চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

আকাশি-নীল জার্সির সেই মেয়েটি...

মেসিদের জয়ের দিনে আয়াত হত্যার রায়

আকাশি-নীল জার্সির সেই মেয়েটি…

তাসনীম হাসান

১৮ জুন, ২০২৬ | ১১:২৯ পূর্বাহ্ণ

বয়স মাত্র পাঁচ ছুঁই ছুঁই। ফুটবল ঠিক কী, তা বোঝার বয়স তখনও হয়নি। তবু ছোট্ট আলিনা ইসলাম আয়াত চিনত একজনকে-লিওনেল মেসি। বাবার কাছে তাই তার আবদার ছিল, একটা আকাশি-নীল আর্জেন্টিনার জার্সি কিনে দিতে হবে।

 

২০২২ বিশ্বকাপ শুরুর দুই মাস আগেই বাবা সোহেল রানা মেয়ের সেই ইচ্ছে পূরণ করেছিলেন। আকাশি-নীল জার্সিটা গায়ে জড়িয়ে, ঠোঁটের কোণে একচিলতে নিষ্পাপ হাসি নিয়ে ছবিও তুলেছিল ছোট্ট আয়াত। যেন পৃথিবীর সব আনন্দ এসে জমেছিল তার ছোট্ট চোখ দুটোয়। কিন্তু সেই মেসি-পাগল মেয়েটাই দেখে যেতে পারেনি আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়।

 

১৮ ডিসেম্বরের ওই বর্ণিল রাতে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের উল্লাসে কেঁপে উঠছিল শহর, রাজপথ, অলিগলি। কেউ আনন্দে কাঁদছিল, কেউ পতাকা হাতে ছুটছিল রাস্তায়। অথচ ঠিক সেই সময়, ছোট্ট আয়াতের দেহের কিছু অংশ শুয়ে ছিল মাটির নিচে। আর কিছু অংশের খোঁজই মেলেনি কখনও, আজও। নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুটির মরদেহ টুকরো টুকরো করে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল সমুদ্র আর নালার পানির স্রোতে।

 

বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র পাঁচদিন আগে, ১৫ নভেম্বর, চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসা থেকে মক্তবে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল আয়াত। দাদার হাত ধরে বের হওয়া সেই ছোট্ট মেয়েটি আর ফিরে আসেনি।

এরপর এক সপ্তাহজুড়ে যখন পুরো দেশ বিশ্বকাপ উন্মাদনায় ডুবে ছিল, তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল নিখোঁজ আয়াতের ছবি। বহু খোঁজাখুঁজির পর গ্রেপ্তার হয় ঘাতক মো. আবির। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। হত্যার পর তার দেহ ছয় টুকরো করে ফেলে দেওয়া হয়েছিল সাগর ও নালায়। পরে মাথা ও দুই খণ্ডিত পায়ের সন্ধান মিললেও, বাকি অংশ আর কখনও উদ্ধার করা যায়নি। মুক্তিপণ আদায়ের জন্য আয়াতকে অপহরণ করে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল আবির।

 

আয়াতের বাবা সোহেল রানা ছিলেন আর্জেন্টিনার অন্ধ সমর্থক। কোপা আমেরিকায় আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের আনন্দ দেখে ছোট্ট মেয়েটিও ঝুঁকে পড়েছিল মেসিদের দিকে। বাবার ভালোবাসার দলই হয়ে উঠেছিল তারও প্রিয় দল। কিন্তু সেই আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলেও কোনো আনন্দ নামেনি সোহেল রানার ঘরে। সন্তান হারানো বাবা তখন বলেছিলেন, ‘আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে আমার মেয়েই সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। এখন মেয়ে নেই। আমার আর কিছুই নেই।’

 

আয়াত হারিয়ে যাওয়ার চার বছর পেরিয়ে গেছে। আবারও ফিরে এসেছে বিশ্বকাপ। আবারও আর্জেন্টিনার জয়। প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে আলজেরিয়াকে উড়িয়ে দিয়েছেন লিওনেল মেসি। আবারও আকাশি-নীল উল্লাসে মেতে উঠেছে অসংখ্য মানুষ।

 

আর ঠিক এমন দিনেই এলো আরেকটি ‘সুসংবাদ’।

যে শিশুটি আর্জেন্টিনার বিশ্বজয় দেখে যেতে পারেনি, যে শিশুটির আকাশি-নীল জার্সি হয়ে উঠেছিল এক অসমাপ্ত স্বপ্নের প্রতীক, সেই আয়াত হত্যার মামলায় ঘাতকের মৃত্যুদণ্ডের রায় দিয়েছেন আদালত।

 

কী এক আশ্চর্য সমাপতন! চার বছর আগে আর্জেন্টিনার বিশ্বজয়ের আগে এক বাবা হারিয়েছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের ধনকে। চার বছর পর আর্জেন্টিনার আরেকটি জয়ের দিনে তিনি পেলেন বিচারের বড় এক আশ্বাস।

 

গতকাল আয়াতকে স্মরণ করে আর্জেন্টিনার জার্সি পরেই আদালতপাড়ায় রায় শুনতে গিয়েছিল তার বন্ধুরা, খালাতো-চাচাতো ভাই-বোনেরা।

 

অশ্রুজমা কণ্ঠে পূর্বকোণকে সোহেল রানা বলেন, ‘আমার মেয়ে ছিল মেসির বড় ভক্ত। সেই আর্জেন্টিনার জয়ের দিনই আমার মেয়ে হত্যার রায় হলো। অবশ্যই আমি খুশি। তবে আজ আমার মেয়ে বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো। আর্জেন্টিনার জয় উদযাপন করতো। সেটি তো আর কোনোদিন হবে না। আমার মেয়েকে স্মরণ করে তারই সমবয়সী আমার ভাতিজা-ভাতিজিসহ ১০-১২ জন আর্জেন্টিনার জার্সি পরেই আদালতে গিয়েছিল। তাদের মাঝেই আমার মেয়েকে খুঁজলাম। ওরা বড় হয়ে গেলো, নয় বছরে পড়ছে। কিন্তু আমার মেয়েটার বয়স তো পাঁচেই আটকে গিয়েছে।’

 

ভাতিজা-ভাতিজিদের গায়ে আর্জেন্টিনার জার্সি দেখে আবারও সোহেল রানার যেন মনে পড়ে যায় মেয়ের সেই নিষ্পাপ আবদার, সেই হাসিমাখা মুখ, সেই অসমাপ্ত আনন্দ।

এই বেদনাহত বাবা বললেন, ‘আমি প্রতিমুহূর্তে অপেক্ষা করছি আমার আকাশি-নীল জার্সি পরা ছোট্ট মেয়েটার জন্য।’

বাবার সেই অপেক্ষা ফুরাবে না কোনোদিন…

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট