চট্টগ্রাম বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আত্মতুষ্টি এবং অপ্রতিমদের হারিয়ে যাওয়া
ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম।

সন্তান কোথায় আছে— শুধু এটুকু জানলেই হবে না; জানতে হবে, সে কার সঙ্গে আছে

জিয়া মো. মোস্তাফিজ ভুঁইয়া

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:৪৬ অপরাহ্ণ

কুমিল্লার একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাকে একজন বাবা হিসেবে আবারও ভাবিয়েছে— আমরা কি সত্যিই আমাদের সন্তানদের চিনি? চেনার চেষ্টা করি?

১৩ বছরের একটি কিশোর ‘অপ্রতীম’ নিখোঁজ হওয়ার পর তার মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং নিহত কিশোরের সঙ্গে থাকা আইফোনটিও উদ্ধার হয়েছে।

ঘটনাটি তদন্ত ও আইনের বিষয়। কিন্তু একজন অভিভাবক হিসেবে এখান থেকে আমাদের একটা শিক্ষা নেওয়ার আছে।

সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে পড়ালেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
দামি ফোন কিনে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।
ভালো খাবার, ভালো পোশাক আর প্রয়োজনীয় সবকিছু দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— আপনার সন্তান কোন পৃথিবীতে বেড়ে উঠছে, সেই পৃথিবীটা আপনি কতটা চেনেন।

আমার নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও আমরা ছোটবেলা থেকেই একটা বিষয় মেনে চলেছি— তাদের ওপর অযথা নজরদারি নয়, কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে সচেতন থাকা।

একবার আমার ছেলে ক্লাস সিক্স-সেভেনে পড়ার সময় এক বন্ধুর বাসায় থাকতে চাইল। আমরা প্রথমে জানতে চাইলাম— কার বাসায় থাকবে, কারা থাকবে, সেই বাসার অভিভাবক জানেন কি না।
অভিভাবকের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি যখন বললেন, ‘ভাই, কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা আছি’— তখন আমরা নিশ্চিন্ত হলাম।
আবার আমার ছেলেদের বন্ধুরা যখন আমাদের বাসায় আসত, তারা একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করত, নিজেদের মতো গল্প করত, সিনেমা দেখত। আমরা তাদের অযথা বিরক্ত করতাম না।

কিন্তু একটা বিষয় নিশ্চিত ছিল—
আমরা জানতাম, তার বন্ধুরা কারা।

আমার কাছে সন্তানের সঙ্গে সম্পর্কের
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা হলো—
সে যেন তার জীবনটা আপনার কাছ থেকে লুকাতে না চায়।
সে যেন বলতে পারে—
“বাবা, আজ অমুক বন্ধুর সঙ্গে খেলতে গিয়েছিলাম।”
“অমুকের বাসায় গিয়েছিলাম।”
“আমরা ফুটবল খেলতে যাব।”
“বন্ধুদের সঙ্গে একটু ঘুরতে যাব।”
এই কথাগুলো যখন সন্তান স্বাভাবিকভাবে বাবা-মায়ের সঙ্গে শেয়ার করে, তখন বাবা-মা তার পৃথিবীটাকে অনেকটাই বুঝতে পারেন।
আজকের সন্তানদের পৃথিবী কিন্তু আমাদের সময়ের মতো নয়।

এখন মাঠের পাশাপাশি মোবাইল আছে। অনলাইন গেম আছে। সোশ্যাল মিডিয়া আছে। ভার্চুয়াল বন্ধু আছে।

মোবাইল ফোন খারাপ নয়। প্রযুক্তিও খারাপ নয়।
আমার সন্তান মোবাইল ব্যবহার করবে, গেম খেলবে, কোডিং শিখবে, ভালো কিছু দেখবে—এটা স্বাভাবিক। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাকে এগিয়ে যেতেই হবে।
কিন্তু আমি জানতে চাইব—
সে কী করছে?
কার সঙ্গে করছে?
কোথায় করছে?
তার জীবনের অনলাইন আর অফলাইনের পার্থক্যটাও বুঝতে হবে।

অনলাইনে আপনার সন্তানের সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের মানুষের যোগাযোগ হতেই পারে। কিন্তু বাস্তবে সে যাদের সঙ্গে নিয়মিত ওঠাবসা করছে, সেই সার্কেলটা একজন অভিভাবকের জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জানা মানে সন্দেহ করা নয়।
জানা মানে জেরা করা নয়।
জানা মানে সন্তানকে সারাক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করা নয়।
জানা মানে—তার জীবনের অংশ হয়ে থাকা।

আমাদের অনেকের সমস্যা হলো, সন্তান ছোট থাকতে আমরা তাকে খুব কাছ থেকে দেখি। কিন্তু সে একটু বড় হলেই ধরে নিই—“ও তো এখন সব বোঝে।”
আসলে ঠিক তখনই আমাদের আরও বেশি সচেতন হওয়া দরকার।

কারণ সন্তান তখন স্বাধীনতা চাইবে। নিজের বন্ধু তৈরি করবে। নিজের সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে।
তাকে স্বাধীনতা দিন।
কিন্তু স্বাধীনতার সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কটা যেন হারিয়ে না যায়।

আপনার সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে যায়, কখন ফেরে, কার বাসায় যায়—এসব সম্পর্কে স্বাভাবিকভাবে জানুন।
তার বন্ধুদের চিনুন। সম্ভব হলে তার বন্ধুদের অভিভাবকদেরও চিনুন।পরিচিত হোন।

আর সবচেয়ে বড় কথা—
এমন একজন বাবা-মা হোন, যার কাছে সন্তান ভুল করলেও ফিরে আসতে ভয় পাবে না।
কারণ সন্তান যদি মনে করে, “আমি এটা বললে বাবা-মা আমাকে বকবে, মারবে, অপমান করবে”—তাহলে সে বলবে না।
আর যে বিষয়টা আমরা জানতে পারব না, সেটার ব্যাপারে আমরা তাকে নিরাপদ রাখব কীভাবে?

আমরা সবাই ব্যস্ত। চাকরি আছে, ব্যবসা আছে, সামাজিক জীবন আছে, হাজারো দায়িত্ব আছে।
কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়ার পর তাকে মানুষ করার দায়িত্বটা আমাদেরই।
সন্তানকে শুধু বড় করবেন না—তার সঙ্গে নিজেও বড় হন।

তার বন্ধুদের চিনুন।
তার পছন্দ-অপছন্দ জানুন।
তার অনলাইন পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা রাখুন।
তার অফলাইন চলাফেরার খবর রাখুন।

আর এমন একটা সম্পর্ক তৈরি করুন, যেখানে সে আপনাকে শুধু বাবা-মা নয়—নিজের সবচেয়ে নিরাপদ মানুষ মনে করে।
কারণ শেষ পর্যন্ত—
সন্তানকে পাহারা দিয়ে সব বিপদ থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
কিন্তু তার জীবনের সঙ্গে এতটা যুক্ত থাকা সম্ভব, যাতে বিপদ আসার আগেই অনেক কিছু আমরা বুঝতে পারি।

আল্লাহপাক অপ্রতীমকে জান্নাত নসিব করুন। তার পরিবারকে এই অসহনীয় শোক সহ্য করার শক্তি দিন।
আর আমাদের সবাইকে আমাদের সন্তানদের শুধু ভালোবাসার নয়—তাদের বোঝার, জানার এবং সঠিকভাবে পথ দেখানোর তৌফিক দিন ।

লেখক – পুলিশ পরিদর্শক, কুমিল্লা

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট