চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

সর্বশেষ:

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘটনায় জরুরি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

হাসপাতাল বন্ধের আগে রোগীর জীবন:

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল ঘটনায় জরুরি শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

১৮ জুন, ২০২৬ | ১২:১৬ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা গত কয়েক দশকে দ্রুত বেড়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব হেলথ সার্ভিসেসের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৫,৩০০-এর বেশি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় রেজিস্ট্রিতে ৩৯,৪০০-এর বেশি সক্রিয় মেডিকেল ও স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ৫,৩২১টি, নিবন্ধিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার ৯,৫২৯টি, এবং আনুমানিক প্রায় ১১,৯৪০টি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধন বা লাইসেন্সের বাইরে থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।

 

এই পরিসংখ্যান নিজেই একটি বড় সতর্কসংকেত। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে-এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে: এত বিপুলসংখ্যক হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মান নিয়ন্ত্রণ করছে কে? রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে কীভাবে? লাইসেন্স নবায়ন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিতভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি? কোনো রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি?

 

বর্তমান বাস্তবতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের বহু বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স নবায়ন ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ১৯,৬২৭টি নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের মধ্যে চলতি অর্থবছরের ৫.০০ শতাংশ, লাইসেন্স নবায়ন করেছে। আগের অর্থবছরেও এ সংখ্যা ছিল অনেক কম। একইভাবে ৩৫,৫৯৭টি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে মাত্র ১,৭৯০টি, অর্থাৎ প্রায় ৫ শতাংশ, লাইসেন্স নবায়ন করেছে। আগের অর্থবছরে এ সংখ্যা ছিল ৫,৭৩৫।

 

লাইসেন্স নবায়ন কোনো কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রোগীর নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একটি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্স নবায়নের মাধ্যমে প্রমাণ করে যে সেখানে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, নিরাপদ অবকাঠামো, কার্যকর যন্ত্রপাতি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্যব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত অনুমোদন এবং আইনি শর্ত পূরণ আছে। লাইসেন্স নবায়ন না হলে রোগী ও সাধারণ মানুষ জানতেই পারেন না, যে প্রতিষ্ঠানে তারা চিকিৎসা নিচ্ছেন সেটি বাস্তবে কতটা নিরাপদ বা মানসম্মত।

 

এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জনবল, পরিদর্শন ক্ষমতা, পরিবহন, লজিস্টিক এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সেই তুলনায় বাড়েনি। দ্বিতীয়ত, অনেক প্রতিষ্ঠান অসম্পূর্ণ কাগজপত্র জমা দিয়ে বছরের পর বছর কার্যক্রম চালিয়ে যায়। তৃতীয়ত, পরিবেশ ছাড়পত্র, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ছাড়পত্র, ট্রেড লাইসেন্স ও কর সনদের মতো নথি সংগ্রহে দীর্ঘ সময় লাগে। চতুর্থত, নিয়মিত ও শক্তিশালী তদারকি না থাকায় অনেক মালিকপক্ষ লাইসেন্স নবায়নকে গুরুত্বহীন মনে করে।

 

তবে এসব জটিলতা কোনোভাবেই লাইসেন্স ছাড়া হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার চালানোর অজুহাত হতে পারে না। রোগীরা যখন অর্থ দিয়ে চিকিৎসা নেন, তখন তারা নিরাপদ, বৈধ ও মানসম্মত সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। ভুল রোগনির্ণয়, অদক্ষ জনবল, অনিরাপদ অপারেশন থিয়েটার, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের অভাব বা জরুরি সেবার অপ্রস্তুতি মানুষের জীবনহানি ঘটাতে পারে।

 

এই বাস্তবতায় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছ লাইসেন্স ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, ঢাকা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা দেখিয়ে দিল-নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োগ যদি রোগীর জীবন ও চিকিৎসার ধারাবাহিকতাকে উপেক্ষা করে করা হয়, তাহলে সেটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন নয়; বরং অমানবিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা।

 

একজন ডাক্তার হিসেবে অত্যন্ত দুঃখ ও হতাশার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য হয়েছে। কোনো হাসপাতালের প্রশাসনিক, আইনি, লাইসেন্স বা নীতিগত সমস্যা থাকলে অবশ্যই তদন্ত হবে, ব্যবস্থা হবে, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এই হাসপাতালে গত মাসে ৬ জন নবজাতকের মৃত্যুর আইনী তদন্ত অবশ্যই দরকার। এই ধরনের মৃত্যু কোন ভাবেই কাম্য নয় এবং এই মৃত্যুর কারণ জানা এবং এর বিচার নবজাতকদের পরিবারের অধিকার এর অংশ। এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না করে হঠাৎ করে হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া সঠিক নয়।

 

হাসপাতালে ভর্তি রোগী, গুরুতর অসুস্থ রোগী এবং প্রায় ১০০ জনের বেশি ডায়ালাইসিস রোগীর বিকল্প চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে একটি হাসপাতাল বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই মানবিক সিদ্ধান্ত হতে পারে না।

 

একটি হাসপাতাল কোনো সাধারণ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নয় যে, প্রশাসনিক নির্দেশে তালা দিলেই কাজ শেষ। হাসপাতালের ভেতরে থাকে মানুষের জীবন, রোগীর কষ্ট, পরিবারের উৎকণ্ঠা, চিকিৎসার ধারাবাহিকতা এবং অনেক ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার শেষ ভরসা। সেখানে থাকতে পারেন অপারেশনের পরের রোগী, প্রসূতি মা, নবজাতক, বৃদ্ধ রোগী, জরুরি রোগী, ক্যানসার রোগী, আইসিইউ রোগী এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার ওপর নির্ভরশীল মানুষ। তাই কোনো হাসপাতাল বন্ধ করার আগে প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রতিটি ভর্তি রোগীর নিরাপদ স্থানান্তর নিশ্চিত করা।

 

কোন রোগী কোথায় যাবে, কোন হাসপাতাল তাকে ভর্তি নেবে, কে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাবে, ডায়ালাইসিস রোগীর পরবর্তী সেশন কোথায় হবে, জরুরি রোগীদের কী হবে-এসব বিষয়ে স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া হাসপাতাল বন্ধ করা গুরুতর প্রশাসনিক ব্যর্থতা। চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ অসুবিধা নয়; এটি অনেক রোগীর জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একজন রোগীর চিকিৎসার ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে তার শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি হতে পারে, পরিবার অসহায় হয়ে পড়ে এবং পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হয়।

 

বিশেষ করে ডায়ালাইসিস রোগীদের বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কিডনি বিকল রোগীরা নির্দিষ্ট সময়ে ডায়ালাইসিস না পেলে শরীরে পানি জমতে পারে, শ্বাসকষ্ট হতে পারে, পটাশিয়াম বেড়ে হৃদ্যন্ত্রের মারাত্মক অনিয়ম তৈরি হতে পারে, ফুসফুসে পানি জমতে পারে এবং মৃত্যুঝুঁকিও দেখা দিতে পারে। এমন রোগীদের একদিনের চিকিৎসা ব্যাহত হওয়াও মারাত্মক হতে পারে। তাই প্রায় ১০০ জনের বেশি ডায়ালাইসিস রোগীর বিকল্প ব্যবস্থা না করে হাসপাতাল বন্ধ করা শুধু অবিবেচনাপ্রসূত নয়, এটি রোগীর জীবনের প্রতি চরম অবহেলার শামিল।

 

একজন সাধারণ মানুষও খুব সহজে বুঝতে পারেন-রোগীকে আগে নিরাপদ চিকিৎসার আওতায় নিতে হবে, তারপর হাসপাতাল বন্ধ করা যাবে। সেই সাধারণ মানবিক বোধ যদি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনুপস্থিত থাকে, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা উচিত মানুষের জীবন, রোগীর কষ্ট এবং পরিবারের অসহায় অবস্থা। আইন প্রয়োগের আগে রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

 

আমরা কোনোভাবেই হাসপাতালের অনিয়মের পক্ষে নই। কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নবায়ন না করলে, প্রয়োজনীয় মানদণ্ড না মানলে, রোগীর নিরাপত্তা অবহেলা করলে বা প্রশাসনিক অনিয়ম করলে অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, জরিমানা হতে পারে, নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ করা যেতে পারে, ইলেকটিভ সার্ভিস স্থগিত করা যেতে পারে, এমনকি প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠান বন্ধও করা যেতে পারে। কিন্তু এই পুরো প্রক্রিয়ায় রোগীদের শাস্তি দেওয়া যাবে না। অসুস্থ মানুষকে বিপদে ফেলে, ডায়ালাইসিস রোগীদের অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায় না।

 

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় সঠিক পদ্ধতি হতে পারত-প্রথমে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধ করা, জরুরি নয় এমন সেবা স্থগিত করা, হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত চালানো, ব্যবস্থাপনার ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাগজপত্র ও লাইসেন্স সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেওয়া এবং একই সঙ্গে ভর্তি রোগী ও ডায়ালাইসিস রোগীদের তালিকা তৈরি করা। এরপর প্রতিটি রোগীর জন্য বিকল্প হাসপাতাল, বেড, অ্যাম্বুলেন্স এবং চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করে ধাপে ধাপে সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যেত।

 

এই ঘটনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি বড় শিক্ষা। দেশে এখন জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় হাসপাতাল-বন্ধকরণ নীতিমালা প্রয়োজন। কোনো হাসপাতাল বন্ধ করার আগে বাধ্যতামূলকভাবে রোগী-স্থানান্তর পরিকল্পনা থাকতে হবে। সেখানে ভর্তি রোগীর পূর্ণাঙ্গ তালিকা, ঝুঁকিপূর্ণ রোগী শনাক্তকরণ, ডায়ালাইসিস রোগীর বিকল্প স্লট, আইসিইউ ও জরুরি রোগীর স্থানান্তর, প্রসূতি ও শিশু রোগীর বিশেষ ব্যবস্থা, অ্যাম্বুলেন্স সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে লিখিত যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ক্লিনিক্যাল টিমের তত্ত্বাবধান থাকতে হবে।

 

একই সঙ্গে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স ব্যবস্থাকেও আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। দেশের সব বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে একটি একক ডিজিটাল রেজিস্ট্রির আওতায় আনতে হবে। সাধারণ মানুষ যেন অনলাইনে দেখতে পারে কোন প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে, কোনটির নবায়ন হয়েছে, কোনটি শর্তসাপেক্ষে চলছে এবং কোনটির কার্যক্রম স্থগিত। এতে রোগীর অধিকার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি-তিনটিই শক্তিশালী হবে।

 

লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, কিন্তু মানদণ্ড দুর্বল করা যাবে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শন জনবল বাড়াতে হবে, ঝুঁকিভিত্তিক পরিদর্শন চালু করতে হবে এবং আইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, ডায়ালাইসিস, প্রসবসেবা, নবজাতক সেবা, কেমোথেরাপি ও রক্ত সঞ্চালনের মতো উচ্চঝুঁকির সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অনিয়ম থাকলে ব্যবস্থা হবে, কিন্তু সেই ব্যবস্থা হতে হবে পরিকল্পিত ও রোগীবান্ধব।

 

তবে শুধু লাইসেন্স নবায়ন যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশে এখন একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও কার্যকর হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সময়ের দাবি। লাইসেন্সিং হলো ন্যূনতম আইনি অনুমোদন; কিন্তু অ্যাক্রেডিটেশন হলো সেবার মান, নিরাপত্তা, চিকিৎসা-প্রক্রিয়া, রোগীর অধিকার, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, ক্লিনিক্যাল গভর্ন্যান্স এবং ধারাবাহিক মানোন্নয়নের একটি উচ্চতর মূল্যায়ন ব্যবস্থা। একটি হাসপাতালের লাইসেন্স থাকলেই যে সেখানে সেবার মান ভালো, রোগী নিরাপদ, চিকিৎসা প্রটোকল মানা হচ্ছে, অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা আছে, অথবা মৃত্যুর ঘটনা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা হয়-তা নিশ্চিত হয় না।

 

বিশ্বের বহু দেশে হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে হাসপাতালকে শুধু কাগজপত্র দেখে অনুমোদন দেওয়া হয় না; বরং দেখা হয়-রোগী ভর্তি থেকে ছাড়পত্র পর্যন্ত চিকিৎসার ধারাবাহিকতা কেমন, ইনফেকশন কন্ট্রোল ব্যবস্থা কার্যকর কি না, অপারেশন থিয়েটারের নিরাপত্তা কেমন, ওষুধ ব্যবস্থাপনা সঠিক কি না, জরুরি সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা আছে কি না, আইসিইউ ও ডায়ালাইসিস ইউনিটের মান কেমন, রোগীর অভিযোগের জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কি না, চিকিৎসা ভুল হলে তা বিশ্লেষণ করা হয় কি না, এবং মৃত্যুর ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি আছে কি না।

 

বাংলাদেশে একটি স্বতন্ত্র হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন কমিশন বা সংস্থা গঠন করা যেতে পারে, যা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিগত তত্ত্বাবধানে থাকলেও পেশাগতভাবে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। এই সংস্থায় চিকিৎসক, নার্সিং বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল প্রশাসক, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, ল্যাবরেটরি বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ, রোগী অধিকার প্রতিনিধি এবং আইন বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর কাজ হবে হাসপাতালের মান নির্ধারণ, নিয়মিত মূল্যায়ন, গ্রেডিং, রোগীর অভিযোগ তদন্ত, মানোন্নয়নের নির্দেশনা এবং প্রয়োজনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা।

 

অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থায় হাসপাতালগুলোকে ধাপে ধাপে শ্রেণিবিন্যাস করা যেতে পারে-যেমন পূর্ণ অ্যাক্রেডিটেড, শর্তসাপেক্ষ অ্যাক্রেডিটেড, উন্নয়ন পর্যায়ে, ঝুঁকিপূর্ণ, অথবা অননুমোদিত। এই তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকতে হবে। একজন রোগী যেন জানতে পারেন, যে হাসপাতালে তিনি যাচ্ছেন সেটি শুধু লাইসেন্সপ্রাপ্ত কি না, বরং মানদণ্ড অনুযায়ী কতটা নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য।

 

ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ক্ষেত্রেও অ্যাক্রেডিটেশন অত্যন্ত জরুরি। ভুল ল্যাব রিপোর্ট, নিম্নমানের ইমেজিং, অদক্ষ টেকনিশিয়ান বা মানহীন যন্ত্রপাতি ভুল চিকিৎসার দিকে নিয়ে যেতে পারে। তাই ল্যাবরেটরি, রেডিওলজি, প্যাথলজি, ব্লাড ব্যাংক এবং ডায়ালাইসিস ইউনিটের জন্য আলাদা মানদণ্ড থাকা দরকার। শুধু সাইনবোর্ড, ভবন বা যন্ত্রপাতি থাকলেই প্রতিষ্ঠান মানসম্মত হয় না; সঠিক প্রশিক্ষণ, ক্যালিব্রেশন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং জবাবদিহি থাকতে হবে।

 

এই অ্যাক্রেডিটেশন ব্যবস্থা শাস্তিমূলক অভিযানের বিকল্প নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি মানোন্নয়নের ভিত্তি। হঠাৎ অভিযান চালিয়ে হাসপাতাল বন্ধ করা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং নিয়মিত মূল্যায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি, প্রকাশ্য গ্রেডিং, রোগীর অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি এবং মানোন্নয়নের সময়সীমা দিলে হাসপাতালগুলো উন্নতির সুযোগ পাবে, রোগীরা তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, এবং সরকারও ন্যায়সঙ্গতভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবে।

