চট্টগ্রাম মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সর্বশেষ:

জটিল ব্লাড ক্যান্সার, সঠিক সময়ে চিকিৎসায় নিরাময়ের সুযোগ

আজ লিম্ফোমা সচেতনতা দিবস

জটিল ব্লাড ক্যান্সার, সঠিক সময়ে চিকিৎসায় নিরাময়ের সুযোগ

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২:২৯ অপরাহ্ণ

লিউকেমিয়াকে রক্তের ক্যান্সার বলা হলেও লিম্ফোমা রক্তের শ্বেতকণিকা লিম্ফোসাইটের সঙ্গে সম্পর্কিত এক ধরনের ক্যান্সার, যা প্রধানত লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থি থেকে শুরু হয়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে থাকা এসব গ্রন্থি স্বাভাবিক অবস্থায় সাধারণত অদৃশ্য থাকে। জীবাণুর সংক্রমণ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী লিম্ফোসাইটের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধির কারণে লিম্ফ নোড ফুলে ওঠে এবং বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়।

 

দীর্ঘমেয়াদি কিছু সংক্রমণ, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি, কিছু রাসায়নিকের সংস্পর্শ এবং তেজস্ক্রিয়তার মতো বিভিন্ন কারণ লিম্ফোমার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

 

বিশেষ ধরনের ক্যান্সার কোষ ‘রিড-স্টার্নবার্গ’ কোষের উপস্থিতির ভিত্তিতে লিম্ফোমাকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়-হডজকিন লিম্ফোমা ও নন-হডজকিন লিম্ফোমা। হডজকিন লিম্ফোমার অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসায় সম্পূর্ণ নিরাময়ের সুযোগ রয়েছে। তবে তা নির্ভর করে রোগটি কোন পর্যায়ে শনাক্ত হয়েছে এবং সময়মতো সঠিক চিকিৎসা শুরু করা হয়েছে কি না তার ওপর।

 

অন্যদিকে নন-হডজকিন লিম্ফোমা একটি বহুবৈচিত্র্যময় রোগগোষ্ঠী। রোগের গতি-প্রকৃতি, ক্যান্সার কোষের বৈশিষ্ট্য ও আচরণের ওপর ভিত্তি করে এর বিভিন্ন ধরন রয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে এসব শ্রেণিবিন্যাসও পরিবর্তিত হচ্ছে।

 

যেসব উপসর্গে সতর্ক হতে হবে:

 

লিম্ফোমার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে অস্বাভাবিক মাংসপিণ্ড বা লিম্ফ নোড ফুলে ওঠা। এর সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় পরপর অকারণে জ্বর, অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া, অতিরিক্ত রাতে ঘাম ও চুলকানি দেখা দিতে পারে।

 

আগের ছয় মাসে শরীরের ওজনের ১০ শতাংশের বেশি অনিচ্ছাকৃতভাবে কমে যাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। লিম্ফ নোডের অবস্থান ও আকারের কারণে আশপাশের অঙ্গের ওপর চাপ তৈরি হলে কাশি, শ্বাসকষ্ট, কোষ্ঠকাঠিন্য, পেটে ব্যথা কিংবা জন্ডিসের মতো উপসর্গও দেখা দিতে পারে।

 

নির্ণয়ে প্রয়োজন একাধিক পরীক্ষা:

 

লিম্ফোমা শনাক্ত করতে প্রথমে রক্তের সিবিসি পরীক্ষা এবং আক্রান্ত লিম্ফ নোড বা টিস্যুর বায়োপসি করা হয়। পরবর্তী সময়ে রোগের ধরন ও বিস্তৃতি নির্ণয়ের জন্য ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রে, কমপ্লিট মেটাবলিক প্রোফাইল, কনট্রাস্ট সিটি স্ক্যান বা পেট সিটি স্ক্যানসহ বিভিন্ন পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া প্রয়োজন অনুযায়ী ভাইরাল প্রোফাইল, বোন ম্যারো সাইটোলজি বা বায়োপসি এবং সিএসএফ পরীক্ষাও করা হয়।

 

রোগ নির্ণয়ের পর শরীরের কোন কোন অংশে রোগটি ছড়িয়েছে, তা বিবেচনা করে এন আরবার স্টেজিংয়ের মাধ্যমে সাধারণত স্টেজ ১ থেকে স্টেজ ৪ পর্যন্ত পর্যায় নির্ধারণ করা হয়। এরপর রোগের ধরন, প্রকৃতি, গ্রেড ও পর্যায়, রোগীর বয়স এবং অন্যান্য রোগের উপস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে চিকিৎসা পরিকল্পনা করা হয়।

 

চিকিৎসায় এসেছে বহুমাত্রিক সুযোগ:

 

লিম্ফোমার চিকিৎসায় কেমোথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, কেমো-ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি, রেডিওথেরাপি ও বিশেষ ক্ষেত্রে সার্জারি ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি সেলুলার থেরাপি এবং স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশনেরও সুযোগ রয়েছে। রোগের ধরন ও চিকিৎসার প্রয়োজন অনুযায়ী অটোলোগাস কিংবা লোজেনিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হয়। বিশেষ করে অটোলোগাস স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন লিম্ফোমার কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রবর্তী চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশেও লিম্ফোমা চিকিৎসায় জনবল, অবকাঠামো, রোগ নির্ণয় ও ওষুধ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তবে চিকিৎসার ব্যয় এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। রোগীর আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে চিকিৎসার সুযোগের বড় সম্পর্ক রয়েছে।

 

এই পরিস্থিতিতে চিকিৎসা প্রণোদনার পাশাপাশি রোগীর দোরগোড়ায় সমন্বিত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে ‘ওয়ান-স্টপ’ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। ক্যান্সারের জন্য নিবেদিত অবকাঠামো গড়ে তোলার পরও যদি প্রয়োজনীয় চিকিৎসার কোনো একটি ধাপের জন্য রোগীকে অন্যত্র রেফার করতে হয়, তাহলে কাক্সিক্ষত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় অটোলোগাস স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশনের ব্যবস্থা একই চিকিৎসাব্যবস্থার আওতায় থাকা জরুরি।

 

সেপ্টেম্বর মাস ব্লাড ক্যান্সার সচেতনতার মাস এবং ১৫ সেপ্টেম্বর লিম্ফোমা সচেতনতা দিবস। এ উপলক্ষে লিম্ফোমার লক্ষণ, দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

 

লেখক: প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, হেমাটোলজি বিভাগ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

 

পূর্বকোণ/ইবনুর

শেয়ার করুন

সম্পর্কিত পোস্ট