চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্বপ্নের উপশহর কত দূর

স্বপ্নের উপশহর কত দূর

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন

১৮ মে, ২০২৬ | ২:১০ অপরাহ্ণ

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রত্যাশা করছেন বোয়ালখালীবাসী। এছাড়া আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি-দখলদার নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, খাল খননে কৃষির উন্নয়ন, মাদক-জুয়া বন্ধ, গণপরিবহন চালু, রাস্তাঘাট-অবকাঠানোর উন্নয়ন, নারী উন্নয়নে কর্মমুখী শিক্ষা, বাল্যবিবাহ বন্ধ, ক্রীড়া-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উন্নয়ন, বিনোদনকেন্দ্র স্থাপনসহ একগুচ্ছ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে শহরতলীর উপজেলা বোয়ালখালীকে উপ-শহর হিসেবে গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।

 

‘স্বনির্ভর বোয়ালখালী : চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক আলোচনায় বোয়ালখালীর বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাবনা দিয়েছেন। সম্প্রতি দৈনিক পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী কনফারেন্স হলে এই গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়।

 

চট্টগ্রামের সংসদীয় এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, সমস্যা- সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় করণীয় কী সেসব তুলে এনে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে নতুন সরকারের কাছে প্রস্তাব আকারে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে দৈনিক পূর্বকোণ এই উদ্যোগ গ্রহণ করে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা সরকার এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করলে প্রতিটি আসনের দৃশ্যমান উন্নতি হবে। সার্বিক ও ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন সাধিত হলে স্বনির্ভর এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

 

ধারাবাহিক আলোচনায় স্ব স্ব এলাকার রাজনীতিবিদ-শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই জনপদের সমস্যা-সম্ভাবনার চিত্র তুলে আনে পূর্বকোণ।

 

সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া বোয়ালখালীকে উপশহর হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকায় স্বপ্নের উপশহর আর গড়ে উঠেনি। চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে লাগোয়া উপজেলা হওয়া সত্তে¡ও উন্নয়ন অবহেলা-বঞ্চনার শিকার এই জনপদ পিছিয়ে রয়েছে। তাই নতুন সরকারের কাছে এখানকার মানুষের প্রত্যাশা বেশি।

 

দৈনিক পূর্বকোণের সম্পাদক ডা. ম রমিজউদ্দিন চৌধুরী বলেন, পূর্বকোণের প্রধান লক্ষ্যই হলো চট্টগ্রামকে হাইলাইট করা। পূর্বকোণের ৪১ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে প্রকাশিত ক্রোড়পত্রগুলোতেও চট্টগ্রামকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে এখন নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। বাংলাদেশকে বিশ্বে উন্নত দেশ হিসেবে প্রমাণ করতে হবে। পৃথিবীতে কি হচ্ছে, কীভাবে আমাদের দেশকে আমরা তুলে ধরবো, অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমরা কীভাবে নেগোশিয়েট করবো-তার গতি-প্রকৃতি কিন্তু চেঞ্জ হয়ে গেছে। তা অনুধাবন করলেই বুঝতেই পারবেন, আমরা আসলেই পিছিয়ে যাচ্ছি। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

 

সঞ্চালক পূর্বকোণের সিনিয়র সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতা মাথায় রেখে পূর্বকোণের এ আয়োজন।

 

বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আজিজুল হক চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনে বিএনপি ও দলীয় সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহর অনেক অঙ্গীকার রয়েছে। সর্বপ্রথম অঙ্গীকার হচ্ছে, কালুরঘাট সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করা। ব্রিজটি নির্মিত হলে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠবে। মানুষের কর্মসংস্থান হবে। বোয়ালখালী হবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়ার ঘোষিত উপশহর।

 

চট্টগ্রাম শহরের আয়তনের সমান বিশাল পাহাড়ি এলাকা রয়েছে উল্লেখ করেন আজিজুল হক চেয়ারম্যান বলেন, জ্যৈষ্ঠপুরায় ওয়াসার ভাণ্ডালজুড়ি প্রকল্প ঘিরে পর্যটন এলাকায় পরিণত হয়েছে। নদী-পাহাড় ও ঝিরি ঘিরে নান্দনিক পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। ভাণ্ডালজুড়ি খালের মুখে স্লুইস গেট স্থাপন ও খাল খনন করা হলে পর্যটনশিল্প এবং কৃষি খাতের আমূল পরিবতন আসবে। নদী ভাঙনরোধ, খাল খনন, কৃষির উন্নয়ন, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি-চর্চা এবং এলাকার উন্নয়নে বিএনপি সরকারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। মোবাইল জুয়ায় নিঃস্ব হয়ে ইতিমধ্যে চার-পাঁচ জন ইয়াং ছেলে আত্মহত্যা করেছে। সবার সহযোগিতায় আমরা সুন্দর বোয়ালখালী উপহার দিতে চাই। যোগাযোগব্যবস্থা সহজ ও সাশ্রয়ী করার লক্ষ্যে গণপরিবহন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির দক্ষিণ জেলা শাখার সভাপতি অধ্যাপক কানাই দাশ বলেন, বোয়ালখালী থেকে যিনি জনপ্রতিনিধি হন তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের একটা বিরাট অংশেরও প্রতিনিধি। তাই বোয়ালখালীর উন্নয়নের স্বার্থে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্বিন্যাস করা দরকার। একজন জনপ্রতিনিধির জন্য শুধু বোয়ালখালীর প্রবলেমটা মাইনর হয়ে যায়। বোয়ালখালীর সঙ্গে পটিয়ার দুই-তিনটা ইউনিয়ন নিয়ে বা অন্য যেকোনভাবে স্বতন্ত্র আসন করা দরকার।

 

প্রবীণ শিক্ষক নেতা কানাই দাশ বলেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এখন বাণিজ্যিকিকরণ হয়ে গেছে। ক্লিনিক ও কোচিং সেন্টার ব্যবসা এখন গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে গেছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য গেলে মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। উপজেলার পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চল ভাগ করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আদলে আরও দুইটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হলে রোগীর চাপ কমবে।

 

তিনি বলেন, লবণাক্ততা ও শিল্পবর্জ্যরে কারণে বোয়ালখালীর বিশাল এলাকাজুড়ে চাষাবাদ হচ্ছে না। কালুরঘাট, মিলিটারি পুল ও ফুলতলী এলাকা এখন শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। পৌরসভার বাইরে পরিকল্পিতভাবে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রস্তাব করছি।

 

বোয়ালখালী উপজেলা জামায়াতের আমির ডা. খোরশেদ আলম বলেন, মানুষের প্রত্যাশা হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা। যাতে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। উপজেলার পূর্বাঞ্চলের তিনটা ইউনিয়নে বিশাল কৃষিজমি রয়েছে। ভাÐালজুড়ি খালে স্লুইস গেট দিয়ে পাহাড়ি ও নদীর পানি ধরে রাখা হলে বিস্তৃর্ণ এলাকা চাষাবাদের আওতায় আসবে। একইভাবে পশ্চিমাঞ্চলের কর্ণফুলীতে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলে বিশাল জনগোষ্ঠীর উপকার হবে।

 

তিনি বলেন, রাস্তায় ডেলিভারি হওয়ার নজির রয়েছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকে না। উপজেলার পূর্বাঞ্চলে জরুরিভাবে একটা মেডিকেল হাসপাতাল করতে হবে।

 

পশ্চিম গোমদণ্ডী ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান রফিক আহমেদ বলেন, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মধ্যে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জনপদ হচ্ছে বোয়ালখালী। একটিমাত্র কালুরঘাট সেতুর দাবি করতে করতে আমাদের দিন শেষ। বোয়ালখালী একসময়ে স্বনির্ভর উপজেলা ছিল। এখন সবজি উৎপন্ন হয় না। ধানের চাষ একেবারে কমে গেছে। এখন বড় সমস্যা হচ্ছে জলাবদ্ধতা। কর্ণফুলীর শহরাঞ্চলের মেরিন ড্রাইভ (শহর রক্ষা বাঁধ) কারণে পানির স্রোতের বিপরীত দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্বপ্ন ছিল স্বনির্ভর বাংলাদেশ। এ জনপদের খালগুলো খনন করা হলে চাষাবাদ বাড়বে। জলাবদ্ধতা কমবে।

 

বোয়ালখালী স্টুডেন্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতীকী জাতিসংঘ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ছাবেকুর নাহার জিসান বলেন, বোয়ালখালীর সমস্যার কথা বললেই প্রথমে ওঠে আসে নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থার। প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। সন্ধ্যা হলে ৫-১০ টাকার ভাড়া ২০-৩০ টাকা হয়ে যায়। আশা করি, এবার আমরা একটা সমাধান পাবো।

 

তিনি বলেন, রুট লেভেল থেকে পড়াশোনা করে হায়ার স্টাডিজ পর্যন্ত যাওয়া খুবই টাফ একটা বিষয়। এখানে এতটা প্রমোট করা হয় না। কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। পাশাপাশি নারীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে নজর দিতে হবে। কারণ জনসংখ্যার বড় অংশ হচ্ছে মহিলা। এছাড়া সচেতনতার অভাবে অল্প বয়সে বিয়ে ও সন্তানের মা হওয়ার কারণে বেশির ভাগ নারী শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। কর্মমুখী শিক্ষার মাধ্যমে নারীসমাজকে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে।

 

বোয়ালখালী প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদ বলেন, সরকার ও জনপ্রতিনিধির কাছে মানুষ প্রথমেই চাই সামাজিক নিরাপত্তা। আইন-শৃঙ্খলার উত্তরণ। মানুষ চায় চাঁদাবাজি-দখলবাজিমুক্ত পরিবেশ। বোয়ালখালীতে একটি সরকারি কলেজ আছে। কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ সরকারি কলেজ। প্রাচীন এই কলেজে শুধুমাত্র একটা বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু আছে। শিক্ষক-জনবলসহ নানা সংকটে শিক্ষার পরিবেশ নাজুক হয়ে পড়েছে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট