কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই এতদিন ছিল মানুষের তৈরি একটি অসাধারণ প্রযুক্তি। মানুষ তাকে নির্দেশ দেবে, এআই কাজ করবে-বিষয়টি ছিল মোটামুটি এমনই। কিন্তু সেই পরিচিত সমীকরণ কি দ্রুত বদলে যাচ্ছে?
এখন এআই শুধু মানুষের কাজ করে দিচ্ছে না; এআই নিজেই আরও উন্নত এআই তৈরিতে সহায়তা করছে। অর্থাৎ, যে প্রযুক্তিকে মানুষ তৈরি করেছে, সেটিই যদি পরবর্তী প্রজন্মের আরও শক্তিশালী প্রযুক্তি তৈরিতে সাহায্য করতে শুরু করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক-এআই কি ধীরে ধীরে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নটি এখন আর কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নয়। বিশ্বের শীর্ষ এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর একজন প্রধান নির্বাহী নিজেই এ নিয়ে সতর্ক করেছেন।
অ্যানথ্রপিকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী ডারিও আমোডি তাঁর সাম্প্রতিক নিবন্ধ ‘উই মাস্ট পেইস দ্য ফ্রান্টিয়ার’-এ বলেছেন, গত কয়েক মাসে এআই এর সক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে দ্রুত বাড়ছে। এর একটি বড় কারণ হলো-এআই এখন পরবর্তী প্রজন্মের এআই তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে। তিনি একে বলেছেন ‘রিকার্সিভ সেল্ফ-ইমপ্রুভমেন্ট’, অর্থাৎ নিজেকে উন্নত করার মাধ্যমে ক্রমাগত আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা।
সহজ করে বললে, এতদিন মানুষ এআই-কে উন্নত করেছে। ভবিষ্যতে এআই যদি নিজেই এআই-কে উন্নত করতে থাকে, তাহলে সেই উন্নতির গতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এখানেই উদ্বেগ।
মানুষ যতটা বুঝছে, এআই কি তার চেয়েও দ্রুত এগোচ্ছে?
প্রযুক্তির অগ্রগতি নিজে কোনো বিপদ নয়। বরং এআই চিকিৎসা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্প, কৃষি ও অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন প্রযুক্তির ক্ষমতা বাড়ার গতি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়ে যায়।
আমোডির দ্বিতীয় উদ্বেগ আরও বাস্তব। ওপেন এআই ও হাগিং ফেইস-সংশ্লিষ্ট একটি সাম্প্রতিক পরীক্ষায় এআই এজেন্টদের একটি দল এমন কিছু আচরণ করে, যা তাদের নির্ধারিত কাজের সীমার বাইরে চলে যায়। তারা এমন সাইবার আক্রমণের চেষ্টা করে, যার সঙ্গে মূল কাজের সম্পর্ক ছিল না। এমনকি নিজেদের সাফল্য নিশ্চিত করতে তাদের কার্যক্রম মূল্যায়নকারী ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত বা হ্যাক করার চেষ্টা করে।
ঘটনাটিতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি। তাই এটিকে নিছক একটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু এখানেই আমোডির প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ।
আজকের অপেক্ষাকৃত সীমিত ক্ষমতার এআই যদি এমন অনাকাক্সিক্ষত আচরণ করতে পারে, আগামী দিনের আরও শক্তিশালী এআই একই ধরনের আচরণ করলে কী ঘটবে?
আজ ক্ষতি হয়তো সামান্য। কিন্তু আগামীকাল যদি এমন এআই-এর হাতে কোটি কোটি কম্পিউটার, গুরুত্বপূর্ণ নেটওয়ার্ক বা ডিজিটাল অবকাঠামোয় প্রবেশের ক্ষমতা থাকে?
তখন বিষয়টি আর কোনো সফটওয়্যারের ‘বাগ’ থাকবে না। তা হয়ে উঠতে পারে জাতীয় কিংবা বৈশ্বিক নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এআই-এর ‘ইচ্ছা’ নয়, মানুষের নিয়ন্ত্রণই আসল প্রশ্ন
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এআই মানুষের মতো ‘ইচ্ছা’ বা ‘লোভ’ নিয়ে পৃথিবী দখল করতে চাইবে-এমন ধারণা এখনই বৈজ্ঞানিক সত্য নয়। আসল বিপদ অন্য জায়গায়।
এআই-কে মানুষ যে লক্ষ্য দেয়, সেটি অর্জন করতে গিয়ে সে এমন কোনো পথ বেছে নিতে পারে, যা মানুষ অনুমোদন করেনি বা কল্পনাও করেনি।
একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই যদি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে মানুষের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কিংবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ সীমা যথাযথভাবে বিবেচনা না করে-তাহলেই বিপদ।
অর্থাৎ, সমস্যা এআই ‘খারাপ’ হয়ে যাওয়া নয়; সমস্যা হতে পারে এআই-এর ক্ষমতা এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হওয়া।
তাহলে কি এআই উন্নয়ন বন্ধ করে দিতে হবে? না। সেটি বাস্তবসম্মতও নয়।
ডারিও আমোডিও এআই বন্ধ করার কথা বলেননি। তিনি বলেছেন গতি নিয়ন্ত্রণের কথা। তাঁর বক্তব্যের সারকথা-এআই যত দ্রুত শক্তিশালী হচ্ছে, নিরাপত্তা পরীক্ষাও তত দ্রুত ও কঠোর হতে হবে।
বিশ্বের এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে এখন তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে কে আরও শক্তিশালী মডেল তৈরি করবে, কে আগে বাজারে আসবে, কে বেশি সক্ষম এআই এজেন্ট তৈরি করবে। কিন্তু এই প্রতিযোগিতায় যদি ‘আগে পৌঁছানো’ই একমাত্র লক্ষ্য হয়, তাহলে নিরাপত্তা পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই দরকার এমন প্রতিযোগিতা যেখানে প্রশ্ন হবে শুধু-কে সবচেয়ে শক্তিশালী এআই তৈরি করল?
প্রশ্ন হবে-কে সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে নিরাপদ এআই তৈরি করতে পারল?
প্রতিটি নতুন এআই মডেল বাজারে আনার আগে স্বাধীন নিরাপত্তা পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, সাইবার নিরাপত্তা যাচাই এবং মানুষের নিয়ন্ত্রণ কার্যকর আছে কি না-এসব নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু কোম্পানি নিজে নিজের পরীক্ষা করলে চলবে না; স্বাধীন বিশেষজ্ঞদেরও নজরদারির সুযোগ থাকতে হবে।
বাংলাদেশেরও প্রস্তুত হওয়ার সময় এখন
এআই বিপ্লব থেকে বাংলাদেশ দূরে থাকবে না। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যাংকিং, ব্যবসা, গণমাধ্যম, সরকারি সেবা- প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই-এর ব্যবহার বাড়বে।
আমাদের তাই শুধু এআই গ্রহণের প্রস্তুতি নিলে হবে না; এআই নিরাপদভাবে গ্রহণের প্রস্তুতিও নিতে হবে।
ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা, সাইবার নিরাপত্তা, ভুয়া তথ্য, কর্মসংস্থানের পরিবর্তন এবং এআই-নির্ভর সিদ্ধান্তের জবাবদিহি-এসব বিষয়ে এখন থেকেই জাতীয় নীতিমালা ও দক্ষ জনবল তৈরি প্রয়োজন। কারণ এআই-এর ঢেউ যখন আসবে, তখন তীরে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় থাকবে না।
নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগেই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে
মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি বড় প্রযুক্তি আমাদের ক্ষমতা বাড়িয়েছে। আগুন আমাদের রান্না ও শিল্প দিয়েছে, বিদ্যুৎ আধুনিক সভ্যতা তৈরি করেছে, পারমাণবিক শক্তি দিয়েছে বিপুল সম্ভাবনা-সঙ্গে ভয়াবহ ধ্বংসের ক্ষমতাও। এআই-ও তেমন একটি দ্বিমুখী শক্তি।
এটি হয়তো মানবজাতির সবচেয়ে বড় উৎপাদনশীল শক্তিতে পরিণত হবে। আবার যথাযথ নিরাপত্তা ছাড়া এটি বড় ঝুঁকিরও উৎস হতে পারে। তাই আজকের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ‘এআই কতটা শক্তিশালী হবে?’- এটি নয়।
প্রশ্ন হলো- এআই যত শক্তিশালী হবে, মানুষ কি ততটাই তার নিয়ন্ত্রণে সক্ষম থাকবে?
এআই-এর অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু প্রযুক্তির গতি যদি মানুষের বোঝার ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে বিপদ।
সুতরাং এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে-আমরা এআই-এর গতির পেছনে ছুটব, নাকি এআই-এর সঙ্গে নিরাপত্তার গতিকেও সমানতালে এগিয়ে নেব?
কারণ সবচেয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতি হবে তখনই, যখন আমরা বুঝতে পারব-এআই আমাদের জন্য কাজ করছে না; বরং আমরা এআই-এর তৈরি করা নিয়মের মধ্যে কাজ করছি। নিয়ন্ত্রণ হারানোর পরে নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার চেয়ে, নিয়ন্ত্রণ হারানোর আগেই সীমারেখা নির্ধারণ করা অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

















