চট্টগ্রাম সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬

এলডিসি-পরবর্তী বাংলাদেশ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই কি আমাদের নতুন শক্তি?

চট্টগ্রামে একটি বিশেষায়িত এআই বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার প্রস্তাব ঘিরে নতুন আলোচনা

ড. মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন

৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রামের একটি পোশাক কারখানায় একজন মানুষ খালি চোখে দেখেন, কোন কাপড়ে সুতার টান পড়েছে, কোথায় বুননে ফাঁক আছে। পাশেই বন্দরে আরেকজন মানুষ অভিজ্ঞতার জোরে হিসাব কষেন, কোন কনটেইনার কোথায় রাখলে পরের ট্রাক দ্রুত বেরোবে। এই দুটি কাজই আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজ। আর এই কাজ কারা করবে, তার ওপরই অনেকটা নির্ভর করছে এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার পর বিশ্ববাজারে আমাদের টিকে থাকার ক্ষমতা।

 

সংকটটা কোথায়
আগামী ২৪ নভেম্বর ২০২৬ বাংলাদেশের এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার কথা। প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ এখনও জাতিসংঘে বিবেচনাধীন, তবে ফলাফল যা-ই হোক, চ্যালেঞ্জের ধরনটা একই থাকছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাধারণ অগ্রাধিকার ব্যবস্থায় গেলে তৈরি পোশাকের শুল্ক দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে নয় শতাংশে, আর রপ্তানি আয়ে ছয় থেকে চৌদ্দ শতাংশ পতনের আশঙ্কা আছে। এই ধাক্কা লাগবে এমন এক খাতে, যা আমাদের রপ্তানি আয়ের আশি শতাংশের বেশি জোগায় আর চল্লিশ লাখেরও বেশি মানুষের, বিশেষত নারীর, কর্মসংস্থান দেয়। জেনেরিক ওষুধ শিল্পও পেটেন্ট ছাড় হারিয়ে এখন নিজস্ব গবেষণায় যেতে বাধ্য হবে। উত্তর একটাই, সস্তা শ্রমের বদলে উৎপাদনশীলতা দিয়ে লড়া, আর আজকের দুনিয়ায় তার মানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কাজ দ্রুত ও নির্ভুল করা। গবেষণা বলছে, জেনারেটিভ এআই মধ্যমেয়াদে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১.৮ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে, তবে এই সুযোগ সমান হাতে বণ্টিত হবে না; দক্ষ জনবল ও অবকাঠামো যাদের আছে, সুবিধা তারাই নেবে।

 

কেনা যাবে না, বানাতে হবে
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি ভাঙা দরকার। অনেকে ভাবেন স্বয়ংক্রিয়করণ মানে বিদেশ থেকে সফটওয়্যার কিনে বসিয়ে দেওয়া। বাস্তবে তা হয় না। বিদেশি ত্রুটি-শনাক্তকরণ ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে অন্য দেশের কাপড়, আলো আর মেশিনের ছবি দিয়ে; চট্টগ্রামের কারখানায় বসালে ভুল বেশি ধরবে, ঠিক কম। বন্দরের সমস্যা আরও জটিল, কারণ এখানকার জেটি বিন্যাস আর কর্ণফুলীর জোয়ারভাটার হিসাব পৃথিবীর আর কোথাও নেই। এআই ব্যবস্থা তৈরি হয় স্থানীয় তথ্য দিয়ে, যা থাকে অপারেটরের হাতে; এটা দূর থেকে আমদানি করা যায় না।
তাহলে এই কাজ করবে কারা? বৈশ্বিক উদ্ভাবন সূচকে মানবসম্পদ ও গবেষণায় আমাদের অবস্থান ১৩৩তম, গবেষণায় ব্যয় জিডিপির শূন্য দশমিক তিন শতাংশেরও নিচে, আর মেশিন লার্নিং বা রোবোটিকসে বিশেষায়িত পিএইচডি প্রশিক্ষণের কাঠামোর অভাব রয়েছে। অর্থাৎ যন্ত্র বসানোর টাকা জোগাড় হলেও যন্ত্র চালানোর মানুষ আমরা তৈরি করছি না।

 

প্রস্তাব: চট্টগ্রামে একটি স্নাতকোত্তর এআই বিশ্ববিদ্যালয়
এই ফাঁক পূরণে দরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিশেষায়িত একটি স্নাতকোত্তর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়, কেবল এমএসসি ও পিএইচডি, সঙ্গে একটি গবেষণা পার্ক। সেখানে বন্দর কর্তৃপক্ষ, কারখানা ও সরকারি সংস্থা বাস্তব সমস্যা ও তথ্য দেবে, বিনিময়ে পাবে সমাধান আর প্রশিক্ষিত জনবল। প্রস্তাবিত চৌদ্দটি জোড়া প্রোগ্রামের ছয়টি আঞ্চলিক সমস্যাভিত্তিক, যেমন বন্দর ও সমুদ্র পরিবহন, শিল্প উৎপাদন, সামুদ্রিক অর্থনীতি, জলবায়ু ও দুর্যোগ, কৃষি এবং জ্বালানি। বাকি আটটি জাতীয় প্রয়োজনের।
দুটি অগ্রাধিকার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত সেমিকন্ডাক্টর, যেখানে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় একশ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়েছে, অথচ আধুনিক চিপ নকশা ও ত্রুটি শনাক্তকরণ প্রায় পুরোটাই মেশিন লার্নিং-নির্ভর। দ্বিতীয়ত সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। বিদেশি ভাষা মডেল বাংলাকে গুরুত্বহীন ভাষা হিসেবে দেখে, চলে বিদেশি কোম্পানির শর্তে। সরকারি সেবা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের তথ্য সেই মডেলের ওপর নির্ভরশীল হলে দেশের সিদ্ধান্তও পরনির্ভর হয়ে পড়ে। খসড়া জাতীয় এআই নীতি ২০২৬-২০৩০ তাই নিজস্ব তথ্য, নিজস্ব গবেষকদের হাতে তৈরি ও দেশের ভেতরেই হোস্ট করা একটি বাংলা ভাষা মডেলকে ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

 

কেন চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রায় নব্বই শতাংশ সামলায়, গত অর্থবছরে পঁয়ত্রিশ লাখেরও বেশি কনটেইনার (টিইইউ) হ্যান্ডেল করেছে। পাশেই চট্টগ্রাম ও কর্ণফুলী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় পোশাক, ওষুধ, হালকা প্রকৌশল ও ইলেকট্রনিক্স কারখানা। মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎ হাব তৈরি হচ্ছে; চালু হওয়ার আগেই নকশায় এআই যুক্ত করা দরকার, নইলে পরে বিপুল অর্থ অপচয় হবে। ঢাকা বন্দর থেকে আড়াইশ কিলোমিটার দূরে, আর বঙ্গোপসাগর বা পাহাড়ি উপকূল ছাড়া বন্দর, সমুদ্র বা ভূমিধসের গবেষণা হয় না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চুয়েট, বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি ও এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন এখানেই আছে। নতুন প্রতিষ্ঠানের কাজ এদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বরং এদের স্নাতকদের জন্য দেশের ভেতরেই গবেষণার পথ খুলে দেওয়া।

 

সময়ের হিসাব
একটি বিশ্ববিদ্যালয় দাঁড়াতে আট থেকে দশ বছর লাগে। শুল্কসুবিধা উঠে যাওয়ার পর শুরু করলে একটি দশক দেরি হয়ে যাবে। দশ বছরে সম্ভাব্য ফল হিসেবে থাকবে শতাধিক প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঁচশর বেশি এমএসসি ও দেড়শর বেশি পিএইচডি গবেষক, বন্দর ও কারখানায় বাস্তবে ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থা, উন্নত বন্যা ও ভূমিধস পূর্বাভাস, একটি উন্মুক্ত বাংলা ভাষা মডেল এবং শতাধিক নতুন প্রযুক্তি উদ্যোগ।
শুরুর খরচ সাড়ে তিন থেকে পাঁচ কোটি ডলার, যা এক বছরের সম্ভাব্য রপ্তানিক্ষতির তুলনায় সামান্য।
যন্ত্র আসবে, তাতে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, সেই যন্ত্র বাংলাদেশের কাপড়, বন্দর, আবহাওয়া আর ভাষা বুঝে চলবে কি না। উত্তরটা নির্ভর করছে আমরা এখনই মানুষ তৈরি করছি কি না, তার ওপর।

 

লেখক: অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়;
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন

শেয়ার করুন