চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬

সর্বশেষ:

চকরিয়ায় পাহাড় ও সংরক্ষিত বন  কেটে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ

হুমকির মুখে বন্য হাতি ও পরিবেশ, নিষেধাজ্ঞার পরও চলছে কাজ 

চকরিয়ায় পাহাড় ও সংরক্ষিত বন কেটে এলজিইডির সড়ক নির্মাণ

এম জাহেদ চৌধুরী চকরিয়া

৮ অক্টোবর, ২০২৬ | ১২:০১ অপরাহ্ণ

আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ না থাকলেও কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং এলাকায় পাহাড় ও টিলা কেটে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ পাকা সড়ক নির্মাণ করছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। প্রায় ২৫ কোটি ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নে এই কাজ বাস্তবায়িত হচ্ছে। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে বনের পরিবেশ ধ্বংস করে নির্মিত এই সড়কের কারণে জবরদখল বৃদ্ধি, বন্য হাতির চলাচল ব্যাঘাত এবং চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাস্তুসংস্থান চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সরেজমিনে চকরিয়ার উত্তর হারবাংয়ের উত্তর সাবানঘাটা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ফরেস্ট অফিসের পাশ থেকে পূর্ব দিকে চলে যাওয়া পুরোনো সরু পথটি কেটে চওড়া করা হচ্ছে। উত্তর পাশের একটি টিলা কেটে সড়কের সমান করা হচ্ছে, আধা কিলোমিটার এগোতেই উত্তর করমুহুরীপাড়ায় আবারও পাহাড় কাটার চিহ্ন চোখে পড়ে। সাবানঘাটা সেতুর পর প্রায় ৬০০ ফুট এলাকাজুড়ে ৫ থেকে ৯ ফুট উঁচু পাহাড় কেটে ১০ থেকে ১২ ফুট চওড়া পথ বানানো হয়েছে। এতে শতবর্ষী হারবাং বনের গর্জনগাছসহ অসংখ্য গাছপালা ও টিলা সাবাড় করা হয়েছে।
 
 
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সড়কটির মোট ৫ কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৪ কিলোমিটারই গেজেটভুক্ত সংরক্ষিত বনের অংশ। এই বনটি বন্য হাতির চলাচলের অন্যতম করিডোর এবং এর পাশে রয়েছে প্রায় ৫০ একরের ‘সুফল’ বনায়ন। কিন্তু এই মেগা প্রকল্প নেওয়ার আগে বন বিভাগের কাছ থেকে কোনো অনাপত্তিপত্র বা অনুমতি নেওয়া হয়নি।
 
 
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরু পথটি পাকা ও প্রশস্ত হলে বনের ভেতরে যান চলাচল ও মানুষের অবৈধ প্রবেশ সহজ হবে। ফলে কাঠ চুরি, বন্য প্রাণী শিকার এবং বনভূমি দখলের মহোৎসব শুরু হবে। তাছাড়া শব্দদূষণ ও যান চলাচলের কারণে হাতির স্বাভাবিক চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে তারা লোকালয়ে ঢুকে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
 
 
গত ১৭ সেপ্টেম্বর পাহাড় কাটার বিষয়টি বন বিভাগের নজরে আসার পর ২২ সেপ্টেম্বর এলজিইডিকে চিঠি দিয়ে চুনতি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. আবীর হাসান সংরক্ষিত বনের ভেতর কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। তবে বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা ও নোটিশের তোয়াক্কা না করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
 
 
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানা জানান, পাকা সড়ক হলে বনের ভেতর জবরদখল বাড়বে, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ঝুঁকিতে পড়বে এবং হাতির চলাচলেও বাধা তৈরি হবে। বনের ক্ষতি করে এই বেআইনি নির্মাণের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবে বন বিভাগ।
 
 
এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, আইন অনুযায়ী বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই এবং প্রতিটি সংস্থার এই আইন মেনে চলা উচিত। বনের মধ্যে সড়ক হলে নানাবিধ সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
 
 
শুধু হারবাং নয়, এলজিইডির প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ‘দক্ষিণ চট্টগ্রাম আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রকল্পের’ আওতায় আরও তিনটি সংরক্ষিত বনে বেআইনিভাবে সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে চকরিয়ার মধুশিয়া গর্জনবন (খুঁটাখালী-  মেধাকচ্ছপিয়া হাতি করিডোর), সাতকানিয়ার বৈতরণি সংরক্ষিত বন এবং মহেশখালীর শাপলাপুর সংরক্ষিত বন (যার ওপর সমপ্রতি হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে)।
 
 
সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের বিষয়ে প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম স্বীকার করেন যে- ২০২০ সালের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ভুল হয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, রিজার্ভ ফরেস্টের মধ্যে কাজ করা আমাদের ম্যান্ডেট নয়। হারবাংয়ের বিষয়ে বন বিভাগের নোটিশ পাওয়ার পর কাজ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে এবং সংরক্ষিত বনের অংশগুলোতে এলজিইডি কোনো কাজ করবে না।
 
 
অভিজ্ঞ মহল ও পরিবেশবাদীদের দাবি, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই বেআইনি সড়ক নির্মাণ কাজ স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে এবং পাহাড় ও বন ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
 
পূর্বকোণ/মিফতা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট