চট্টগ্রাম শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

সর্বশেষ:

ছয় লেনের অপেক্ষা আর কত

চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক

ছয় লেনের অপেক্ষা আর কত

মিজানুর রহমান

২১ মে, ২০২৬ | ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

ঢালু পাহাড়ি আর অপ্রশস্ত সড়কজুড়ে ঘন ঘন বাঁক লোহাগাড়ার জাঙ্গালিয়ায়। সেখানে খেই হারিয়ে প্রায় প্রতিদিনই দুর্ঘটনায় পড়ছেন চালকরা। শুধু জাঙ্গালিয়া নয়- চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়কের লোহাগাড়া-সাতকানিয়া অংশে এমন একাধিক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকে প্রায় প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। দীর্ঘদিন ধরে এটি ছয় লেনে উন্নীত করার দাবি উঠলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে এই মুহূর্তে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ছয় লেনে উন্নীত করার কোনো বিকল্প নেই।

 

‘স্বনির্ভর চট্টগ্রাম (চট্টগ্রাম-১৫, লোহাগাড়া-সাতকানিয়া আংশিক): চ্যালেঞ্জ ও করণীয়’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় নাগরিক সমাজের বিশিষ্টজনেরা এই প্রস্তাব দিয়েছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে সাতকানিয়া এলাইট হাসপাতালের হল রুমে এই গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সঞ্চালনা করেন পূর্বকোণের নিজস্ব প্রতিবেদক নাজিম মোহাম্মদ।

 

আলোচনায় অংশ নিয়ে শিক্ষক ও নারী উদ্যোক্তা সানজিদা রহমান বলেন, নারীদের নেতৃত্বে আসার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগের অভাব। ২০২৪-এর আন্দোলনে আমরা নারীরা সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ঢাল হিসেবে কাজ করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়- পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর অনেক নারীকেই আবার লাঞ্ছিত হতে হয়েছে। অথবা ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে।

 

তিনি বলেন, আমি চাই সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় এমন বড় বড় শিল্পকারখানা গড়ে উঠুক, যেখানে নারীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে। নারীরা যখন আর্থিকভাবে স্বাধীন হবে, তখন তাদের ওপর সামাজিক ও পারিবারিক নির্যাতন অনেকাংশে কমে আসবে। আমি এমন এক সহনশীল পরিবেশ ও সমাজ গঠনের দাবি জানাই, যেখানে নারীরা মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার, কথা বলার অধিকার পাবে। সাতকানিয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইব্রাহীম চৌধুরী বলেন, জলাবদ্ধতা, বেকারত্বের মতো যে বড় চ্যালেঞ্জগুলো- আছে, সেগুলো এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘোষণা করি, আমাদের এলাকায় কোনো বিশৃঙ্খলা হতে দেব না, তবেই একটি সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে। সমৃদ্ধ সাতকানিয়া গড়াই হবে আমাদের প্রধান লক্ষ্য।

 

সাতকানিয়ায় কৃষির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে জানিয়ে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা টিটু দাশ বলেন, আমার প্রধান লক্ষ্য হল- কৃষকরা যেন এক বা দুই ফসলি জমিকে তিন বা চার ফসলি জমিতে রূপান্তর করতে পারে। বিশেষ করে দুই ধানের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা চাষ করলে একদিকে যেমন ভোজ্য তেলের চাহিদা মিটবে, অন্যদিকে জমির উর্বরতাও বৃদ্ধি পাবে।

 

তিনি বলেন, সাতকানিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে মাল্টা, কমলা বা জাম্বুরার মতো লেবুজাতীয় ফলের বাগান গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা এই কাজে সর্বাত্মক সহায়তা দেব। এছাড়া রাস্তার পাশে বা রেললাইনের ধারের পতিত জমিতে সবজি চাষের জন্য আমরা কৃষকদের বীজ ও সার দিয়ে সহায়তা করছি। এই কাজে আমাদের কিছু চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

 

টিটু দাশ আরও বলেন, আমরা বিএডিসি-র মাধ্যমে গভীর নলকূপ স্থাপন ও খাল খননের ওপর জোর দিচ্ছি। তবে বড় উদ্বেগের বিষয় হল ইট ভাটার জন্য ফসলি জমির ‘টপ সয়েল’ কেটে ফেলা। এতে জমির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া নিরাপদ সবজি উৎপাদন করে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারি।

 

বন্যা-জলাবদ্ধতা সাতকানিয়ার প্রধান অভিশাপ মন্তব্য করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শেখ মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, প্রতিবছর বন্যা-জলাবদ্ধতা কৃষি ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। শঙ্খ ও ডলু নদীর ভাঙন রোধে যে কাজ হয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নমানের। ফলে সেটি টেকসই হয়নি। ‘টপ সয়েল’ কেটে নেওয়ার যে সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, তা আমাদের কৃষির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে।

 

তিনি বলেন, সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় গ্যাস লাইন সংযোগ দিয়ে একটি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এতে যেসব শিল্পকারখানা গড়ে উঠবে, সেখানে আমাদের মা-বোন, সন্তানদের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি আমাদের যুবকদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। যেন রেমিট্যান্সের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। স্বনির্ভর সাতকানিয়া গড়তে একটি দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন করতে হবে।

 

গারাঙ্গীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আমাদের এলাকায় অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে- কিন্তু সঠিক সুযোগ ও পরিচর্যার অভাবে তারা অকালেই হারিয়ে যাচ্ছে। কারণ পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীরা ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা এবং বিদ্যালয় ক্রীড়া সমিতির মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতিও প্রকট। এটি দূর করতে হবে।

 

তিনি বলেন, অনেক অভিভাবক মনে করেন খেলাধুলা মানেই সময়ের অপচয়। তারা চান সন্তান শুধু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হোক। কিন্তু খেলাধুলার মাধ্যমেও বিশ্বজুড়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করা সম্ভব। যেমনটি সাকিব আল হাসান করেছেন। আমরা যদি কিশোর-যুবসমাজকে মাদক ও বিপথগামিতা থেকে রক্ষা করতে চাই, তবে নিয়মিত ক্রীড়া চর্চার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য মাঠ সংস্কারসহ খেলাধুলার সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি।

 

স্থানীয় বিরোধগুলো স্থানীয়ভাবে মীমাংসা জরুরি মন্তব্য করে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের প্যানেল আইনজীবী নওশাদ আলী বলেন, আমাদের বিচার ব্যবস্থায় মামলার জট বিশাল পাহাড়ের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাতকানিয়া-লোহাগাড়ায় এমন কোনো পাড়া খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যেখানে মানুষ মামলার জালে আটকা পড়েনি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একটি বড় মামলা থেকে পরবর্তীতে আরও একাধিক ছোট মামলার জন্ম হয়।

 

তিনি বলেন, স্থানীয় বিরোধগুলো স্থানীয় পর্যায়েই আপস-মীমাংসা হলে এটি হতো না। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদগুলো কার্যকর ভ‚মিকা রাখতে পারছে না। অনেক চেয়ারম্যানের আইনি জ্ঞানের অভাব বা যোগ্যতার ঘাটতি থাকায় সাধারণ মানুষ সঠিক প্রতিকার পাচ্ছেন না। আমি চাই আমাদের এলাকার মানুষ মামলা মোকদ্দমার পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট না করে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তি করুক।

 

ব্যবসায়ী প্রতিনিধি রবিউল হোসেন খোকন বলেন, বাজারগুলোতে লিজ বা ইজারা প্রথা একটি বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লোহাগাড়ার বটতলী স্টেশনের মতো বড় বাজারগুলোতে ইজারার উচ্চহারের কারণে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। কারণ অনেক ব্যবসায়ী ইজারার টাকা তুলতে ক্রেতাদের ওপর বাড়তি দাম চাপিয়ে দেন। এই ইজারা সিন্ডিকেট ভাঙতে পারলে ব্যবসার পরিবেশ অনেক বেশি উন্নত হবে।

 

তিনি বলেন, আমাদের অনেক ব্যবসায়ী বাইরে বড় বড় ইন্ডাস্ট্রি করেছেন। কিন্তু তারা যদি নিজ এলাকায় বিনিয়োগ করেন অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। এ জন্য গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন গড়ে তোলা জরুরি। কৃষকদের জন্য স্বতন্ত্র সবজি বাজার চালু করা যেতে পারে। আমরা ব্যবসায়ীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হই, প্রশাসন থেকে সহায়তা পাই, তবে সাতকানিয়া-লোহাগাড়া একটি সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক হাবে পরিণত হবে।

 

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এটিএম জাহেদ চৌধুরী বলেন, পশ্চিমের পাহাড় থেকে আসা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সশস্ত্র হামলা জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। তাদের দমন করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক এখন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই সড়কটি দ্রæত ছয় লেনে উন্নীত করা আমাদের প্রাণের দাবি।

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট