চট্টগ্রাম বৃহষ্পতিবার, ০১ অক্টোবর, ২০২৬

হলিউডের সিনেমা দেখে পাখাবিহীন ড্রোন

চট্টগ্রামের তরুণের সাফল্য

হলিউডের সিনেমা দেখে পাখাবিহীন ড্রোন

তাসনীম হাসান 

১ অক্টোবর, ২০২৬ | ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

হলিউডের সিনেমার পর্দায় দেখেছিলেন অদ্ভুত এক উড্ডয়নযান। নেই প্রচলিত ডানা, নেই প্রপেলার, নেই ঘূর্ণায়মান কোনো যন্ত্র। দৃশ্যটি হয়তো কয়েক মিনিটের বেশি মনে থাকার কথা নয়। কিন্তু সীতাকুণ্ডের তরুণ মো. রবিউল আলম মারুফের মাথায় সেটিই আটকে গেল। জন্ম নিল একটি প্রশ্ন-প্রপেলার ছাড়াই কি আকাশে ওড়া সম্ভব?
 
 
২০১৮ সালে বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘অবলিভিয়ন’ দেখার পর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেন এই তরুণ গবেষক। প্রায় সাড়ে চার বছরের গবেষণা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এখন পরীক্ষামূলক পর্যায়ে তিনি তৈরি করেছেন পাখাবিহীন একটি উড্ডয়ন ড্রোন। ঘূর্ণায়মান প্রপেলার না থাকায় এটি প্রচলিত ড্রোনের তুলনায় অনেক কম শব্দে পরিচালনা করা সম্ভব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত জাতীয় বস্ত্র প্রকৌশল ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (নিটার) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মারুফ ২০২১ সালে ‘ডেভেলপমেন্ট অব অ্যান্টিগ্র্যাভিটি ডিভাইস ইউজিং আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রকল্পের আওতায় গবেষণাটি শুরু করেন।
 
 
প্রকল্পটির জন্য ২০২০-২১ অর্থবছরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ থেকে পান ৬ লাখ টাকা সরকারি গবেষণা অনুদান। ২০২৬ সালে প্রকল্পটি সম্পন্ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ আইসিটি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে সনদ ও স্বীকৃতিপত্রও দেওয়া হয়েছে।
 
 
মারুফের গবেষণার মূল প্রযুক্তি হলো তড়িৎ-জলগতিবিদ্যাগত চালনা ব্যবস্থা। সহজ করে বললে, উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মাধ্যমে বাতাসের অণুকে আয়নিত করা হয়। সেই আয়নিত কণাগুলো চলাচলের সময় আশপাশের বাতাসকেও গতিশীল করে। তৈরি হয় আয়নিক বায়ুপ্রবাহ। আর সেই বায়ুপ্রবাহের বিপরীত প্রতিক্রিয়াজনিত বলই উড্ডয়নের জন্য প্রয়োজনীয় উত্তোলনশক্তি তৈরি করে।
 
 
পরীক্ষায় ৪৫ দশমিক ০৩ কিলোভোল্ট ভোল্টেজ প্রয়োগ করে ৯৭ দশমিক ৩ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচে প্ল্যাটফর্মটিকে ওপরে তোলার সক্ষমতা দেখিয়েছেন মারুফ। তবে এই প্রযুক্তিতে তুলনামূলক কম উড্ডয়নশক্তি তৈরি হওয়ায় ভারী কোনো উড্ডয়নযান আকাশে তোলা কঠিন। এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে মারুফ তার মডেলের সঙ্গে যুক্ত করেছেন হাইড্রোজেন বা হিলিয়াম গ্যাসভর্তি হালকা বেলুন। পরীক্ষায় এসব বেলুন প্ল্যাটফর্মের মোট ওজনের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বহন করতে সক্ষম হয়েছে। এতে মূল উড্ডয়ন ব্যবস্থার ওপর প্রয়োজনীয় চাপ কমে এসেছে।
 
 
মারুফের গবেষণার একটি বড় অংশ হয়েছে সাভারের পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ইলেকট্রনিকস ইনস্টিটিউটে। আরেকটি অংশ হয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। গবেষণাটি তত্ত্বাবধান করেছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের বিজ্ঞানীরা এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. কামরুল আলম খান। নিটারে তার গবেষণার তত্ত্বাবধানে ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের প্রভাষক মো. মোশফিকুর রহমান। পাখাবিহীন উড্ডয়ন প্রযুক্তি নিয়ে তার গবেষণাপত্রটি ২০২৬ সালের নিটার গবেষণা মেলায় সেরা গবেষণা উপস্থাপনা পুরস্কার অর্জন করে।
 
 
তবে এখনো অনেকটা পথ বাকি। বর্তমান মডেলটি ল্যাবরেটরির উচ্চ ভোল্টেজ বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে তার দিয়ে যুক্ত রেখেই চালাতে হয়। এ কারণে পরীক্ষার সময় বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গের সমস্যাও দেখা দিয়েছে। তাই পরবর্তী লক্ষ্য তারনির্ভরতা কাটানো। এ জন্য হালকা ওজনের নিজস্ব বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরির কাজ করছেন মারুফ। এতে একদিন নিজের শক্তিতেই উড়বে তার তৈরি যন্ত্র।
 
 
উদ্ভাবনের পথে এটিই মারুফের প্রথম সাফল্য নয়। ২০২৩ সালের ‘স্মার্ট বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চ্যালেঞ্জ-বিচ্ছুরণ’ প্রতিযোগিতায় ৭০০-এর বেশি ধারণার মধ্য থেকে নির্বাচিত হয়ে ‘মাধ্যাকর্ষণচালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনযন্ত্র’ ধারণার জন্য ৫ লাখ টাকা পুরস্কার পান তিনি। জাতীয় পর্যায়ের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের একটি শ্বেতপত্র তৈরির কাজেও গবেষণা সহযোগী হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
 
 
মারুফের এখন স্বপ্ন ল্যাবের বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিবর্তে ব্যাটারি ও বুস্ট কনভার্টার যুক্ত করে এই ড্রোনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা। দেশীয় ড্রোন সক্ষমতা গড়ে তোলার যে সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেই যাত্রার অংশীদার হতে চান এই তরুণ। এজন্য সরকারের সহায়তা চান তিনি।
 
 
মারুফ জানান, স্বয়ংসম্পূর্ণ পাখাবিহীন উড্ডয়নযান তৈরি করা গেলে ড্রোনটি নীরব নজরদারি, বন্যপ্রাণী ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ এবং ক্ষুদ্র আকাশযান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
 
 
মারুফের বাড়ি সীতাকুণ্ড পৌরসভার উত্তর এয়াকুব নগরে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজ মারুফ ছোটকাল থেকেই প্রযুক্তিপ্রেমিক। পড়াশোনার প্রতিটি পদক্ষেপে মেধার স্বাক্ষর রাখা এই তরুণ এখন কাজ করতে চান দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানেও।
 
 
মারুফ বলেন, ‘সোলার প্যানেল বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে উৎপাদিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না। সেই বিদ্যুৎ সংরক্ষণের জন্য বড় আকারের গ্রিড ব্যাটারি উদ্ভাবন করতে চাই। সেই লক্ষ্যেই গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছি।’
 
 
সিনেমার পর্দায় দেখা অসম্ভব মনে হওয়া একটি উড্ডয়নযানকে ঘিরে জন্ম নেওয়া প্রশ্ন একদিন মারুফকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল গবেষণাগারে।  তার সেই গবেষণাযাত্রা দীর্ঘ হোক, বয়ে আনুক দেশের কল্যাণ-এটাই চাওয়া তার শিক্ষক, বাবা-মা, সবার…।
 
 
পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট