দক্ষিণ চট্টগ্রামে এক সময় নৌ বাণিজ্যের সূতিকাগার ছিলো পটিয়া। ইন্দ্রপুল ঘিরে জমজমাট ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। সেই সোনালি দিন এখন কেবলই অতীত। ব্যবসা-বাণিজ্যের এই স্থবিরতা কাটাতে প্রয়োজন কৃষিতে বিপুল বিনিয়োগ। শ্রীমতি খাল সংস্কার করে রাবার ড্যাম নির্মাণ, কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করলে বাঁচবে পটিয়ার কৃষি। এছাড়া আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আদি বাসস্থানে জাদুঘর, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেরিন ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হলে শিক্ষা-সংস্কৃতিতেও ঘটবে আমূল পরিবর্তন।
‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-১২, পটিয়া) : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় পটিয়ার নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি পটিয়া প্রেসক্লাবে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালনা করেন পূর্বকোণের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজিম মুহাম্মদ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে হাইদগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি দে বলেন, পটিয়া একসময় শিক্ষা ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে থাকলেও, বর্তমানে ইভটিজিং, মাদক এবং কিশোর গ্যাং বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পটিয়ায় কোনো স্থায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নেই; একজন অফিসারকে তিনটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হয়। যা দিয়ে সঠিক তদারকি সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম যেন আমাদের বিপ্লবীদের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে, সেজন্য আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ গবেষণা কেন্দ্র এবং প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আদি বাসস্থানে একটি জাদুঘর বা স্থাপনা নির্মাণ করা প্রয়োজন। এছাড়া কৃষি বাঁচাতে শ্রীমতি খালসহ অন্যান্য খালগুলো সংস্কার, রাবার ড্যাম প্রকল্প চালু করা যেতে পারে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ডাম্পিং স্টেশন বানিয়ে সার উৎপাদন করা সম্ভব।
সব মহকুমা জেলা হয়ে গেলেও পটিয়া অবহেলার শিকার বলে মনে করেন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি হারুনুর রশিদ। তিনি বলেন, পটিয়া মূলত কৃষি ও মৎস্য সম্ভাবনাময় এলাকা। সরকার যদি কৃষকদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেয়; বিশেষ করে পটিয়ার সরকারি হ্যাচারিগুলোকে যদি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা হয়, তবে সুফল মিলবে। প্রয়োজনে কৃষি ও মৎস্যজীবী সমাজের উন্নতির জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গৌতম চৌধুরী বলেন, পটিয়ার কেলিশহরে উৎপাদিত প্রচুর পরিমাণ সবজি প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, কৃষকদের মধ্যে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি; যেমন জৈব বালাইনাশক বা সুষম সার ব্যবহারের প্রতি অনীহা আছে। ফলে তাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। তারা চাষাবাদে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
তিনি বলেন, কৃষি খাতে শ্রমিকের তীব্র সংকট দূর করতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। রাইস ট্রান্সপ্লান্টার বা ধান কাটার মেশিনের মতো যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য সরকারিভাবে কৃষকদের যথাযথ সহায়তা দেওয়া দরকার। লবণাক্ততা দূর করে মিষ্টি পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে খালগুলো খনন করা প্রয়োজন। উৎপাদিত ফসল সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
উন্নয়নকে শুধু শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রামীণ জনপদে ছড়িয়ে দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন ইসলামী ফ্রন্ট চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার সাধারণ সম্পাদক আলী হোসাইন। তিনি বলেন, পটিয়ার শিক্ষিত ও বিত্তবান শিল্পপতিদের কৃষি খাতে বড় আকারে বিনিয়োগ করা উচিত; যাতে আমাদের বিখ্যাত ‘গুড়া কচু’ বা খরনার পেয়ারা চাষকে শিল্প পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
আলী হোসাইন বলেন, পটিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ গ্যাস ও তেলের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে খননের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। পাহাড়ের পাদদেশে ও কর্ণফুলী নদীর পাড় ঘেঁষে পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা সম্ভব। এছাড়া অপরিকল্পিত শিল্পায়নের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির যে সংকট তৈরি হচ্ছে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি। পটিয়া বিসিককে আধুনিকায়ন করে ক্ষুদ্রশিল্প স্থাপন করলে অনেক নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেই। পটিয়ায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেরিন ইনস্টিটিউট এবং পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করা সময়ের দাবি। প্রশাসনিকভাবে পটিয়া সদরকে আরও গতিশীল করতে এবং জনসেবা নিশ্চিত করতে শান্তির হাট এলাকাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন পৌরসভা হতে পারে। এতে জনসেবা বাড়বে।
পটিয়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি রয়েছে জানিয়ে লেখক এস এম এ কে জাহাঙ্গীর বলেন, রাস্তার পাশে ময়লা ফেলে রাখা হচ্ছে। সেগুলো পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। এ কারণে বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে বায়ুদূষণ ঘটছে। আমজুর হাট এলাকায় একটি কারখানার বর্জ্যের কারণে ভেল্লাপাড়া পর্যন্ত খালের পানি কুচকুচে কালো ও দূষিত হয়ে পড়েছে। যা একইসাথে মাটি ও পানি উভয়কেই মারাত্মকভাবে দূষিত করছে।
পটিয়া আদালত ভবনের সংস্কার জরুরি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত পটিয়ার যুগ্ম জেলা জজ আদালত ভবনের অবকাঠামো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। আদালত ভবনের উন্নয়নে বরাদ্দ এলেও অজ্ঞাত কারণে কাজ শুরু হচ্ছে না। সম্প্রতি ব্যাংক থেকে অনেক ছেলে চাকরিচ্যুত হওয়ায় এলাকায় সামাজিক ও পারিবারিক অস্থিরতাও তৈরি হয়েছে। কয়েকটি এলাকায় মাদকের কারবার তরুণ সমাজকে ধ্বংস করছে।
এলাকার উন্নয়ন ভাবনা নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যকে প্রতি ছয় মাস অন্তর জনগণের মুখোমুখি হওয়ার আহ্বান জানান বাসদ জেলা কমিটির সদস্য স. ম. ইউনুছ। তিনি বলেন, পাহাড়ি এলাকায় প্রায় ২৬ হাজার একর অনাবাদি খাস জমি রয়েছে; এই জমিগুলো নির্দিষ্ট শর্তে লিজ দিয়ে পেয়ারা, লেবু বা আনারসের বাগান করা যায়। এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা যায়। এতে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত যুবকের কর্মসংস্থান হবে।
স. ম. ইউনুছ বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ইন্দ্রপুল এলাকায় একটি ‘মিনি পোর্ট’ বা ক্ষুদ্র বন্দর স্থাপনের প্রস্তাব করছি। এতে নৌপথে ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসবে। একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী হিসেবে বলছি সরকারি অফিস-আদালতসহ সব ভবনে প্রতিবন্ধীদের যাতায়াতের জন্য র্যাম্প করা উচিত। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে পটিয়া হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা দরকার। পটিয়ার তিন লাখ নারীর সুচিকিৎসার জন্য একটি আলাদা ম্যাটারনিটি সেন্টার বা মহিলা হাসপাতাল নির্মাণ করতে হবে।
পূর্বকোণ/ইবনুর
















