রাতটা ছিল অন্য দশটা রাতের মতোই। তখন ফ্রান্সের লরিয়েঁ ক্লাবে খেলছেন ইয়োয়ান উইসা। সেদিন অটোগ্রাফ নেওয়ার অজুহাতে লায়েটিসিয়া নামের এক নারী ঢুকে পড়েন তাঁর বাড়িতে। অতিথি ভেবেই তাকে জায়গা দেওয়া হয়েছিল ঘরে। কেউ বুঝতে পারেনি, হাসিমুখে বসে থাকা সেই নারীই কিছুক্ষণ পর হয়ে উঠবেন আততায়ী।
রাতে বাড়ি ফিরছিলেন উইসা। দরজা খুলতেই মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মুখে অ্যা*সি*ড ছুড়ে মারেন ওই নারী।
এক সেকেন্ড। হয়তো তারও কম। আর তাতেই বদলে যায় পুরো জীবন। চোখ-মুখ ঝলসে যায়। নিঃশ্বাসও নিতে পারছিলেন না উইসা।
হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এতটাই প্রবল ছিল যে জরুরি অস্ত্রোপচার করতে হয়।
পরবর্তী দিনগুলো উইসার জন্য যেন ছিল এক দীর্ঘ দুঃস্বপ্ন। প্রতি ঘণ্টায় চোখ ধোয়া, অসহ্য যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষা-আবার কখনও পৃথিবীটাকে দেখতে পারবেন কি না, আদৌ কি ফিরতে পারবেন প্রিয় ফুটবলে!
সেই অপেক্ষা ফুরায় ছয় মাস পর। তিনি ফিরে পান পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি। পরে জানা যায়, তাঁর সন্তানকে অপহরণের উদ্দেশ্যেই এই হামলা চালিয়েছিল ওই নারী।
কিন্তু হামলাকারী শুধু তাঁর চোখে-মুখে আঘাত করেনি। আঘাত করেছিল তাঁর মনের গভীরেও।
সেই থেকে বাকি জীবন চোখের ড্রপ তাঁর নিত্যসঙ্গী। মুখে রয়ে গেছে দাগ। আর মনে থেকে গেছে আতঙ্কের ছায়া।
উইসা একবার বলেছিলেন, ‘সেই ঘটনার পর থেকে আমি অনেকটাই গুটিয়ে গেছি। এখন আমি এমন মানুষের ভিড়ে থাকতে পারি না, যাদের আমি চিনি না। আগের মতো ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারি না। রাস্তায় হাঁটার সময়ও অজান্তেই বারবার পেছনে তাকাই। আর রাতে একা থাকলে ঘুমাতে পারি না।’
চাইলেই হয়তো অস্ত্রোপচার করে মুখের দাগগুলো মুছে ফেলতে পারতেন উইসা। কিন্তু করেননি। ‘সন্তানসম’ ভালোবাসায় সেগুলোকে যত্ন করে পুষছেন। কারণ, সেই দাগগুলো তাঁর কাছে ক্ষত নয়, ইতিহাস।
উইসা সেটিই বলেছিলেন,’আমার সন্তানরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, আমার মুখে কী হয়েছে। কিন্তু তারা এখনো এত ছোট যে তাদের পুরো ঘটনা বলতে পারি না। চিকিৎসকেরা আমাকে আরেকটি অস্ত্রোপচারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি তা প্রত্যাখ্যান করেছি। কারণ, এই দাগগুলো এখন আমার ব্যক্তিগত ইতিহাসেরই অংশ।’
হামলার শিকার হওয়ার সেই দিনটি ছিল ২০২১ সালের ১ জুলাই।
তার পাঁচ বছর পর, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে, সেই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত হলো আরেকটি অধ্যায়।
মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সেই তরুণ এবার সোনার হরফে নাম লেখালেন দেশের ফুটবল ইতিহাসে। বিশ্বকাপের মঞ্চে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের হয়ে প্রথম গোল করলেন ইয়োয়ান উইসা। আর স্তব্দ করে দিলেন রোনালদো নামের কিংবদন্তীকে, পুরো পর্তুগালকে!
লাফিয়ে উঠে দুর্দান্ত হেডে পর্তুগালের জালে বলটা পৌঁছে দেওয়ার সৌন্দর্যটা হয়তো দেখেছে পুরো পৃৃথিবী, হয়তো দেখেনি ছয় মাসের অন্ধকার, অসংখ্য নির্ঘুম রাত, শত যন্ত্রণার স্মৃতিতে তলিয়েও হার না মানা এক মানুষের গল্প।
দাগে ভরা সেই মুখই গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য আর দীর্ঘ বঞ্চনার গল্প বয়ে বেড়ানো কঙ্গোর লাখো মানুষের মুখে হাসি ফোটালেন।
অনেকেই হয়তো এমন ভয়াবহ ঘটনার পর ভেঙে পড়তেন। অনেকেই হয়তো হারিয়ে ফেলতেন স্বপ্ন দেখার সাহস।অনেকেই হয়তো আর ফিরতে পারতেন না ফুটবলের সবুজ ঘাসে।
কিন্তু ইয়োয়ান উইসা ফিরেছেন।
দাগ নিয়ে ফিরেছেন।ভয় নিয়ে ফিরেছেন।স্মৃতি নিয়ে ফিরেছেন।
আর ফিরেছেন এমন এক গল্প হয়ে, যে গল্প সবাইকে মনে করিয়ে দেয়-কখনো হার মানতে নেই…
এভাবেও হয়তো ফিরে আসা যায়।
এভাবেও হয়তো ইতিহাস লেখা যায়।
পূর্বকোণ/আদর

















