চট্টগ্রাম রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

সাক্ষাৎকারে চেন্নাই অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

সাক্ষাৎকারে চেন্নাই অ্যাপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

বুক না কেটে ৯৮% বাইপাস সার্জারি, তিনদিনেই ছুটি

ইমাম হোসাইন রাজু, চেন্নাই থেকে ফিরে

২৬ জুলাই, ২০২৬ | ১১:৫৪ পূর্বাহ্ণ

হৃদরোগ চিকিৎসায় প্রথাগত বড় অস্ত্রোপচারের ধারণা বদলে দিয়েছে আধুনিক রোবোটিক ও কি-হোল প্রযুক্তি। ভারতের চেন্নাই অ্যাপোলো হাসপাতালে এখন বুকের হাড় না কেটে পাঁজরের পাশে মাত্র ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ৯৮ শতাংশ বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হচ্ছে। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে অপারেশনের পর হাসপাতালে রোগীদের থাকার গড় সময় ১০ দিন থেকে কমে মাত্র সাড়ে তিন দিনে নেমে এসেছে। সম্প্রতি এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে হাসপাতালটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নাভীন ভি, ক্লিনিকাল অ্যাডভাইজার ডা. এন. সত্যভামা এবং সিনিয়র কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ডা. মোহাম্মদ রেহান সাঈদ এই তথ্য জানান।

অ্যাপোলো হসপিটালস গ্রিমস রোডের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ রেহান সাঈদ বলেন, আমাদের হাসপাতালে প্রথাগত বুক কাটার পদ্ধতি প্রায় ভেঙে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে মোট হার্ট সার্জারির ৯৮ শতাংশই করা হচ্ছে সম্পূর্ণ আধুনিক এমআইসিএস বা রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড পদ্ধতিতে। তিনি জানান, প্রথাগত ওপেন হার্ট সার্জারিতে বুকের মাঝখানের হাড় কেটে অস্ত্রোপচার শেষে তা লোহার তার দিয়ে আটকে দেওয়া হতো।

এতে সুস্থ হতে ৩ থেকে ৬ মাস সময় লাগত। কিন্তু আধুনিক কি-হোল পদ্ধতিতে হাড় সম্পূর্ণ অক্ষত থাকায় রক্তক্ষরণ ও ইনফেকশনের ঝুঁকি থাকে না বললেই চলে। ফলে রোগীরা ২ থেকে ৩ সপ্তাহের মধ্যেই স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরতে পারছেন।

হাসপাতালটির ডিরেক্টর অ্যান্ড ক্লিনিকাল অ্যাডভাইজার ডা. এন. সত্যভামা বলেন, ২০০০ সালের শুরুর দিকেও হার্ট অপারেশনের পর রোগীকে গড়ে ১০ দিন হাসপাতালে থাকতে হতো। কিন্তু উন্নত রোবোটিক সার্জারির কল্যাণে বর্তমানে রোগীরা গড়ে মাত্র সাড়ে তিন দিনে ছুটি (ডিসচার্জ) পেয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও জানান, পশ্চিমা দেশগুলোর মতো এখানে অস্ত্রোপচারের জন্য কোনো দীর্ঘ ‘ওয়েটিং টাইম’ বা অপেক্ষার তালিকা নেই। রোগী আসার দুই দিনের মধ্যেই সার্জারি করা সম্ভব।

হাসপাতাল সংক্রমণ বা ইনফেকশন নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ডা. সত্যভামা জানান, অস্ত্রোপচার-পরবর্তী ঝুঁকি এড়াতে তারা সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অবস্থিত বিশ্বখ্যাত ‘সিডিসি’র (সেন্ট্রাল ডিজিজ কন্ট্রোল) প্রোটোকল কঠোরভাবে অনুসরণ করেন। শুধু বৈজ্ঞানিক নিয়মে হাত ধোয়ার কারণেই তাদের হাসপাতালে ইনফেকশন রেট বিশ্বমানের চেয়েও কম।

হাসপাতালের সিইও নাভীন ভি জানান, একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চেন্নাই অ্যাপোলো এ পর্যন্ত রেকর্ড ২ লাখ ৩৬ হাজার কার্ডিয়াক সার্জারি এবং ৩ লাখ ২৫ হাজার এনঞ্জিওপ্লাস্টি সম্পন্ন করেছে, যা একটি বিশ্বরেকর্ড। এই আউটকাম আমেরিকার বিখ্যাত ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের সমকক্ষ। বর্তমানে এই হাসপাতাল ভবনেই ৫টি অত্যাধুনিক মেডিকেল রোবট সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

তবে সব রোগী এই রোবোটিক সুবিধার আওতাভুক্ত নন উল্লেখ করে ডা. রেহান সাঈদ জানান, রোগীর হার্টের সব রক্তনালীতে জটিল ব্লক (মাল্টি-ভেসেল ডিজিজ), অতিরিক্ত স্থূলতা কিংবা অতীতে বুকে অন্য কোনো বড় সার্জারি হয়ে থাকলে এখনো নিরাপদ ও প্রথাগত ‘ওপেন-হার্ট’ পদ্ধতিই বেছে নেওয়া হয়।

বাংলাদেশি রোগীদের বিষয়ে সিইও নাভীন ভি বলেন, বাংলাদেশ থেকে আসা রোগীদের জন্য আমাদের বিশেষ সহানুভূতি রয়েছে। যারা ব্যয়বহুল রোবোটিক সার্জারির খরচ চালাতে পারেন না, তারা চিকিৎসকের মাধ্যমে আবেদন করলে নিয়মানুযায়ী বিশেষ আর্থিক ছাড় দেওয়া হয়।

জটিল রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার বিষয়ে ডা. সত্যভামা বলেন, বাংলাদেশ থেকে অনেক সময় রোগীরা একদম শেষ পর্যায়ে জটিল অবস্থা নিয়ে আসেন। এই সংকট কাটাতে দুই দেশের চিকিৎসকদের যৌথ কোলাবরেশন প্রয়োজন| বাংলাদেশের তরুণ সার্জনরা চাইলে চেন্নাই অ্যাপোলোতে এসে হাই-টেক সার্জারির ওপর সরাসরি ‘হ্যান্ডস-অন ট্রেনিং’ নিতে পারেন, যার জন্য অ্যাপোলোর দুয়ার সবসময় খোলা।

এদিকে, অ্যাপোলো হাসপাতালের বাংলাদেশের প্রতিনিধি সৈয়দ রিফাত ফারুক জানান, রোগীদের চেন্নাই যাওয়ার আগের প্রয়োজনীয় পেপারওয়ার্ক, ভিসা ও ডাক্তারদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট সহজ করতে বর্তমানে বাংলাদেশে ৫টি তথ্য কেন্দ্র (ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী এবং ময়মনসিংহ) চালু রয়েছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের জামালখানে অ্যাপোলোর নিজস্ব তথ্য কেন্দ্র রয়েছে। সিইও এবং পরিচালকের ঘোষিত ফ্রি বিমানবন্দর পিকআপ- চিকিৎসার আর্থিক ছাড়ের জন্য আবেদন কিংবা সাশ্রয়ী আবাসন সুবিধা পাওয়ার প্রক্রিয়াগুলো রোগীরা বাংলাদেশ থেকেই আমাদের এই ৫টি সেন্টারের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে পারবেন। ফলে রোগীদের চেন্নাই গিয়ে কোনো দালালের খপ্পরে বা হয়রানিতে পড়তে হবে না।

পূর্বকোণ/আদর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট