পার্বত্য অঞ্চলের তিন জেলাÑখাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান কারাগার এখন তীব্র ধারণক্ষমতা সংকট ও নানা অব্যবস্থাপনায় ধুঁকছে। ষাটের দশকে তৈরি হওয়া এসব কারাগারের অবকাঠামো দীর্ঘদিনেও আধুনিকায়ন করা হয়নি। ফলে অনুমোদিত ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বন্দী গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষ করে বান্দরবান ও রাঙামাটি জেলা কারাগারে তিল ধারণের জায়গা নেই। বসবাস করছে ধারণক্ষমতার তিন গুণ বন্দী।
নাজুক অবকাঠামোর মধ্যে ছিঁচকে আসামি থেকে ভয়ংকর দুর্ধর্ষ বন্দীদের রাখতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে তিন কারাগার কর্তৃপক্ষকে। বিশেষ করে পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত খাগড়াছড়ি জেলা কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই নাজুক যে, ৯ মাসের ব্যবধানে দুই দফায় ঘটেছে প্যারামিটার দেয়াল টপকে বন্দী পালানোর ঘটনা। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বান্দরবান জেলা কারাগার থেকে তিন দফায় পাহাড়ি চরমপন্থি সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফের ১০৯ আসামিকে চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠাতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ জেলের চট্টগ্রাম বিভাগের উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ছগির মিয়া বলেন, প্রায় ২০০ বছর আগের পুরোনো অবকাঠামো দিয়ে চলছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা কারাগার। বন্দী নিরাপত্তার বিষয় মাথায় রেখে তিন কারাগারকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা করছি আমরা। বন্দী নিরাপত্তাটাই মুখ্য। এ নিয়েই কাজ করা হচ্ছে। ডিআইজি ছগির মিয়া বলেন, তিন পার্বত্য জেলার কারাগারগুলোকে সংস্কার করে ১০০০ বন্দীর ধারণক্ষমতা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হচ্ছে।
রাঙামাটি কারাগারের কাগজে কলমে ধারণক্ষমতা ১৪৫ জন। বর্তমানে এ কারাগারে ধারণক্ষমতার প্রায় দেড় থেকে দুই গুণ বেশি (আনুমানিক ৪০০ থেকে ৫০০ জন) বন্দী আছে। এটি তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো কারাগার। কারাগারটি মূলত ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসলেও আধুনিক অবকাঠামোয় ১৯৬৪ সালে মহকুমা কারাগার হিসেবে যাত্রা শুরু করে।
খাগড়াছড়ি শহরের ডিসি অফিসের পাশের পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত জেলা কারাগার। প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস শুরু হয় ১৯৬৪ সালে থানা কারাগার হিসেবে, তারপর এটি মহকুমা কারাগার এবং সবশেষে ১৯৯৬ সালে জেলা কারাগারে উন্নীত হয়। পার্বত্য অঞ্চলের মধ্যে এই কারাগারটি সবচেয়ে ছোট এবং কাগজে কলমে ধারণক্ষমতা মাত্র ৮১ জন। তবে ধারণক্ষমতা কম হলেও কারগারটিতে সবসময়ই উপচে পড়া ভিড় থাকে। বর্তমান খাগড়ছাড়ি কারাগারে ধারণক্ষমতার আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ জন বন্দী আটক রয়েছে।
বান্দরবান কারাগারের কাগজে কলমে ধারণক্ষমতা প্রায় ১১৪ জন হলেও কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বিরোধী যৌথ বাহিনীর অভিযানের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ জনের কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছেছিল। অতিরিক্ত বন্দীর ধারণক্ষমতা না থাকায় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু বন্দীকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তর করা হয়েছে। তারপরও সেখানে ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দী রয়েছে।
১৯৬৪ সালে এটি মহকুমা কারাগার হিসেবে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে বান্দরবান পার্বত্য জেলা গঠিত হওয়ার পর এটি পূর্ণাঙ্গ জেলা কারাগারে রূপান্তরিত হয়। রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা কারাগারগুলো শুরুতে পূর্ণাঙ্গ জেলা কারাগার ছিল না। এগুলো ছিল মহকুমা কারাগার ও থানা লক-আপের মতো। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলের কারাবিধি অনুযায়ী, সাব-জেলগুলোতে আসামিদের সর্বোচ্চ ১৪ থেকে ১৫ দিন (কিংবা খুবই অল্প সময়ের জন্য) রিমান্ড বা প্রাথমিক হাজতে রাখার নিয়ম ছিল। কোনো বন্দীর বিচার দীর্ঘায়িত হলে বা দীর্ঘমেয়াদি সাজা হলে তাকে ১৫ দিনের মধ্যেই সমতলের মূল বড় কারাগার-তৎকালীন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হতো। এই কারাগারগুলো মূলত দীর্ঘমেয়াদে বন্দী রাখার মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বড় ব্যারাক বা অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা (যেমন: দীর্ঘমেয়াদি বন্দিদের শ্রমের ব্যবস্থা বা হাসপাতাল) দিয়ে তৈরি করা হয়নি। এগুলোকে শুধুমাত্র স্বল্পমেয়াদি অন্তর্বর্তীকালীন বন্দী বা বিচারাধীন আসামিদের কয়েকদিনের জন্য আটকে রাখার উপযোগী করেই নির্মাণ করা হয়েছিল।
জায়গা স্বল্পতার কারণে খাগড়াছড়ি কারাগারের দুটি দ্বিতল কারা ভবন ১৮ মিটার উচ্চতার প্যারামিটার দেয়াল থেকে মাত্র ছয় ফুট দূরত্বে অবস্থিত। তাই একতলা ভবনের ওপর থেকে লাফ দিয়ে প্যারামিটার দেয়াল টপকে ঘটেছে বন্দী পালানোর ঘটনা। সর্বশেষ গত ৯ নভেম্বর দেয়াল টপকে শফিকুল ইসলাম ও রাজিব হোসেন নামে দুই হাজতি আসামি পালিয়ে যায়। যদিও স্থানীয়দের সহায়তায় রাজিবকে আবার আটক করা সম্ভব হয়। শফিকুল এখনও পলাতক।
জানা গেছে, পাহাড়ের চূড়ায় ১০ শতাংশ জায়গার ওপর দুটি একতলা ভবন নিয়ে যাত্রা শুরু করে খাগড়াছড়ি কারাগার। এখনো ওই দুটি ভবনেই বন্দীদের রাখা হচ্ছে। মোট ধারণক্ষমতা ৮১ বন্দীর। বান্দরবান কারাগার ৬০ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। এখানে বন্দী ধারণক্ষমতা ১১৪ জন। কাপ্তাই লেকের পাশে রাঙামাটি কারাগার ৬৫ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। এখানে বন্দী ধারণক্ষমতা ১৪৫ জন।
বান্দরবান কারাগারের তিন দিকে উঁচু পাহাড় থাকায় ঢালে অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এখানে থাকা দ্বিতল কারা ভবনগুলো শতবর্ষী হওয়ায় নাজুক অবস্থায় রয়েছে। প্যারামিটার দেয়াল পাহাড়ের পাশে হওয়ায় মই কিংবা সিঁড়ি ব্যবহার করে সহজেই তা টপকানো যায়। এ ছাড়া তিন দিকে উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে সন্ত্রাসী হামলার শঙ্কাও রয়েছে বলে মনে করছে কারা কর্তৃপক্ষ।
পূর্বকোণ/ইবনুর

















