সীতাকুণ্ডে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৩৫ হাজার কেজি ইউরিয়া সার ও তিনটি ট্রাকসহ দুই পাচারকারীকে আটক করে কোস্টগার্ড। গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত একটায় সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া এলাকায় সার জব্দের এ ঘটনা ঘটে। কিন্তু এ ঘটনার পর গতকাল মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা না হওয়ায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন আদালত। ঘটনাটিকে গুরুতর চোরাচালান অপরাধ হিসেবে গণ্য করে গতকাল মঙ্গলবার সীতাকুণ্ডে আমলী আদালত-০৭-এর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট-২ মো. সাখাওয়াত হোসেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ‘বিবিধ মামলা নম্বর-০১/২৬ (সীতাকুণ্ড)’ দায়ের করেছেন। একই সাথে পুরো ঘটনাটি সরেজমিনে তদন্ত করে আগামী ১৮ অক্টোবরের মধ্যে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের (পূর্ব জোন, চট্টগ্রাম) আইন কর্মকর্তা মাসুম রেজাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আমলী আদালত-৭ এর বেঞ্চ সহকারী মু. সেলিম উদ্দিন।
আদালত ছয়টি বিষয় সরেজমিন তদন্ত করার নির্দেশনা দিয়েছেন। তা হলো- প্রকাশিত সংবাদটির সত্যতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা। প্রকৃত ঘটনাস্থল নির্ধারণ করে তার সূচিপত্র ও একটি খসড়া মানচিত্র অঙ্কন করা। বিশেষ অভিযানে উপস্থিত কোস্টগার্ড সদস্যদের নাম-পরিচয় ও আইনি দায়িত্ব নির্ধারণ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারা অনুযায়ী তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করা। জব্দকৃত আলামতের কোনো জব্দতালিকা প্রস্তুত করা হয়ে থাকলে তা সংগ্রহ করা। আটককৃত দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৬-বি ধারা অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং সেই মোতাবেক ‘গ্রেপ্তারি স্মারক’ তৈরি করা হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত করা এবং ঘটনাটিতে স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্টের ২৫-বি ধারার অপরাধের উপাদানসমূহ সুনির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা।
আদালতের আদেশ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ‘মিয়ানমারে পাচারকালে তিন ট্রাক ইউরিয়া সারসহ আটক ২’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। উক্ত সংবাদে উল্লেখ করা হয়, গত ১০ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের বিসিজি স্টেশন ভাটিয়ারী সীতাকুণ্ড থানার বাঁশবাড়িয়া ঘাট এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে তিনটি ট্রাকও জব্দ করা হয়। এ সময় আনুমানিক ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ৭০০ বস্তা (৩৫ হাজার কেজি) ইউরিয়া সার এবং পাচারে ব্যবহৃত তিনটি ট্রাক জব্দ করে কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফট্যান্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন সে সময় গণমাধ্যমকে জানান, জব্দকৃত সার, ট্রাক ও আটক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
আদালত তাঁর আদেশে উল্লেখ করেন, চোরাচালানের এই ঘটনাটি ‘দি কোড অফ ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮’ (ফৌজদারি কার্যবিধি) এর ধারা ১৯০(১)(সি) অনুযায়ী আদালতের নজরে এসেছে। কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী উক্ত পণ্য সীমান্ত পার করে অবৈধভাবে মিয়ানমারে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া হচ্ছিল, যা ‘দি স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট-১৯৭৪’ (বিশেষ ক্ষমতা আইন) এর ধারা ২৫-বি অনুযায়ী একটি আমলযোগ্য এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচারযোগ্য অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। তা ছাড়া, ‘বাংলাদেশ কোস্টগার্ড আইন, ২০১৬’-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, বাহিনীর কোনো সদস্য কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা মালামাল জব্দ করলে তা দ্রুত নিকটবর্তী থানার হেফাজতে সোপর্দ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঘটনার পর বেশ কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও সীতাকুণ্ড থানায় এই বিষয়ে কোনো এজাহার বা নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়নি।
আদেশে আরও বলা হয় যে, গত ১৯ সেপ্টেম্বর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সম্মেলন কক্ষে পু্লিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়েছিল। উক্ত সভায় কোস্টগার্ডের আইন কর্মকর্তা মাসুম রেজাও উপস্থিত ছিলেন এবং মাদক ও চোরাচালান রোধে করণীয় ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এরপরেও এমন গুরুতর অপরাধের বিষয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে আদালত স্বাধিকার ক্ষমতাবলে এই বিবিধ মামলাটি চালু করেন।
আদেশের অনুলিপি আইন কর্মকর্তা মাসুম রেজা ছাড়াও সদয় অবগতির জন্য চট্টগ্রামের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কোস্টগার্ডের অধিনায়ক ও সীতাকুণ্ড থানার অফিসার ইনচার্জকে (ওসি) পাঠানো হয়েছে।
পূর্বকোণ/মিফতা

















