চট্টগ্রাম শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বছরজুড়ে জোয়ারের পানিতে বসবাস

বোয়ালখালী কধুরখীলের আরব টেন্ডাল সড়ক

বছরজুড়ে জোয়ারের পানিতে বসবাস

পূজন সেন

৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১:৫২ অপরাহ্ণ

মো. মোখতেয়ারের মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে এক মাস হলো। সেই উপলক্ষে ঘরে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন। তখন দুপুর দেড়টা। মেহমানরা খাল পাড় দিয়ে কাঁদাময় রাস্তা দিয়ে মোখতেয়ারের ঘরে পৌঁছান। চারপাশ স্যাঁতস্যাঁতে। খাবার খেয়ে ঘর থেকে বের হতে না হতেই হু হু করে ঢুকছিলো পানি। প্রায় ১৫০ মিটার সড়কটি নিমেষে পরিণত হয় খালে। বাড়ির উঠোনও ডুবে যায় এই পানিতে। এই পরিস্থিতিতে মোকতেয়ারের মেয়ে বড় হবে। ভাবতেই যেন গা শিউরে ওঠে থানার উপ-পরিদর্শক নিংওয়াই মারমার। তিনি বলেন এমন পরিস্থিতিতে মানুষ বাস করছে ভাবা যায় না।

 

স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুই দশক ধরে সড়কটি সংস্কার করেনি। ফলে এই অবস্থা। এভাবে দিন কাটাছে প্রায় ১৫০ পরিবারের। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে অন্য কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই তাদের। বাপ দাদার ভিটে আঁকড়ে এমন দুর্বিষহ কষ্টের মাঝে বেড়ে উঠছে একটি প্রজন্ম। জোয়ারের হাঁটুপানি মাড়িয়েই প্রতিদিন স্কুল, মাদ্রাসা ও কলেজে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের। অসুস্থ রোগী চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিতে হলে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। রোগীকে ধরাধরি করে কাঁধে বা কোলে করে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। বোয়ালখালী উপজেলার কধুরখীল ইউনিয়নের আরব টেন্ডাল সড়কের প্রায় ১৫০ মিটার অংশের এই দশায় শতাধিক পরিবার নিত্যদিন এমন দুর্ভোগে পোহাচ্ছেন। ৭০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা আছিয়া খাতুন বলেন, ‘একসময় এই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলত। এখন আমরা নিজেরাই ঠিকমতো হাঁটতে পারি না। কাদা পানিতে আছি সারা বছর।

 

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোখতার বলেন, ‘পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে হাসপাতালে নিতে খুব কষ্ট হয়। বয়স্ক লোক ও মহিলাদের চিকিৎসার জন্য নিতে হলে কোলে করে এই রাস্তা পার করতে হয়। জরুরি মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়তে হয়।’ স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি উন্নয়নের দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাঁদের দাবি, সড়কটি উঁচু করে টেকসইভাবে নির্মাণ করা হলে বর্ষা ও জোয়ারের পানিতে দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে।

 

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ২০ বছর ধরে সড়কটির স্থায়ী উন্নয়ন হয়নি। ফলে বর্ষা মৌসুমে গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কটি প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কধুরখীল ইউনিয়নের ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান পথ এটি। বেশ কয়েকবার স্থানীয়রা চাঁদা তুলে কয়েক লাখ টাকা ব্যয়ে ইট, সিমেন্ট বালু দিয়ে পা ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেন। যেখানে বড় গর্ত হয়েছে সেখানে বাঁশ আর সুপারি গাছ দিয়ে বানিয়েছেন সাঁকো। তবু কিছুতেই কিছু থাকলো না। বোয়ালখালী সিরাজুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী ইরফানুল হক বলেন, ‘প্রতিদিন কলেজে যেতে এই রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। কাদার কারণে হেঁটে চলাচল করাই কঠিন। একটু অসাবধান হলেই পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’

 

কধুরখীল ইউআই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী সানিকা আক্তার শিফা এবং কধুরখীল ইউনাইটেড হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আয়েশা জানায়, সড়কটির কারণে প্রতিদিন ভয় নিয়ে যাতায়াত করতে হয় তাদের। তাদের প্রশ্ন, ‘সারাদেশে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। তাহলে আমাদের রাস্তাটি এখনো কেন উন্নয়ন হচ্ছে না?’ স্থানীয় বাসিন্দা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আজগর বলেন, বিগত দুই দশক ধরে এই সড়কটি নিয়ে কেউ উদ্যোগ নিলো না। এটি দুঃখজনক। বর্তমানে সড়কটির উন্নয়নের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পদক্ষেপ নিতে হবে।

 

বোয়ালখালী উপজেলা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘রাস্তাটি এলজিইডির আওতাধীন। তবে বর্তমানে রাস্তাটির অ্যালাইনমেন্ট মাটি দিয়ে উন্নয়ন করা হয়নি। প্রথমে মাটি দিয়ে রাস্তাটি উন্নয়ন করে তিন থেকে চার ফুট উঁচু করতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় পেভমেন্ট তৈরি করা হলে পরবর্তী সময়ে পাকা অথবা ইউনিব্লক দিয়ে উন্নয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এলজিইডির আওতায় সরাসরি মাটির কাজ করা হয় না। এ ধরনের কাজ টিআর, কাবিখা অথবা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। রাস্তাটির এমব্যাংকমেন্টসহ ক্রেস্ট উইডথ ১৪ ফুট নির্ধারণ করে তিন থেকে চার ফুট উচ্চতায় প্রয়োজনীয় মাটির কাজ সম্পন্ন করা হলে পরবর্তীতে এলজিইডির মাধ্যমে রাস্তাটি পাকা করার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’

পূর্বকোণ/নুসরাত

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট