কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সংস্কারকাজ পরিদর্শনে গিয়ে প্রকৌশলী ফারহানা হকের মৃত্যু এক মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তার মৃত্যুর ঘটনায় কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই), ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যাচ-৮৮-এর প্রকৌশলীরা। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করে লিখিত প্রতিবেদন দেওয়ার দাবি জানিয়েছে ফারহানার পরিবার।
রবিবার (৪ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বনানীতে বুয়েট গ্র্যাজুয়েট ক্লাবে বুয়েট ব্যাচ-৮৮ স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের আয়োজনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ফারহানা হক আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে স্ট্রাকচার বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেন। গত ৬ আগস্ট তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠান এনরুট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) বাংলাদেশের কক্সবাজার অবকাঠামো ইউনিটে সিনিয়র ফিল্ড ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দেন তিনি।
চাকরির মাত্র ১৮ দিনের মাথায় গত ২৪ আগস্ট উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৩-এ আইওএমের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের সংস্কারকাজ পরিদর্শনের সময় দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়। পরে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। ফারহানা দুই বছরের এক ছেলে সন্তানের মা ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ফারহানার পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দুর্ঘটনার কারণ ও তদন্তের ফলাফল তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। এ বিষয়ে গত ৩ ও ১২ সেপ্টেম্বর আইওএমের কাছে ই-মেইল করে ঘটনা-প্রতিবেদন, সিসিটিভি ফুটেজ, নিরাপত্তাব্যবস্থার বিবরণ এবং বৈঠকের অনুরোধ জানানো হয়।
পরিবারকে দেওয়া আইওএমের ১৭ সেপ্টেম্বরের জবাবের বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলের কাজ স্থগিত করা হয়েছে এবং প্রাপ্য সিসিটিভি ফুটেজ ও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দুর্ঘটনার মুহূর্ত ধরা পড়েনি। অন্যদিকে এনরুট ইন্টারন্যাশনাল জানিয়েছে, তাদের পর্যালোচনা ও তদন্ত চলছে এবং এখনো কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি হয়নি।
বুয়েট-৮৮-এর রাসায়নিক ও পেশাগত নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দা সুলতানা রাজিয়া বলেন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা নয়; এটি কর্মীর মৌলিক অধিকার এবং নিয়োগকর্তার আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, পিপিই গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি নিরাপত্তার ‘শেষ রক্ষাকবচ’। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে প্রথমেই দেখা দরকার, চলমান জেনারেটরের ঘূর্ণায়মান অংশ যথাযথভাবে ঘেরা ছিল কি না এবং সংস্কারকাজের এলাকা নিরাপদভাবে আলাদা করা হয়েছিল কি না।
তার মতে, ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিরাপদ কর্মপদ্ধতি, প্রয়োজনীয় পিপিই, যথাযথ তদারকি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা ছিল কি না-তদন্তে এসব বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এ ছাড়া বাংলাদেশ শ্রম আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী দুর্ঘটনার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
ফারহানার বাবা প্রকৌশলী এ কে ফজলুল হক বলেন, ‘আমার মেয়ের প্রকৃত মৃত্যুর রহস্য আমি বাবা হিসেবে জানতে চাই। একটি কাজের সাইটে নিরাপত্তার সরঞ্জাম পর্যাপ্ত না থাকলে কেউ কাজে যায় না। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছিল কি না, সেটি জানতে চাই।’ বুয়েট-৮৮-এর সভাপতি মো. হাসিবুর রশিদের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে প্রকৌশলী ফাহীমা সাহাদাত বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চলাচল থাকলে সংস্কারকাজ ও চলমান যন্ত্রপাতির সঙ্গে তাঁদের নিরাপদ দূরত্ব এবং বেষ্টনী ছিল কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আইওএম বাংলাদেশ ও এনরুট ইন্টারন্যাশনালকে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে লিখিত প্রতিবেদন ফারহানার পরিবারকে দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও সংস্কারকাজে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
পূর্বকোণ/নুসরাত

















