চট্টগ্রাম শুক্রবার, ০৩ জুলাই, ২০২৬

মন্তব্য প্রতিবেদন

নতুন বিশ্বে যথেষ্ট নয় পুরোনো নীতি

জোনাথন হোলস্লাগের সতর্কবার্তা থেকে বাংলাদেশের কৌশলগত শিক্ষা

৩ জুলাই, ২০২৬ | ৬:৩৮ পূর্বাহ্ণ

বিশ্ব রাজনীতির এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশ। যে বিশ্বে একসময় মুক্তবাণিজ্য, বৈশ্বিক সংযোগ এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরশীলতাকে শান্তি ও সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই বিশ্ব আজ দ্রুত রূপ নিচ্ছে প্রতিযোগিতা, কৌশলগত উদ্বেগ এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার এক নতুন যুগে। বেলজিয়ান ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক জোনাথন হোলস্লাগ তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, বিশ্বায়ন ক্ষমতার রাজনীতিকে বিলুপ্ত করেনি; বরং তাকে আরও জটিল ও সূক্ষ্ম রূপ দিয়েছে।

 

যদি তাঁর এই বিশ্লেষণকে বর্তমান বাস্তবতার আলোকে মূল্যায়ন করা হয়, তবে বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- এই প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক পরিবেশে নিজের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পথচলা। কোল্ড ওয়ার বা শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যুগে বৃহৎ শক্তিগুলোর সহযোগিতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে উন্নয়নের যে পরিসর তৈরি হয়েছিল, তা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। এখন প্রতিটি রাষ্ট্রকে নিজস্ব অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক ভিত্তি ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আজও মূল্যবান। তবে নতুন বাস্তবতায় এই নীতিকে আরও কার্যকর ও কৌশলগত রূপ দিতে হবে। এটি হতে পারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ দর্শনের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, যেখানে জাতীয় স্বার্থই হবে প্রতিটি সিদ্ধান্তের মূল ভিত্তি।

 

বাংলাদেশ এমন এক ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে একদিকে ভারতের সঙ্গে দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে অবকাঠামো, শিল্প ও কাঁচামালের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক, আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান রপ্তানি বাজার। এই বাস্তবতায় কোনো একটি শক্তি বলয়ের সঙ্গে একচেটিয়া সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হবে না।

 

বরং বাংলাদেশের উচিত হবে অ-একচেটিয়া অংশীদারিত্ব (Non-Exclusive Alignment) অনুসরণ করা। অর্থাৎ, চীনের বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ গ্রহণ করতে হবে, তবে ঋণের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজারে অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখতে হবে। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বাস্তববাদী সহযোগিতা বজায় রাখতে হবে।

 

হোলস্লাগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- অতিরিক্ত সরবরাহনির্ভরতা একটি রাষ্ট্রকে দুর্বল করে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প বিশ্বে অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হলেও কাঁচা কাপড়, সুতা, যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন শিল্প উপাদানের জন্য এখনও বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। দক্ষিণ চীন সাগর বা বঙ্গোপসাগরে কোনো বড় ভূরাজনৈতিক সংকট দেখা দিলে এই সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।

 

তাই এখনই ব্যাকওয়ার্ড ইন্টিগ্রেশনে জোর দেওয়া জরুরি। দেশীয় বস্ত্রশিল্প, কৃত্রিম তন্তু, শিল্পযন্ত্রাংশ এবং রাসায়নিক উপকরণ উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি, সার, শিল্প কাঁচামাল এবং গুরুত্বপূর্ণ আমদানির উৎসকে আসিয়ান, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। বহুমুখীকরণই হবে অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার মূল ভিত্তি।

 

বাংলাদেশ খুব শিগগিরই স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণ ঘটাবে। এর ফলে অতীতের বহু বাণিজ্যিক সুবিধা আর থাকবে না। একই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন বিশ্ব শিল্পকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে না।

 

সুতরাং পরবর্তী ধাপ হতে হবে মূল্যসংযোজনভিত্তিক অর্থনীতিতে উত্তরণ। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে ইলেকট্রনিক্স, সেমিকন্ডাক্টর উপাদান, জাহাজ নির্মাণ, প্রতিরক্ষা-সহায়ক শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যৌথ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে। তবে শুধু কারখানা নির্মাণ নয়; প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা, প্রকৌশল দক্ষতা এবং দেশীয় মানবসম্পদ উন্নয়নকে বিনিয়োগ চুক্তির বাধ্যতামূলক অংশ করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণ প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিতে হবে।

 

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। বড় শক্তিগুলো প্রায়ই ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রকে তাদের কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশে পরিণত করতে চায়। এই বাস্তবতায় প্রতিবেশী সম্পর্ক যত স্থিতিশীল হবে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবেশও তত নিরাপদ থাকবে।

 

ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য ও যোগাযোগের মতো বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক আবেগের পরিবর্তে অর্থনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল মানবিক ইস্যু হিসেবে নয়, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের নিরাপত্তা, মানবপাচার, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে যুক্ত একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে। তবে আগামী দশকের জন্য বাংলাদেশের আরও কয়েকটি অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি।

 

প্রথমত, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক সংঘাত এবং বাজার অস্থিরতার যুগে খাদ্য আমদানির ওপর অতিনির্ভরতা বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কৃষির আধুনিকায়ন, কৌশলগত খাদ্য মজুত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

 

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে হবে। সাইবার নিরাপত্তা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলা আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

 

তৃতীয়ত, ব্লু ইকোনমিকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ, গভীর সমুদ্রবন্দর, জাহাজ নির্মাণ, সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ এবং সমুদ্রভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

 

চতুর্থত, মানবসম্পদ উন্নয়ন হবে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ। দক্ষ প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি কর্মী তৈরি না হলে বিদেশি বিনিয়োগ থেকেও কাক্সিক্ষত প্রযুক্তিগত রূপান্তর ঘটবে না।
আজকের বিশ্ব আর আদর্শের নয়; এটি সক্ষমতার বিশ্ব। যে রাষ্ট্র নিজের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিল্প এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যকে শক্তিশালী করতে পারবে, ভবিষ্যৎ তারই।

 

হোলস্লাগের বিশ্লেষণ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা বহন করে। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া, যার সঙ্গে প্রত্যেক বড় শক্তি সহযোগিতা করতে আগ্রহী, কিন্তু কেউই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম নয়। অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতার শিকার না হয়ে, সেই প্রতিযোগিতাকেই যদি বাংলাদেশের উন্নয়নের সুযোগে রূপান্তর করা যায়, তবে সেটিই হবে আগামী দশকের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্য।

 

বিশ্বায়নের নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের সামনে তাই একটিই পথÑ জাতীয় স্বার্থে বাস্তববাদ, অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের সমন্বয়ে একটি আত্মবিশ্বাসী ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ রাষ্ট্রনীতি।

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট