টেকনাফ-উখিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় কৌশল পাল্টে রোহিঙ্গারা ভোটার হচ্ছে। স্থানীয় কতিপয় জনপ্রতিনিধি এবং অসাধু চক্রের সহায়তায় তারা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে রোহিঙ্গাদের মাঝে ভোটার হওয়ার তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। পাসপোর্টে পুলিশ ভেরিফিকেশন উঠে যাওয়ার পর থেকে অসাধু চক্র রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে নানাভাবে সহযোগিতা দিচ্ছেন। সহায়তাকারী চক্রটি রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সময় ভোটার হওয়ার যোগ্য রোহিঙ্গা ছেলে/মেয়েরা ভুয়া ঠিকানা দেখিয়ে অহরহ ভোটার হয়েছে। স্থানীয়দের বাপ-মা সাজিয়ে রোহিঙ্গারা ভোটার তালিকায় ঢুকে পড়েছেন। এবার বয়োবৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার তৎপরতা দেখা গেছে। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ টেকনাফ-উখিয়ার বাইরে গিয়েও ভুয়া পিতা-মাতা দেখিয়ে ভোটার হয়ে আইডি কার্ড সংগ্রহ করেছেন। পরে ওই আইডি ব্যবহার করে এখানকার অসাধু জনপ্রতিনিধিদের ম্যানেজ করে ছেলে-মেয়েদের ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত করেছেন। অসাধু ব্যক্তিরা বয়স কমিয়ে বৃদ্ধ রোহিঙ্গাদের ভোটার হতে সহযোগিতা দিচ্ছেন
এমন অভিযোগ রয়েছে। শাহপরীরদ্বীপ বাজারপাড়া এলাকার বয়োবৃদ্ধ আমান উল্লাহ। বয়স অন্তত ৮০ বছরের কাছাকাছি। তিনি এই বয়সে ভোটার হচ্ছেন। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সাবরাং ইউনিয়ন থেকে তিনি ওয়ারিশ সনদ বানিয়েছেন। ওই সনদে বৃদ্ধ আমান উল্লাহকে মৃত সোনা আলী ও মৃত ফরিদা খাতুনের সন্তান উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়ারিশ সনদে উল্লেখিত দুই স্ত্রী দুই পুত্র এক কন্যার মধ্যে কেবল বৃদ্ধ আমান উল্লাহ বেঁচে আছেন। বাকী সকলে মারা গেছেন। তার মানে আমান উল্লাহর ভাই-বোনদের কেউ বেঁচে নেই। তিনি কিন্তু ভোটার হতে চাচ্ছেন হ্নীলা ইউনিয়নের পশ্চিম লেদা গ্রামে থেকে। এ কারণেই ১৪ সেপ্টেম্বর হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে নাগরিকত্ব ও মৃত্যু সনদ, ভোটার তথ্য যাচাই-বাছাই প্রত্যয়ন, চাচা এবং ফুফুর এনআইডি নেই মর্মে কাগজ নিয়েছেন। ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে আমান উল্লাহর নামে জন্ম নিবন্ধন সনদ ইস্যু করা হয়। এদিকে সাবরাং ইউনিয়ন থেকে সংগৃহীত ওয়ারিশ সনদে তার কোন ভাই ও বোন জীবিত নেই বলে উল্লেখ করা হয়। এরপরও হ্নীলা ইউনিয়ন ওই আমান উল্লাহকে চাচা এবং ফুফুর এনআইডি নাই মর্মে প্রত্যয়নপত্র কেমনে প্রদান করলেন?
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ভোটার প্রত্যাশী বৃদ্ধ আমান উল্লাহ সত্যি সত্যি শাহপরীরদ্বীপের হলে তিনি ওই ইউনিয়ন থেকে নাগরিক ও জন্ম সনদ না নিয়ে হ্নীলা ইউনিয়ন থেকে কিভাবে এসব কিছু সংগ্রহ করলেন? যার নামে হ্নীলায় হোল্ডিং পর্যন্ত নেই। কোন যুক্তিতে ইউনিয়ন সংশ্লিষ্টরা তাকে বাংলাদেশি নাগরিক বানাতে সহায়তা করেছেন তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এদিকে বয়োবৃদ্ধ আমান উল্লাহ এবং তার মেয়ে নাহিদা সোলতানা নিহা লেদা পশ্চিম পাড়া এলাকায় ভোটার হতে নিবন্ধন ফরম পূরণ করে জমাও দিয়েছেন। তারা এখন ছবি তোলার অপেক্ষায় আছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। দেখা গেছে, বৃদ্ধ আমান উল্লাহর নিবন্ধন ফরম নম্বর এনআইডিএফএন- ১২১৮০২০৬৭ এবং মেয়ে নাহিদা সোলতানা নিহার নিবন্ধন ফরম নম্বর এনআইডিএফএন- ১২১৮০০৮৪৯।
অপর এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হ্নীলার বার্মাইয়া মৌলভী শমসুল আলম একজন প্রকৃত রোহিঙ্গা নাগরিক। তাকে সকলে বার্মাইয়া মৌলভী শমসু হিসেবে চিনে। তিনি ভোটার হয়েছেন কক্সবাজারের বাইরের এলাকা থেকে। প্রকৃত রোহিঙ্গা কিভাবে আইডি কার্ড পেল।
এদিকে বার্মাইয়া মৌলভী শামসুর ছেলে সাআদ ও মেয়ে ফাহিমা হ্নীলার পশ্চিম পানখালী থেকে নিবন্ধন করে ছবিও উঠিয়েছেন।
প্রশ্ন উঠছে বার্মাইয়া শমশুর ছেলে এবং মেয়ে কিভাবে ভোটার হলেন? কারা তাদের ভোটার হতে সহায়তা করেছেন? এভাবেই সাআদ, ফাহিমা, বৃদ্ধ আমান উল্লাহ, সমিরা ও নিহাদের মতো অসংখ্যা রোহিঙ্গা ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন।
এদিকে লেদা ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি হেলাল উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গা আমান উল্লাহ আইডি কার্ড করার জন্য তদবির চালাচ্ছেন। বাপের ভুয়া আইডি কার্ড দেখিয়ে মেয়ে সমিরা এবং ছেলে রিদুয়ান ভোটার হয়েছেন। সমিরা বৃদ্ধ বাবাকে ভোটার করতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন। রোহিঙ্গা কন্যা সমিরা আক্তার (এনআইডি নম্বর-৩৭৫৫৯১৭৬৯১) বোন জমিলা আক্তার (এনআইডি নম্বর-৬৯১৩২৭৭৯৯৯) এবং ভাই রিদুওয়ানের (ভোটার নম্বর-২২১৮৯৪০০০৪৪৬) আইডি কার্ড বাতিলের পাশাপাশি রোহিঙ্গা বাবা এবং বোনকে ভোটার তালিকায় অর্ন্তভুক্ত না করতে নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
স্থানীয় মেম্বার নুরুল হুদা বলেন, আমান উল্লাহ শাহপরীরদ্বীপের বাসিন্দা। তবে তাদের পূর্ব পুরুষ মিয়ানমারের নাগরিক তাও স্বীকার করেছেন।
উপজেলা নির্বাচন অফিসার মো. সালাহ উদ্দিন জানান, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই। কৌশলে কেউ হয়ে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে বাতিল করা হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এনআইডি কার্ড সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি এস এম অনীক চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের ভোটার হওয়ার সুযোগ নেই। এ ধরনের অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
পূর্বকোণ/মিফতা


