 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় আরেকটি বড় ঘাটতি হলো রোগীর অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর প্রক্রিয়ার অভাব। অনেক রোগী বা পরিবার চিকিৎসা অবহেলা, অতিরিক্ত বিল, ভুল রিপোর্ট, সংক্রমণ, দুর্ব্যবহার বা চিকিৎসা জটিলতা নিয়ে অভিযোগ করতে চান, কিন্তু কোথায় যাবেন তা জানেন না। একটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা অভিযোগ কমিশন বা হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থার অধীনে রোগী অভিযোগ সেল গঠন করা জরুরি। অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হতে হবে, চিকিৎসকদের অযথা হয়রানি করা যাবে না, আবার রোগীর ন্যায়বিচারও নিশ্চিত করতে হবে।

 

স্বাস্থ্যখাতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা অবশ্যই দরকার। লাইসেন্সবিহীন বা অনিয়মিত হাসপাতাল চলতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু সেই শৃঙ্খলা কখনোই রোগীর জীবন ও মানবিকতার বিনিময়ে হতে পারে না। হাসপাতালের মালিক, ব্যবস্থাপনা বা প্রশাসনের ভুলের শাস্তি নিরীহ রোগীর ওপর চাপানো যায় না। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বুঝতে হবে-স্বাস্থ্যসেবা কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়; এখানে লাভের আগে রোগীর নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।

 

আদ্-দ্বীন হাসপাতাল বন্ধের ঘটনায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো-রোগীদের আগে নিরাপদ করা হলো না কেন? ডায়ালাইসিস রোগীদের বিকল্প ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করা হলো না কেন? ভর্তি রোগীদের পরিবারকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হলো না কেন? অভিযোগ বা অনিয়ম থাকলে সেটির তদন্ত ও বিচার হলো না কেন, আর পুরো হাসপাতাল বন্ধ করে সাধারণ রোগীদের কেন ভোগান্তিতে ফেলা হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর স্বাস্থ্যপ্রশাসনের কাছ থেকেই আসা উচিত।

 

পরিশেষে বলতে হয়, স্বাস্থ্যসেবায় আইন, শৃঙ্খলা, লাইসেন্স, অ্যাক্রেডিটেশন ও জবাবদিহি অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো রোগীর জীবন। একটি হাসপাতাল লাইসেন্স হারাতে পারে, ব্যবস্থাপনা শাস্তি পেতে পারে, প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে; কিন্তু কোনো রোগী চিকিৎসা, ডায়ালাইসিস বা জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হতে পারে না।

 

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে নিরাপদ করতে হলে তিনটি কাজ একসঙ্গে করতে হবে: প্রথমত, সব বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের লাইসেন্স ব্যবস্থা ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে; দ্বিতীয়ত, কোনো হাসপাতাল বন্ধের আগে বাধ্যতামূলক রোগী-স্থানান্তর নীতিমালা করতে হবে; তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন হাসপাতাল অ্যাক্রেডিটেশন সংস্থা গঠন করে সেবার মান, রোগীর নিরাপত্তা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির স্থায়ী ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

 

হাসপাতাল বন্ধ করার আগে রোগীর জীবনকে নিরাপদ করা-এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব এবং স্বাস্থ্যপ্রশাসনের সর্বনিম্ন মানবিক মানদণ্ড। আইন দরকার, শৃঙ্খলা দরকার, লাইসেন্স দরকার, অ্যাক্রেডিটেশন দরকার-কিন্তু সবকিছুর আগে দরকার মানবিকতা।

 

ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, সেইন্ট জন রিজিওনাল হসপিটাল, নিউ ব্রুান্সউইক। এসিস্টেন্ট প্রফেসর, ডালহাউসী ইউনিভার্সিটি, কানাডা।

পূর্বকোণ/রাকিব

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট