চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) এক দিনের সর্বাত্মক একাডেমিক শাটডাউন শেষে আবারও ক্লাসে ফিরেছেন শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলেও উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশাসনিক জটিলতা কাটেনি। উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব গ্রহণে একের পর এক শিক্ষকের অপারগতা এবং সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবিতে চলমান আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসেনি।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়। পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও নিজ নিজ দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে অংশ নেন। তবে আন্দোলনের অংশ হিসেবে প্রশাসনিক ভবন এখনো তালাবদ্ধ রয়েছে।
এর আগে সোমবার (২ নভেম্বর) উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের জন্য অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেনকে রুটিন দায়িত্ব দেওয়ার প্রতিবাদে এক দিনের সর্বাত্মক একাডেমিক শাটডাউন পালন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা ও নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ ছিল।
চুয়েটে উপাচার্যের অনুপস্থিতিতে রুটিন দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব এবার প্রত্যাখ্যান করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু কাউছার। এর আগে একই দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানিয়েছিলেন তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেন।
মঙ্গলবার উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থানের কথা জানিয়ে অধ্যাপক কাউছারকে ই-মেইল পাঠান। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর অনুপস্থিতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আবু কাউছার উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে এ বিষয়ে আগে থেকে তাঁর সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন অধ্যাপক কাউছার। তিনি বলেন, ‘আমাকে জিজ্ঞাসা করে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। উনি (উপাচার্য) নিজে থেকে একটা ই-মেইল লিখলেই কী আমি এ দায়িত্ব পালন করব?’
উপাচার্যকে দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতার বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘ক্যাম্পাসে নিজেকে বিপন্ন করে আমি দায়িত্ব নিতে পারি না।’
এর আগে গত রবিবার (১ নভেম্বর) দুপুরে পাঠানো এক ই-মেইলে এক দিনের জন্য উপাচার্যের রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. কাজী দেলোয়ার হোসেনকে। ইউজিসির একটি সভায় অংশ নিতে ঢাকায় যাওয়ার কারণ দেখিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ওই সিদ্ধান্ত জানান। ১ নভেম্বর বিকেল থেকে দায়িত্ব কার্যকর হওয়ার কথা ছিল এবং ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় উপাচার্য কর্মস্থলে ফিরে দায়িত্ব বুঝে নেওয়া পর্যন্ত তা বহাল থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্ধারিত সময়ে কর্মস্থলে না ফিরে অধ্যাপক কাউছারকে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অচলাবস্থার পর গত ২৮ অক্টোবর থেকে সীমিত পরিসরে ক্লাসে ফিরেছিলেন শিক্ষার্থীরা। তবে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন তাঁরা। এর মধ্যে ২ নভেম্বরের শাটডাউন কর্মসূচির পর মঙ্গলবার থেকে পুনরায় নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী প্রতিনিধি মিনহাজ উদ্দিন জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ৩ নভেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ ক্লাসে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
অন্যদিকে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি আজিম উদ্দিন জানান, মঙ্গলবার থেকে ক্লাস শুরু হলেও ভবিষ্যতে নিয়মবহির্ভূত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আবারও কর্মসূচিতে যেতে পারেন।
ক্লাসে ফেরার বিষয়ে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী গোলাম মুর্শেদ রাতুল বলেন, ‘দাবি একটাই—ড. সায়েম স্যারকে পুনর্বহাল। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই দাবিতে আন্দোলন করছেন। এই দাবি আদায়ে আমরা সবপক্ষ এক কাতারে আছি।’
চুয়েট শিক্ষক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক সামিউন বাসির বলেন, ‘আমরা সাবেক উপাচার্যের পুনর্বহালের দাবিতে অটল আছি। আশা করি, সরকার দ্রুত সমাধান দেবে। তবে শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমরা ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছি।’
চুয়েট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিনও একই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা ক্লাসে যোগ দিয়েছেন। আমরাও আমাদের কার্যক্রমে যোগ দিয়েছি। কিন্তু আমাদের দাবি পূরণ হওয়ার আগ পর্যন্ত চুয়েটে অচলাবস্থা কাটবে না।’
দীর্ঘদিন শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের একাধিক পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিভাগের প্রায় ৪০টি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
শিক্ষার্থীরা ক্লাসে ফিরায় স্থগিত পরীক্ষাগুলোর সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করে দ্রুত পরীক্ষা আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
পূর্বকোণ/রানা/পারভেজ



















