে। জনবহুল বাংলাদেশের জন্য এটি কেবল স্বাস্থ্য সমস্যা নয়- মানবসম্পদ, অর্থনীতি ও জাতীয় উন্নয়নের জন্য এক ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ। তাই প্রতিরোধ, প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও মানসম্মত ক্যান্সারসেবায় বিনিয়োগ আজ আর বিলাসিতা নয়; এটি জাতীয় অগ্রাধিকার।
ঘাটতি দক্ষতার নয়, ব্যবস্থার
প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান, যার ফলে উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। অথচ কোভিড-১৯ মহামারিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বন্ধ থাকা সত্ত্বেও দেশের ক্যান্সারসেবা ভেঙে পড়েনি। এতে স্পষ্ট হয়, ঘাটতি চিকিৎসকের দক্ষতায় নয়-ঘাটতি একটি সমন্বিত, রোগীকেন্দ্রিক ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সেবা-ব্যবস্থায়। আমাদের ক্যান্সারসেবার অন্যতম বড় দুর্বলতা হলো খণ্ডিত (Fragmented) চিকিৎসা ব্যবস্থা। অনেক ক্ষেত্রেই রোগীর চিকিৎসা-পরিকল্পনা বহুবিষয়ক টিউমার বোর্ড (মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিউমার বোর্ড)-এ আলোচনা ও সম্মিলিত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হয় না। ফলে রোগীরা প্রয়োজনীয় সমন্বিত ও ধারাবাহিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হন। একটি প্রকৃত (সেন্টার অব এক্সেলেন্স)-এর উৎকর্ষ কেবল প্রযুক্তি বা দক্ষতায় নয়; রোগী হাসপাতালে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি পর্যায়ে যথাযথ সম্মান, সহমর্মিতা, মানবিক আচরণ এবং নিরবচ্ছিন্ন রোগীকেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করায়। এই সংস্কৃতি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে তুলতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা অপরিহার্য।
বহুবিষয়ক সেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা
ক্যান্সার চিকিৎসা কোনো একক চিকিৎসকের কাজ নয়; এটি সার্জন, মেডিকেল ও রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, রেডিওলজিস্ট, প্যাথোলজিস্ট, নার্স, পুষ্টিবিদ, কাউন্সেলর, ফিজিওথেরাপিস্ট ও প্যালিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞসহ একটি বহুবিষয়ক দলের সমন্বিত প্রচেষ্টা। ক্যান্সারজয়ীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ, পুনর্বাসন, চিকিৎসা-পরবর্তী যৌনস্বাস্থ্য, প্রজননক্ষমতা সংরক্ষণ, মানসিক সহায়তা, বাড়িভিত্তিক সেবা ও কর্মজীবনে স্বাভাবিক প্রত্যাবর্তনও এখন আধুনিক ক্যান্সারসেবার অপরিহার্য অংশ। বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি অলাভজনক সেন্টার অব এক্সেলেন্স, যেখানে প্রতিরোধ, স্ক্রিনিং, রোগনির্ণয়, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, শিক্ষা, ক্যান্সার রেজিস্ট্রি ও গবেষণা মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ক্যান্সার কেয়ার ইকোসিস্টেম গড়ে উঠবে।
টেকসই অর্থায়ন: ক্রস-সাবসিডি মডেল
এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হতে পারে একটি অলাভজনক মডেল, যেখানে উদ্বৃত্ত অর্থ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মুনাফা হিসেবে বিতরণ না করে রোগীসেবা, আধুনিক প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় পুনর্বিনিয়োগ করা যেতে পারে। ভারতের Tata Memorial Centre-এর Cross-Subsidz Model অনুসরণে একই প্রতিষ্ঠানে প্রিমিয়াম, সাধারণ এবং সম্পূর্ণ ভর্তুকিপ্রাপ্ত সেবার সমন্বয় থাকবে, যেখানে সচ্ছল রোগীদের প্রদত্ত আয়ের একটি অংশ অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এর পাশাপাশি CSR, যাকাত, ওয়াক্ফ এবং Endowment Fund-এর সমন্বয়ে একটি স্থায়ী No Patient Left Behind” Cancer Support Fund গড়ে তুলতে পারলে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল রোগীদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করবে। The Christie NHS Foundation Trust (UK) এবং King Hussein Cancer Center (Jordan) এর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি স্বতন্ত্র বাংলাদেশি হাইব্রিড অর্থায়ন মডেল গড়ে তোলা সম্ভব।
এ ধরনের একটি মডেলের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে, কারণ ক্যান্সার চিকিৎসায় মলিকুলার ডায়াগনস্টিকস ও প্রিসিশন মেডিসিনভিত্তিক টার্গেটেড থেরাপির উচ্চ ব্যয়ের পাশাপাশি চিকিৎসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অদৃশ্য আর্থিক ব্যয়- যেমন যাতায়াত, আবাসন, কর্মক্ষমতা হারানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার খরচ- বহু পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি একটি আর্থিক পরামর্শ ও সহায়তা ইউনিট গঠন করা জরুরি, যা রোগীদের অর্থায়নের উৎস, সহায়তা তহবিল ও সরকারি- বেসরকারি সুবিধা সম্পর্কে পরামর্শ দেবে। একই সঙ্গে দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আগত, বিশেষ করে অসচ্ছল রোগীদের জন্য স্বল্পমূল্যের রোগী ও স্বজন আবাসন প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যা চিকিৎসার সামগ্রিক ব্যয় কমাতে এবং চিকিৎসা সম্পন্ন করার সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
চট্টগ্রাম কেন প্রথম পছন্দ
দেশের অন্যান্য বিভাগের তুলনায় চট্টগ্রাম বিভাগে ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক। চট্টগ্রামে একটি বিশ্বমানের অলাভজনক ক্যান্সার সেন্টার অব এক্সেলেন্স প্রতিষ্ঠা সরকারের ক্যান্সারসেবা বিকেন্দ্রীকরণ নীতিকে শক্তিশালী করবে। এতে ঢাকার ওপর চাপ কমবে, দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মানুষের জন্য বিশেষায়িত ক্যান্সারসেবা সহজলভ্য হবে এবং চিকিৎসাসেবায় আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সাশ্রয়ী ব্যয়ে আন্তর্জাতিক মানের ক্যান্সারসেবা প্রদান করে আঞ্চলিক রোগীদের আকৃষ্ট করতে পারবে। পাশাপাশি এই উদ্যোগ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়ে স্বাস্থ্যসেবাকে একটি সম্ভাবনাময় হেলথ ইকনোমিতে রূপ দিতে সহায়ক হতে পারে।
সুশাসনই মূল চাবিকাঠি
একটি স্বাধীন, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিচালনা কাঠামো ছাড়া কোনো উৎকর্ষ কেন্দ্র দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। প্রবাসী বাংলাদেশি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ও কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি ও দক্ষতা বিনিময় এই উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করবে এবং জনআস্থা গড়ে তুলবে।
আহ্বান: চট্টগ্রাম কল
ক্যান্সার চিকিৎসা কোনো ব্যবসা নয়- এটি মানুষের প্রতি আমাদের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। একটি বিশ্বমানের অলাভজনক ক্যান্সার সেন্টার অব এক্সেলেন্স হতে পারে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ, আর তার সূচনা হোক চট্টগ্রাম থেকে। এক টেবিলে আসুন চিকিৎসক, সাংবাদিক উদ্যোক্তা, শিল্পপতি, সমাজসেবী ও নীতিনির্ধারকেরা। উচ্চারিত হোক ‘চট্টগ্রাম কল’ বাংলাদেশের প্রথম অলাভজনক ক্যান্সার সেন্টার অব এক্সেলেন্স গড়ে তোলার সম্মিলিত আহ্বান। আজকের অঙ্গীকারই হোক আগামী দিনের বাস্তবতা।
লেখক: প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।















