চট্টগ্রাম রবিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৬

সর্বশেষ:

বন্যা প্রতিরোধ-জলকদরের প্রাণ ফেরাতে ১৩৬২ কোটির প্রকল্প

বন্যা প্রতিরোধ-জলকদরের প্রাণ ফেরাতে ১৩৬২ কোটির প্রকল্প

পানি উন্নয়ন বোর্ড

মুহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ও অনুপম কুমার অভি

৩০ আগস্ট, ২০২৬ | ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ

২০২২ সালের ডিসেম্বরে বাঁশখালীর জলকদর খালের দখলদার চিহ্নিত করা ও ভরাট-দখল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। উচ্চ আদালতের সেই নির্দেশ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। এর কুফল ভোগ করতে হচ্ছে বাঁশখালীবাসীকে। সাম্প্রতিক সময়ের বন্যায় বাঁশখালীতে ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এজন্য জলকদর খালকে দুষছেন এলাকাবাসী।

কালীপুর ইউনিয়নের কোকদণ্ডী গ্রামের আবুল কালাম বলেন, ‘সবকটি পাহাড়ি ছড়া, শাখা খাল ও জলকদর খাল দখল এবং ভরাট হয়ে গেছে। স্লুইসগেটগুলো নষ্ট-অকেজো হয়ে পড়েছে। পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এবারের বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছিল।’

সাম্প্রতিক বন্যায় বাঁশখালীতে ১১ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়। মারা যান চারজন। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ক্ষতি হয় ১১৬ কোটি টাকা। বাঁধের ক্ষতি হয় ১৭ কোটি টাকার। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় অনেক সড়ক।

গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বন্যাদুর্গত এলাকা বাঁশখালী সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি করেন বাঁশখালীবাসী। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেড়িবাঁধসহ বাঁশখালীর উন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

পাউবো সূত্র জানায়, ৫ জুলাই থেকে ১০ জুলাই তারিখে ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বাঁশখালীতে বন্যা-জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। তবে, এবার সুখবর দিচ্ছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। বন্যা প্রতিরোধে বড় প্রকল্প নিচ্ছে পাউবো। এরমধ্যে জলকদর খাল পুনর্খনন, স্লুইসগেট সংস্কার-নির্মাণ, তীর সংরক্ষণ-বাঁধ সংস্কারসহ বন্যা প্রতিরোধে ১৩৬২ কোটি ৫২ লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাঁশখালীতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান রয়েছে। ২০২২ সালে ৩০০ কোটি টাকার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প শেষ হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী (অতিরিক্ত দায়িত্ব) খ ম জুলফিকার তারেক গতকাল পূর্বকোণকে বলেন, ‘প্রকল্পটি পানি উন্নয়ন বোর্ডে জমা দেওয়া হয়েছে। আশা করছি, প্রকল্পটি দ্রুত পাস হবে। কারণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাঁশখালী বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শনকালে জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বেড়িবাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে বাঁশখালীতে ২০-৩০ বছরে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা হবে না। কারণে সবকটি স্লুইসগেট সংস্কার ও নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে। বড় সাইজের রেগুরেটর বসানো হবে। যাতে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে। এছাড়াও কৃষি কাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।’

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ দখল করে ৫-৬ হাজার দোকান ও ঘর-বাড়ি গড়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত চলছে দখলদারত্ব। শেখেরখীল ও চাম্বল এলাকায় খালের অর্ধেকাংশ ভরাট করে ফেলা হয়েছে। দক্ষিণের সাগর তীরবর্তী ছনুয়া খালের মোহনা, শেখেরখীলের ফাঁড়ির মুখ, সরকার হাট, কাথরিয়া ইউনিয়নের চুনতি বাজার, বাহারছড়ার মোশারফ আলী হাট, বশীর উল্লাহ বাজার, পুইছড়ি ইউনিয়নের সরল্যা বাজার, শীলকূপ মনকিচর, জালিয়াখালী পুরাতন বাজার, সরল ইউনিয়নের নুতন বাজার, চাম্বল ইউনিয়নের বাংলা বাজার, খানখানাবাদ ইউনিয়নের করিম বাজার, ঈশ্বর বাবুরহাট এলাকায় অবৈধভাবে কয়েক হাজার দোকান-ঘর-মার্কেট গড়ে উঠেছে। চাম্বার ও শেখেরখীল এলাকায় খালের অর্ধেকাংশ দখল করে মাছ উঠা-নামার জন্য ৪০-৪৫ টি জেটি নির্মাণ করা হয়েছে।

উজানের দিকে দেখা যায়, ঝোপঝাড় আর লতাগুল্মে খালের অস্তিত্ব পাওয়া দুষ্কর। ভরাট হয়ে গেছে। খাল ও বাঁধ দখল করে গড়ে ওঠেছে ঘরবাড়ি। বাহারছড়া ইউনিয়নের করিম বাজার এলাকায় খালের অস্তিত্ব নেই। প্রায় দেড়শ ফুট প্রশস্ত খালটি এখন পাঁচ-সাত ফুটে ঠেকেছে। দু’পাড় দখল করে গড়ে ওঠেছে ঘরবাড়ি, খামার ও নানা স্থাপনা।

বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম ইউনুস বলেন, ‘একসময় জলকদর খালে বড় নৌকা-লঞ্চ চলাচল করতো। চট্টগ্রাম ছাড়াও কক্সবাজারের কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া পর্যন্ত যাতায়াত করতো। ২০-২৫ বছর থেকে দখল খালটি মরাণাপন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, জলকদর খাল দখল শুরু হয় ১৯৮০ সালের দিকে। প্রতিনিয়ত দখল-ভরাট এবং নতুন নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এরফলে খালটি এখন ক্ষীণ-জীর্ণশীর্ণ ও মরণাপন্ন অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী অনুপম পাল বলেন, বন্যার আগে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা হয়েছে।

তবে খাল খননের নামে হরিলুট হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

খালের গতি-প্রকৃতি: পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, উত্তরে সাঙ্গু নদীর ঈশ্বরবাবুর হাট থেকে শুরু হয়ে খালটি এঁকেবেঁকে ৩২ কিলোমিটার দূরে গণ্ডামারার কাটখালীতে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় মিশেছে। তবে ছনুয়া ও শেখেরখীল এলাকার কাটখালী মোহনা থেকে ভিন্ন নাম ধারণ করে দুটি খাল সাগরে মিশেছে। রেজাউল করিম ডক সংলগ্ন সরল্যাবাজার থেকে ছনুয়া খাল নামে ১২ দশমিক ৫ কিলোমিটার বেয়ে ছোট ছনুয়া-পেকুয়া সীমান্তে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। অপর অংশটি গোবিন্দ বা হরিখাল নামধারণ করে বহদ্দারহাট এলাকায় পাহাড়ি ছড়ায় সংযুক্ত হয়েছে। প্রধান খালগুলোর সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে মিলিত হয়েছে অন্তত শতাধিক খাল-শাখাখাল। গুগলচিত্রেও তা পরিলক্ষিত হয়। তবে ছড়াগুলোর অস্তিত্ব অনেকটা হারিয়ে গেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা জানান, ২০২০-২১ সালে জলকদর খাল খননের জন্য সমীক্ষা করা হয়। সাঙ্গু মোহনা থেকে ১৬ কিলোমিটার অংশ অত্যন্ত করুণ হয়ে পড়েছে।

পাউবোর নথি বলছে, বাঁশখালীতে ৪টি পোল্ডারে ৩৬ দশমিক ৪৯ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, ১০৩ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ ও ২৫ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সাঙ্গু নদী তীর রয়েছে। বাঁশখালীতে ৭০টি স্লুইস গেট/ রেগুলেটর রয়েছে। যারমধ্যে ৪৬টি সচল, ১৩টি আংশিক সচল ও ১১টি অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

১৩৬২ কোটি টাকার প্রকল্পে যা রয়েছে: পাউবোর প্রকল্প প্রস্তাবনায় রয়েছে, ঈশ্বরবাবুর হাট থেকে সরল ব্রিজ পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার জলকদর খাল পুনর্খনন, ছনুয়া খাল, গোবিন্দখালসহ ৭০ দশমিক ৭০০ কিলোমিটার শাখা খাল খনন, ১১টি অকেজো স্লুইসগেট পুনর্নির্মাণ, ১৪টি স্লুইসগেট প্রতিস্থাপন। জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫টি ইনলেট-আউটলেট নির্মাণ করা। এছাড়াও পুকুরিয়া, সাধনপুর ও খানখানাবাদ ইউনিয়নে তিন দশমিক ৮০ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে গণ্ডামারা, বাহারছড়া ও ছনুয়া ইউনিয়নে ৫ দশমিক ৯৭৫ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধের ঢাল প্রতিরক্ষা করা হবে। বাহারছড়া, কাথারিয়া, সরল, চাম্বল ও গণ্ডামারা ইউনিয়নে ৭৬ দশমিক ৮৯ কিলোমিটার অভ্যন্তরীণ বাঁধ মেরামত করা হবে। যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৩শ ৬২ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট