‘বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’- এই পরিচিত ভাবটি একটু ধার করে বলতে ইচ্ছে করে, শিক্ষক তাঁর শ্রেণিকক্ষেই সবচেয়ে সুন্দর। শিক্ষকতা কোনো পেশা মাত্র নয়- এটি একটি ব্রত, একটি দায়বদ্ধতা। শিক্ষকের আসল জায়গা ক্লাসরুম, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, ওয়ার্ড, অপারেশন থিয়েটার ও গবেষণার টেবিল। সেখানে তিনি শুধু তথ্য দেন না; গড়ে তোলেন চিন্তা, চরিত্র ও আগামী প্রজন্মের ভিত্তি।
শিক্ষাবিজ্ঞানের একটি মৌলিক সত্য হলো- একজন শিক্ষার্থীর মেধা যতই থাকুক, তার পূর্ণ বিকাশ নির্ভর করে শিক্ষকের নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি, মনোযোগ ও মেন্টরশিপের ওপর। শিক্ষক যখন শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যান, তখন শুধু একটি ক্লাস মিস হয় না- একটি প্রজন্মের শিক্ষার ধারাবাহিকতায় ফাটল ধরে।
কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রশাসন ও কর্মক্ষেত্রে সন্তুষ্টিতে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা চোখে পড়ছে। শিক্ষকদের একটি অংশের মধ্যে প্রশাসনিক পদ, পছন্দের পদায়ন ও ক্ষমতার কেন্দ্রের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে; সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে তদবির, লবিং ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ছে শিক্ষাদান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের ওপর।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা কী দেখি আর কী দেখি না : আরেকটি অস্বস্তিকর পর্যবেক্ষণও আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা শিক্ষকেরা শিক্ষাদান, নতুন এডুকেশনাল ইনিশিয়েটিভ বা গবেষণার চেয়ে পদোন্নতি, ব্যক্তিগত কৃতিত্ব, সংগঠনের পদ কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি বেশি তুলে ধরি। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক যোগাযোগে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হলে তার মূল্য দিতে হয় শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীকেই। আর গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্যতা ও একাডেমিক অবদানের পরিবর্তে যোগাযোগ বা আনুগত্য প্রাধান্য পেলে, উদ্বেগটি আরও গভীর হয়- আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের সামনে সাফল্যের কোন দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছি?
শিক্ষক কেন প্রশাসনিক পদের দিকে যাচ্ছেন? সব শিক্ষক একই কারণে প্রশাসনে যান না, এটি স্বীকার করা জরুরি। অনেক দক্ষ শিক্ষক অধ্যক্ষ, পরিচালক বা অন্য নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। একাডেমিক নেতৃত্বে শিক্ষকের অংশগ্রহণ অপরিহার্য- কারণ একজন শিক্ষকই শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন প্রশাসনিক দায়িত্ব সেবার পরিবর্তে পেশাগত উচ্চাকাক্সক্ষা, মর্যাদা কিংবা ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হয়। আমাদের ব্যবস্থায় একজন শিক্ষক ভালো ক্লাস নিলেন, গবেষণা করলেন, বই লিখলেন, স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণার্থী তৈরি করলেন- এসবের স্বীকৃতি অনেক সময় প্রশাসনিক পদ পাওয়ার তুলনায় কম দৃশ্যমান থেকে যায়। এখানেই শিক্ষা ব্যবস্থাপনার একটি গভীর সংকট নিহিত। ফলে একটি বিপজ্জনক বার্তা তৈরি হয়- ভালো শিক্ষক হওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা হওয়া যেন বেশি মূল্যবান।
প্রশাসনেও শিক্ষক দরকার, ভারসাম্য জরুরি : নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে শিক্ষককে আবার শিক্ষাদান, শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা ও গবেষণায় ফিরে আসতে হবে। আর অর্থ ব্যবস্থাপনা, ক্রয়, মানবসম্পদ ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের বড় অংশ পেশাদার প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হলে শিক্ষক তাঁর মূল্যবান সময় শিক্ষা, গবেষণা ও আগামী প্রজন্ম গড়ার কাজে ব্যয় করতে পারবেন।
রাজনৈতিক পালাবদল ও পদায়নের চাপে মেডিকেল শিক্ষক: নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক পদে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক যোগাযোগ প্রাধান্য পেলে চিকিৎসাশিক্ষা দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কেউ পদ ও তদবিরে ব্যস্ত হয়ে শ্রেণিকক্ষ থেকে দূরে সরে যান; আবার যোগ্য হয়েও বারবার বঞ্চিত হওয়া অনেক শিক্ষককে হতাশ ও নিরুৎসাহিত করে- তাঁরা চাকরি করেন, কিন্তু শিক্ষকতার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এমন অভিযোগও একেবারে কম নয় যে, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন কিংবা ক্লাস নেওয়ার মতো মৌলিক একাডেমিক দায়িত্বও কখনো কখনো কনিষ্ঠ সহকর্মীর ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। এমন প্রবণতা শিক্ষার মান, দায়বদ্ধতা ও পরীক্ষার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সব ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় শিক্ষা, গবেষণা ও শিক্ষার্থী। সব মিলিয়ে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সহজ পথ আমার জানা নেই; তবে মেধা, যোগ্যতা ও ন্যায্যতাকে প্রতিষ্ঠা করতে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।
শিক্ষকেরা ফিরে আসুক শ্রেণিকক্ষে : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শিক্ষকের সাফল্যকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা। প্রশ্নটি যেন শুধু না হয়- তিনি কোন পদে ছিলেন? বরং হোক- তিনি কতজন দক্ষ চিকিৎসক ও গবেষক তৈরি করেছেন, জ্ঞানচর্চায় কী অবদান রেখেছেন, আর তাঁর শিক্ষার্থীদের মনে কী রেখে গেছেন?
শিক্ষক জ্ঞানরাজ্যের মানুষ। একটি জাতির ভবিষ্যৎ মূলত গড়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষে- অফিসকক্ষে, শিক্ষকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারে নয়। তাই শিক্ষককে ফিরতে হবে শিক্ষার্থীর কাছে, বইয়ের কাছে, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার কাছে।
প্রজন্ম গড়াই হোক শিক্ষকের সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর তাই- শিক্ষক তাঁর শ্রেণিকক্ষেই সবচেয়ে সুন্দর।
লেখক: চেয়ারম্যান, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট সার্জারি একাডেমিয়া

















