কক্সবাজারের পর দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতের অবস্থান বাঁশখালীতে। খানখানাবাদ, বাহারছড়া, ছনুয়া, গন্ডামারা ও সরল উপক‚ল মিলিয়ে ৩৭ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই সৈকত ঘিরে হতে পারতো চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় ‘ট্যুরিস্ট হাব’। তবে প্রচারণা ও অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে স্থানীয়রা ছাড়া তেমন কেউই এই সৈকতের নোনা জলে পা ভেজাতে আসেন না। শুধু সৈকত নয়- ঝর্ণা, চা-বাগান, ইকোপার্ক, পাহাড়, সমুদ্র, সমতলের এমন মিতালী দেশের আর কোনো উপজেলায় খুব একটা দেখা যায় না। সঠিক প্রচারণা আর অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে এই পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো যাবে। স্বনির্ভর হবে বাঁশখালী।
‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-১৬, বাঁশখালী): চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বাঁশখালীর নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এসব প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে বাঁশখালী মা ও শিশু জেনারেল হাসপাতালের হল রুমে এই
গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ বেতারের সঞ্চালক রণধীর দে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাঁশখালী উপক‚লীয় ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক বশির উদ্দিন কনক বলেন, বাঁশখালীতে একটি পূর্ণাঙ্গ পলিটেকনিক কলেজ প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। সমুদ্রের বিশাল সম্পদকে কাজে লাগাতে এখানে মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউট বা সমুদ্রবিদ্যা সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যেতে পারে। কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের জন্য একটি কৃষি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সাঙ্গু নদীর মোহনায় আধুনিক নদী বন্দর নির্মাণ করা গেলে তাতে শুধু বাঁশখালী নয়, পুরো দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপি সদস্য দেলোয়ার আজিম বলেন, বাঁশখালী অত্যন্ত উর্বর এলাকা। কালিপুরের লিচুর নাম সারাদেশে বিখ্যাত। এখন কুলের (বড়ই) ফলনও খুব ভালো হচ্ছে। আমরা যদি এই পণ্যগুলো সারাদেশে সরবরাহ করতে পারি, এটি বাঁশখালীর জন্য অনেক বড় একটি ব্যবসায়িক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। তবে এ জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো থাকাটাও জরুরি।
তিনি বলেন, আমাদের বাহারছড়া সমুদ্র সৈকত দেশের দ্বিতীয় প্রধান সমুদ্র সৈকত হওয়ার মতো বিশাল সম্ভাবনা রাখে। এছাড়া আমাদের চা-বাগান, ইকো-পার্ক এত সুন্দর যে, অন্য উপজেলায় পাহাড়, সমুদ্র আর সমতলের এমন মিতালী খুব একটা দেখা যায় না। আমি বিশ্বাস করি সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলে বাঁশখালী ব্যবসা ও পর্যটনে একটি মডেল উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
সড়কের বেহাল দশার কথা তুলে ধরে উপজেলা জামায়াত যুব বিভাগের সভাপতি খোরশেদ আলী চৌধুরী বলেন, পটিয়া-আনোয়ারা-বাঁশখালী সড়ক সংকীর্ণ হওয়ায় দিনরাত যানজট লেগে থাকে। এটি চারলেন করা প্রয়োজন। বাঁশখালীতে নির্দিষ্ট বাস বা ট্রাক টার্মিনাল নেই। একটি পরিকল্পিত টার্মিনাল করলে যানজট কমবে। এছাড়া গুনাগরি, জলদি ও চাম্বল পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশের ব্যবস্থা করা গেলে মানুষ যাতায়াতে সুফল পাবে।
তিনি বলেন, বাঁশখালীর বিপুল মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় বর্তমান অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১০০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা উচিত। বিশেষ করে গরিব মানুষের জন্য যদি সেখানেই সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করা যায়, তবে অনেক বেশি উপকার মিলবে। তরুণরা খেলাধুলায় আগ্রহী, কিন্তু তাদের জন্য মাঠ বা স্টেডিয়াম নেই। একটি মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা আমাদের খেলোয়াড়দের দীর্ঘদিনের দাবি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বাঁশখালীর সহ-সভাপতি আব্দুর রহিম সিরাজী বলেন, স্বাধীনতার পর থেকেই বাঁশখালী খনিজ সম্পদ, পাহাড়, নদী, উপক‚লীয় মাছের ঘের এবং লবণে সমৃদ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের নেতাদের এই সম্পদগুলোকে সমন্বিত করার মতো দূরদর্শী চিন্তাধারার অভাব ছিল। বাঁশখালীর একটি বিরাট অংশ উপক‚লীয় এলাকা। এখানকার মানুষের জান-মাল রক্ষায় একটি মজবুত ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করতে হবে।
বড় বাজার শপিং মলের (গুনাগরী শাখা) পরিচালক জহির উদ্দিন মজুমদার বলেন, বাঁশখালীর ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্প এখন হুমকির মুখে। কৃষকরা উচ্চ মজুরির শ্রমিক দিয়ে লবণ চাষ করলেও বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। দিনশেষে তারা খালি হাতে ঘরে ফিরছেন। শুধু লবণশিল্প নয়- অন্যান্য ব্যবসাতেও মন্দা চলছে। এর বড় কারণ রাস্তাঘাটের বেহাল দশা। আমাদের বাঁশখালীতে সব ধর্মের, সব রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান- সবাই মিলে যদি বাঁশখালীর উন্নয়নে কাজ করি ব্যবসা-বাণিজ্যে সুদিন ফিরবে।
বাঁশখালী ঘিরে ‘ব্লু ইকোনমি’র বড় সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে আইনজীবী হেলাল উদ্দীন বলেন, কোনো রাজনৈতিক নেতা সাগরকে কেন্দ্র করে এই বিশাল অর্থনীতির কথা চিন্তা করেননি বা কোথাও বলেননি। আমাদের উপকূলীয় এলাকা- বিশেষ করে ছনুয়া, সরল ও বাহারছড়া বেশ অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে এসব এলাকায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন অপরাধ প্রবণতা কমে আসে।
তিনি বলেন, বাঁশখালী আদালতে প্রায় ৩২ হাজার মামলা ঝুলে আছে। একজন ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে এত বিপুল মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা অসম্ভব। এখানে অন্তত চারটি কোর্ট (দুটি দেওয়ানি ও দুটি ফৌজদারি) স্থাপন করা জরুরি। শহর থেকে আসা বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য উন্নত আবাসন ও যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তারা যদি মানসিকভাবে শান্তিতে থাকেন, তবেই বাঁশখালীর মানুষ দ্রুত বিচার ও সঠিক সেবা পাবে।
উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ কায়ছার উদ্দিন বলেন, বাঁশখালীর পাহাড়ি এলাকায় যারা চাষাবাদ করেন, তাদের জন্য দুর্গম পথ বড় সমস্যা। কৃষকরা অনেক কষ্ট করে ফসল ফলান কিন্তু তা বাজারে আনতে বড় বাধার সম্মুখীন হন। সরকার নির্ধারিত মূল্যে সার বা অন্যান্য উপকরণ পাওয়াও তাদের জন্য কঠিন। কারণ কৃষি কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেসি পাওয়ার নেই। আমরা অপরাধীদের ধরতে পারি কিন্তু সরাসরি জরিমানা করতে পারি না।
তিনি বলেন, বাঁশখালীতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সংকটের সৃষ্টি করবে। আমার প্রস্তাব হলো, আমরা যদি পাহাড়ের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করতে পারি, তবে তা কৃষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়াবে। পশ্চিম বাঁশখালীতে বেড়িবাঁধের পাশাপাশি যে ¯স্লুইসগেটগুলো আছে, সেগুলো সঠিকভাবে কাজ করে না। মেরামতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।
বাঁশখালীতে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি দাবি করে কালীপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান-২ জিসানুল ইসলাম বলেন, সরকার আসে, যায়- কিন্তু বাঁশখালীর সড়কের উন্নয়ন আমাদের চোখে পড়ে না। সরকার যদি কিছু না দেয়, তবে সেটা চেয়ে আনতে হবে, কেঁদে হলেও আদায় করতে হবে। আমি বর্তমান সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী মহোদয়কে বলব, আপনারা যে যে দলই করুন না কেন, এলাকার স্বার্থে আগে আমাদের এই রাস্তাটির উন্নয়ন করুন।
উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশার কথা তুলে ধরেন ডা. মিন্টু ধর। তিনি বলেন, চিকিৎসা কোনো একক কাজ নয়, এটি একটি টিমওয়ার্ক। ডাক্তারের পাশাপাশি নার্স ও সুইপারের গুরুত্বও সমান। অথচ আমাদের উপজেলায় মাত্র একজন সুইপার দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে; যেখানে প্রয়োজন অন্তত চারজন। ফলে হাসপাতালের পরিবেশ রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো আমরা পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করতে পারি না। কারণ আমাদের এখানে শুধু সিলিন্ডার অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়। জরুরি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ইসিজি বা ল্যাবে পরীক্ষার ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে নেই। যা গরিব রোগীদের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। মা ও শিশুর নিরাপত্তার জন্য ইমারজেন্সি সিজারিয়ান সেকশন বা গাইনি বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
পূর্বকোণ /পুষ্প
















