এ যেন ঘাসের শেকড় থেকে আকাশ নামক শিখর ছোঁয়ার এক উপাখ্যান। স্বপ্ন, সংগ্রাম আর অদম্য বিশ্বাসের জোড়াতালি। ঘানার ছোট্ট শহর বেচেমের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া এক সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা ছেলের গল্প। যে ছেলেটি দারিদ্র্য দেখেছে, অভাব দেখেছে, বাবার কপালের ঘাম দেখেছে। আর দেখেছে অবিরত স্বপ্ন!
কাঠমিস্ত্রি বাবার সেই সন্তান ক্যালেব ইয়েরেনকি আজ বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের নামটা কিনা খুদাই করে ফেললেন সোনার হরফে।
ঘানা-পানামা ম্যাচের একেবারে অন্তিম মুহূর্ত। কয়েক মিনিট পরই বেজে উঠবে শেষ বাঁশি। সবাই প্রায় ধরে নিয়েছে ম্যাচটি ড্র হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম পয়েন্ট পাওয়ার আনন্দে প্রস্তুত হচ্ছিল পানামাও। ঠিক তখনই যেন ক্যালেব নিজের পায়ে লিখলেন নতুন এক অধ্যায়।
বাঁ দিক দিয়ে আলগা বল পেয়ে এগিয়ে যান ব্র্যান্ডন থমাস আসান্তে। এরপর গোলমুখে বাড়ানো বলটিতে পা ছোঁয়ান ক্যালেব। মুহূর্তের মধ্যেই কেঁপে ওঠে জাল। থমকে যায় সময়। আর ২০ বছর বয়সী ঝাঁকড়া চুলের সেই তরুণ ডুবে যান সতীর্থদের উল্লাসে। তাঁর পায়ের স্পর্শে ঘানা খুঁজে পায় জয়, আর বিশ্বকাপ খুঁজে পায় নতুন এক নায়ক।
কিন্তু এই গোলের গল্প শুরু হয়নি বিশ্বকাপের মাঠে। এর শুরু বহু বছর আগে, বেচেমের এক ছোট্ট বাড়িতে। একজন কাঠমিস্ত্রি বাবার ঘরে জন্ম নেওয়া ক্যালেব ধীরে ধীরে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন অসাধারণ এক ফুটবল প্রতিভা হিসেবে। একাডেমির ধুলোমাখা মাঠে শাণিত করেছেন নিজের স্বপ্ন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর প্রতিভা নজরে আসে স্কাউটদের। মাত্র ১১ বছর বয়সে সুযোগ পান ঘানার বিখ্যাত রাইট টু ড্রিম একাডেমিতে-যেখান থেকে উঠে এসেছেন মোহামেদ কুদুসের মতো তারকারা।
রাইট টু ড্রিম শুধু একটি একাডেমি ছিল না, ছিল ক্যালেবের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক দরজা। এখানেই তিনি পেয়েছেন বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ, শিক্ষা এবং নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার সাহস।
১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পর তাঁর সামনে খুলে যায় ইউরোপের দরজা। যোগ দেন ডেনমার্কের ক্লাব এফসি নর্ডসেল্যান্ডে। প্রথমে যুব দলে, পরে মূল দলে। ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি। আর সেই পথ ধরেই একদিন পৌঁছে যান দেশের জার্সি গায়ে জড়ানোর স্বপ্নের দোরগোড়ায়।
এই পুরো যাত্রায় তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তাঁর বাবা। কাঠ কেটে, ঘাম ঝরিয়ে, সংসারের বোঝা কাঁধে নিয়ে যিনি পরিবারকে আগলে রেখেছেন; সেই মানুষটিই ছেলের স্বপ্নকে কখনো মরতে দেননি।
ঘানা-পানামা ম্যাচের আগে গর্ব আর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে নিজের কাঠের দোকানের দেয়ালে ছেলের কয়েকটি ছবি টাঙিয়ে রেখেছিলেন তিনি। হয়তো মনে মনে বিশ্বাস করেছিলেন-আজ ছেলে দেশকে হাসাবে।
হয়েছেও তাই।
ক্যালেব শুধু তার চিরকালীন স্বপ্নযাত্রার সঙ্গী বাবার মুখে হাসি ফোটাননি, অর্থনৈতিক সংকট, মূল্যস্ফীতি আর দারিদ্র্যের চাপে ক্লান্ত হয়ে পড়া ঘানার মানুষদের মুখেও ফুটিয়েছে এক চিলতে হাসি।
বিশ্বকাপ এজন্যই আমার সবসময়ের প্রিয়।
কারণ, এই বিশ্বকাপই পারে কাঠমিস্ত্রির ঘর থেকেও বিশ্বকাপের নায়ক জন্ম দিতে।
গল্পটা তাই শুধু আফ্রিকার এক ছোট্ট শহরের সন্তানের অসম্ভবকে সম্ভব করে ফেলার কাহিনি নয়। গল্পটা অনুপ্রেরণারও। যে গল্প সবাইকে শেখায়-জীবনে স্বপ্ন দেখা থামানো যাবে না…
পুর্বকোণ/আদর

















