চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল খুলে দেবে সম্ভাবনার দুয়ার

কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল খুলে দেবে সম্ভাবনার দুয়ার

মিজানুর রহমান

২০ মে, ২০২৬ | ১১:১৬ পূর্বাহ্ণ

সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা শঙ্খ পাড়ের উপজেলা চন্দনাইশ। প্রকৃতির এই অপার দানকে কাজে লাগিয়ে এখানকার লোকজন ফসল ফলান বছরজুড়ে। চন্দনাইশ হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের ‘সবজি ভাণ্ডার’। তবে শঙ্খ তীরে কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে কৃষকদের নীতি সহায়তা দিলে শুধু চট্টগ্রাম নয়- চন্দনাইশ হয়ে উঠবে দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উপজেলা।

 

‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-১৪, চন্দনাইশ-সাতকানিয়া আংশিক): চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় চন্দনাইশের নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এ প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পূর্বকোণ সেন্টারের ইউসুফ চৌধুরী হল রুমে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালনা করেন পূর্বকোণের চন্দনাইশ সংবাদদাতা মো. দেলোয়ার হোসেন।

 

চিটাগাং চেম্বার অফ কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সচিব অভীক ওসমান বলেন, কৃষি আমাদের সবচেয়ে বড় বেসরকারি খাত এবং একে ঘিরেই আমাদের সমৃদ্ধি সম্ভব। আমার প্রস্তাব হল-হাশিমপুর থেকে দোহাজারী পর্যন্ত এলাকায় একটি কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হোক। কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করতে প্রতি দুই ইউনিয়নে একটি করে কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন, পণ্য পরিবহনে নদীপথের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

 

তিনি বলেন, ব্যক্তিগত খাতের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে শুল্ক ছাড় এবং লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া কাঞ্চননগর রেলওয়ে ওয়ার্কশপ পুনরুজ্জীবিত করে চট্টগ্রামের সঙ্গে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য দোহাজারী রেললাইনকে আধুনিকায়ন করা দরকার। সর্বোপরি, আমাদের এলাকার প্রকৃত উন্নয়নের জন্য রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন অপরিহার্য। জনপ্রতিনিধিদের হতে হবে প্রশিক্ষিত এবং জনমুখী।

 

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে জানিয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের যুগ্ম আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা জাফর আলী হিরু বলেন, পাহাড়ি খালগুলোতে রাবার ড্যাম নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা সেবার মানোন্নয়ন করতে হবে। রোগীরা শুধু প্যারাসিটামল নয়-যেন প্রকৃত সেবা পায়। চিকিৎসকরা এলাকায় যেন নিয়মিত অবস্থান করেন।

 

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা আরও বলেন, আবাদি জমি রক্ষায় রাতের অন্ধকারে পাহাড়ের টপ সয়েল কাটা বন্ধ করতে হবে। সরকারের কৃষি প্রণোদনা যেন রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রকৃত কৃষকদের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া সাতকানিয়ার সঙ্গে সংযোগের জন্য লালুটিয়া সড়কে ব্রিজ নির্মাণ করা হলে সবজি বাজারজাতকরণ আরও সহজ হবে।

 

ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রহিম বলেন, কর্ণফুলীর দক্ষিণ পাড় থেকে টেকনাফ পর্যন্ত কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় না থাকা বড় বৈষম্য। আমি চন্দনাইশে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বা জাতীয় অধ্যাপক নুরুল ইসলামের নামে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানাই। আমাদের গর্ব কাঞ্চন পেয়ারার জিআই সনদ অর্জনে আমাদের সবাইকে সচেষ্ট হওয়ার আহ্বান জানাই।

 

তিনি বলেন, কর্ণফুলী টানেলের সুফল পেতে আনোয়ারা থেকে গাছবাড়িয়া পর্যন্ত সংযোগ সড়কটি দ্রæত চারলেনে উন্নীত করতে হবে। পর্যটন স্পট হিসেবে ধোপাছড়ির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও সন্ত্রাসীদের উপদ্রব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সমাধানে প্রশাসনিক তৎপরতা জরুরি। সরকারের স্টার্টআপ ফান্ড থেকে স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

 

চন্দনাইশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত দাবি করে চন্দনাইশ সোসাইটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী আরিফ মাহমুদ বলেন, আমাদের কৃষকরা সারা বছর উৎপাদনশীল থাকে। তাদের জন্য চীনে অনুসৃত পদ্ধতির মতো ‘৩৬৫ দিনের কৃষি পরিকল্পনা’ বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের প্রবাসী ভাইয়েরা দক্ষতা ছাড়া বিদেশে গিয়ে কম মজুরি পাচ্ছেন। তাদের জন্য একটি ‘বি-টেক সিটি’ (কারিগরি শহর) গড়ে তোলা দরকার।

 

তিনি বলেন, নারীদের ক্ষমতায়নে তাদেরকে ফ্রিল্যান্সিং ও দর্জি শিল্পের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। যেন তারা ঘরে বসেই আয়ের সুযোগ পায়। চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন এবং ‘কিশোর গ্যাং’ বা মাদকের মতো সামাজিক সমস্যা দূর করতে আমরা একটি ‘প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবে কাজ করতে চাই। আমাদের মানবসম্পদকে সঠিক কাজে লাগাতে পারলে চন্দনাইশের মাথাপিছু আয় অন্যান্য যেকোনো এলাকাকে ছাড়িয়ে যাবে।

 

চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন চৌধুরী বলেন, চন্দনাইশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। কৃষকদের বড় সমস্যা হল বাজারজাতকরণ ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। উপযুক্ত বাজার ব্যবস্থা না থাকায় কৃষক যে শিম ৫০ টাকায় বিক্রি করে, তা শহরে এসে ১৫০ টাকা হয়ে যায়। তাই দোহাজারী, কাঞ্চননগর ও গাছবাড়িয়া এলাকায় সুনির্দিষ্ট ‘কৃষি মার্কেট’ এবং পাহাড়ি ফলমূল সংরক্ষণে জুস ফ্যাক্টরির মতো কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলা প্রয়োজন। এছাড়া পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের বিকাশে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং পণ্য পরিবহনে উন্নত গ্রামীণ সড়ক অপরিহার্য।

 

তিনি বলেন, সুশাসন নিশ্চিত করা ছাড়া স্বনির্ভরতা অসম্ভব। পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাস্থ্যসেবায় বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানাই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর চাপ কমাতে ইউনিয়ন পর্যায়ে বন্ধ হয়ে থাকা কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো সচল করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ দোরগোড়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা পায়।

 

উপ-সহকারী কৃষি অফিসার রূপায়ন চৌধুরী বলেন, চন্দনাইশে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বারোমাসি ফসল উৎপাদনের বিপ্লব ঘটানোর চেষ্টা করছি। হাসিমপুর এলাকায় এখন অফ-সিজন তরমুজ, ড্রাগন ফল, সাম্মাম এবং বিটরুট চাষ হচ্ছে। যা আগে অকল্পনীয় ছিল। অনেক কৃষক এখন আপেল কুল চাষ করে মাত্র দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগে সাড়ে চার লাখ টাকা পর্যন্ত মুনাফা করছেন। দোহাজারী, হাসিমপুর ও বৈতলী এলাকার সবজি দিয়ে আমরা সারা দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে পারি।

 

তিনি বলেন, দোহাজারীর বিখ্যাত আলুর জাতটি আজ বিলুপ্তির পথে, কারণ আমাদের কোনো কোল্ড স্টোরেজ সুবিধা নেই। সরকারি প্রকল্পের পাশাপাশি আমি ব্যক্তিগত ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর জোর দিচ্ছি। ভোজ্যতেলের সংকট মেটাতে সরিষা চাষ বাড়ানো এবং আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা গেলে চন্দনাইশ প্রকৃত অর্থেই কৃষিতে স্বনির্ভর হবে।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট